এবার নিজ দলেই তোপের মুখে ডোনাল্ড ট্রাম্প
ছবি: সংগৃহীত
১১:০২ এএম | ২৬ মে, ২০২৬
ইরান যুদ্ধ শেষ করার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তৈরি করা সম্ভাব্য চুক্তিটি নিজের দল রিপাবলিকান পার্টির কট্টরপন্থীদের পক্ষ থেকেই তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। তেহরান সরকারের বিরুদ্ধে আরো কঠোর অবস্থানের পক্ষে থাকা এই নেতারা আশঙ্কা করছেন, এর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের শত্রুকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনার একটি ঐতিহাসিক সুযোগ হাতছাড়া হতে যাচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই চুক্তিটিকে ‘অধিকাংশ ক্ষেত্রে আলোচনা সম্পন্ন’ বলে উল্লেখ করলেও, বিভিন্ন আইনপ্রণেতা, সাবেক ক্যাবিনেট সদস্য এবং কট্টরপন্থি বিশ্লেষকেরা প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলছেন যে এর ফলে পুরো যুদ্ধটিই শেষ পর্যন্ত ‘বৃথা’ যাবে কি-না।
টেক্সাসের রিপাবলিকান সিনেটর টেড ক্রুজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ লিখেছেন, দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্পের ইরান আক্রমণের সিদ্ধান্তটি ছিল সবচেয়ে ‘গুরুত্বপূর্ণ’, তাই এখন তার পিছু হটা উচিত হবে না।
তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘যে ইরান এখনো আমেরিকার ধ্বংস চাই, স্লোগান দেয়, তারা যদি বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার পায়, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সুযোগ রাখে এবং হরমুজ প্রণালির ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ পায়, তবে তা হবে একটি বিপর্যয়কর ভুল।’
ইসরাইল ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য মার্কিন মিত্রদের নেতাদের সঙ্গে ট্রাম্পের আলোচনার পর দেওয়া আপডেটের প্রতিক্রিয়ায় ক্রুজ এ কথা বলেন।
ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সাউথ ক্যারোলাইনার সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম এমন যেকোনো চুক্তির সমালোচনা করেছেন, যা ওই অঞ্চলে ইরানকে প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে টিকিয়ে রাখে এবং পারস্য উপসাগরের তেল অবকাঠামো ধ্বংস করার সক্ষমতা তাদের হাতে রেখে দেয়।
সিনেটের সশস্ত্র পরিষেবা কমিটির চেয়ারম্যান রজার উইকার প্রস্তাবিত ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে একে একটি ‘বিপর্যয়’ বলে অভিহিত করেছেন।
মিসিসিপির এই রিপাবলিকান সিনেটর বলেন, এর ফলে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র মাধ্যমে অর্জিত সবকিছুই বৃথা যাবে!’
সব সময় নিজেকে সেরা চুক্তিপ্রণেতা হিসেবে দাবি করা এবং আলোচনায় নিজের অবস্থান দুর্বল দেখাতে অপছন্দ করা ট্রাম্প এই সমালোচনাগুলোকে খারিজ করে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, চুক্তিটি এখনো ‘পুরোপুরি চূড়ান্ত হয়নি’।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মে তিনি লিখেছেন, ‘তাই এই লুজারদের কথা শুনবেন না, যারা নিজেরা কিছু না জেনেই সমালোচনা করছে।’
ট্রাম্প দাবি করেন, তার প্রশাসন যে চুক্তিটি নিয়ে কাজ করছে তা ওবামা প্রশাসনের আমলের পারমাণবিক চুক্তির ‘একেবারে বিপরীত’। ওবামা আমলের চুক্তিটি থেকে ট্রাম্প আগেই যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে এনেছিলেন এবং এখন একটি নতুন চুক্তি গড়ার চেষ্টা করছেন।
ট্রাম্প বলেন, ‘উভয় পক্ষকেই সময় নিয়ে এটি সঠিকভাবে করতে হবে। কোনো ভুল করা যাবে না!’
তিনি আরো বলেন, চুক্তি সম্পন্ন, প্রত্যয়িত এবং স্বাক্ষরিত না হওয়া পর্যন্ত ইরানি বন্দরে মার্কিন সামরিক অবরোধ ‘পুরোপুরি বহাল থাকবে’।
অবশ্য ক্যাপিটল হিলে ট্রাম্প কিছু সমর্থনও পাচ্ছেন। কেনটাকির রিপাবলিকান সিনেটর র্যান্ড পল এক্স-এ ট্রাম্পের অবস্থানকে সমর্থন করে লিখেছেন, ‘যেকোনো যুদ্ধই সাধারণত আলোচনার মাধ্যমে শেষ হয়। যারা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শান্তি আলোচনার সমালোচনা করছেন, তাদের উচিত ট্রাম্পকে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ সমাধান খোঁজার সুযোগ দেওয়া।’
আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই প্রস্তাবের অধীনে যুদ্ধের অবসান ঘটবে এবং ইরান হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করাসহ উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ত্যাগ করবে। এর বিস্তারিত বিবরণ ও সময়সীমা পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে নির্ধারণ করা হবে।
তথ্য ফাঁসের পর বাড়ছে আপত্তি
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে ইরানে আক্রমণ করার মাধ্যমে এই যুদ্ধ শুরু হয়। জনমত জরিপ অনুযায়ী, এই যুদ্ধ মার্কিন জনগণের কাছে বেশ অজনপ্রিয় এবং চলতি মাস পর্যন্ত মার্কিন করদাতাদের অন্তত ২ হাজার ৯০০ কোটি ডলার এতে ব্যয় হয়েছে। এই অভিযানে এ পর্যন্ত ১৩ জন মার্কিন সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন।
যুদ্ধ শুরুর সময় ট্রাম্প এটি চার থেকে ছয় সপ্তাহের মধ্যে শেষ হবে বলে উল্লেখ করলেও এই অচলাবস্থা এখনো চলছে। বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়, তা ইরান বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা লেগেছে এবং গ্যাসোলিনসহ অন্যান্য পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও দাবি করেছেন, এই চুক্তিটি ওবামা আমলের চুক্তির মতোই মনে হচ্ছে। এক্স-এ পম্পেও একে ‘কোনোভাবেই আমেরিকা ফার্স্ট নীতি নয়’ বলে মন্তব্য করার পর হোয়াইট হাউসের যোগাযোগ পরিচালক স্টিভেন চেউং তাকে কড়া ভাষায় ও গালিগালাজ করে জবাব দেন।
ট্রাম্পের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও বর্তমানে তার তীব্র সমালোচক জন বোল্টন বলেছেন, ফাঁসের তথ্য অনুযায়ী এই চুক্তিটি ইরানি সরকারের পক্ষে যাচ্ছে।
তিনি এক্স-এ লিখেছেন, ‘ইরান চুক্তি নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো সত্যি হলে, ইরানিরা একটি বড় বিজয় পাবেন। তারা আবার পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে ফিরবে, বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদে সমর্থন দেবে এবং নিজ দেশের জনগণকে নিপীড়ন করবে।’
বর্তমানে ভারতে কূটনৈতিক সফরে থাকা মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই সমালোচনার তীব্র বিরোধিতা করেছেন। এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের চেয়ে শক্তিশালী অবস্থান কোনো প্রেসিডেন্ট নেননি।
রুবিও বলেন, ‘ইরান যেন কখনো পারমাণবিক অস্ত্র না পায়, এই নীতির প্রতি ট্রাম্পের যে প্রতিশ্রুতি, তা নিয়ে কারো প্রশ্ন তোলা উচিত নয়। ট্রাম্প ইতোমধ্যেই নিজের সক্ষমতা প্রমাণ করার পরও এমন একটি চুক্তিতে রাজি হবেন যা শেষ পর্যন্ত ইরানের পারমাণবিক আকাঙ্ক্ষাকে আরো শক্তিশালী করবে, এই ভাবনাটাই অবান্তর। এটি কোনোভাবেই ঘটবে না।’
এদিকে ট্রাম্পের ওপর যুদ্ধ থামানোর আইনি নিষেধাজ্ঞা আরোপের চেষ্টা করা কেনটাকির রিপাবলিকান রিপ্রেজেন্টেটিভ টমাস ম্যাসি এনবিসি’র ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে বলেন, শর্তগুলো এখনো পুরোপুরি জানা না গেলেও ‘লিন্ডসে গ্রাহাম এবং টেড ক্রুজ যদি কাল রাতে এই চুক্তি নিয়ে খেপে গিয়ে থাকেন, তবে আমি বলব এটি সম্ভবত বেশ ভালো একটি চুক্তিই হতে যাচ্ছে।’
উল্লেখ্য, গত সপ্তাহে ট্রাম্প সমর্থিত প্রার্থীর কাছে প্রাইমারি নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর আগামী জানুয়ারি মাসে ম্যাসি কংগ্রেস ছাড়তে যাচ্ছেন।
সূত্র: পিবিএস
এমআর/টিকে