পরাশক্তিদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরালো: ভারতকে টেক্কা দিচ্ছে পাকিস্তান!
ছবি: সংগৃহীত
০৯:১১ এএম | ৩০ মে, ২০২৬
২০১৬ সালে কেরালার এক বিশাল জনসভায় দাঁড়িয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী জোর গলায় ঘোষণা করেছিলেন, বিশ্বজুড়ে পাকিস্তানকে একঘরে বা বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হবে। তবে এক দশক পর এসে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তিদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরালো করে পাকিস্তান এখন বিশ্ব রাজনীতিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রত্যাবর্তন এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের হোয়াইট হাউস সফর ওয়াশিংটন-ইসলামাবাদ সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। উল্টো দিকে, ভারতকে বিচ্ছিন্ন করার মার্কিন কৌশল এবং ট্রাম্পের সঙ্গে মোদীর ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপোড়েন ভারতের দীর্ঘদিনের কূটনীতিকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
এই ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে ২০২৫ সালের মে মাসের চার দিনব্যাপী এক সামরিক সংঘাত। ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পাহালগামে পর্যটকদের ওপর বন্দুকধারীদের হামলার জবাবে ভারতের সামরিক বাহিনী পাকিস্তানের ভেতরে হামলা চালালে দুই পরমাণু শক্তিধর দেশের মধ্যে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ যুদ্ধ শুরু হয়। পরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় ১০ মে একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হয়। পাকিস্তান এই সফল মধ্যস্থতার জন্য ট্রাম্পকে প্রশংসায় ভাসায় এবং নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য তাঁর নাম মনোনীত করে। কিন্তু ভারত ট্রাম্পের এই ভূমিকাকে স্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানায়, কারণ নতুন দিল্লি সব সময় কাশ্মীর ইস্যুটিকে দ্বিপাক্ষিক বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে এসেছে।
মোদী ওয়াশিংটনে যাওয়ার মার্কিন আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেন এবং ট্রাম্পের মধ্যস্থতার দাবি ফোনে নাকচ করে দেন। এই ঘটনায় ট্রাম্প ও মোদীর ব্যক্তিগত সম্পর্কে ফাটল ধরে, যা বিগত ২০ বছরের কৌশলগত মার্কিন-ভারত অংশীদারিত্বে বড় ধাক্কা দেয়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে হামলার পেছনে পাকিস্তানের সরাসরি জড়িত থাকার কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ভারত দিতে না পারায় এবং যুদ্ধে ভারতের কয়েকটি ফাইটার জেট ভূপাতিত হওয়ার তথ্য দেরিতে স্বীকার করায় বিশ্ব দরবারে ভারতের তৈরি করা ন্যারেটিভ ধাক্কা খায়।
ট্রাম্প প্রশাসন ভারতের বিরুদ্ধে বাণিজ্য শুল্ক বজায় রেখেছে এবং ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমতে থাকায় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সাম্প্রতিক ভারত সফরে আগামী পাঁচ বছরে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন পণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি আদায় করেছে। অন্যদিকে, ট্রাম্প পাকিস্তানের শীর্ষ নেতৃত্ব, বিশেষ করে সেনাপ্রধান আসিম মুনিরকে হোয়াইট হাউসে মধ্যাহ্রভোজের আমন্ত্রণ জানিয়ে 'ব্যতিক্রমী মানুষ' হিসেবে প্রশংসা করেছেন। পাকিস্তানও অত্যন্ত চতুর কূটনীতির মাধ্যমে খনিজ সম্পদ ও ক্রিপ্টো মাইনিংয়ের চুক্তি করে ট্রাম্প প্রশাসনকে নিজেদের পক্ষে টেনেছে। এছাড়া মুসলিম বিশ্বে ভারতের অভ্যন্তরীণ মুসলিম-বিদ্বেষী নীতি ও কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন বাতিলের বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, যার সুযোগ নিয়েছে পাকিস্তান।
এমনকি মধ্যপ্রাচ্যে মোদীর ইসরায়েল-ঘনিষ্ঠ নীতির বিপরীতে পাকিস্তান সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি করে এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধে প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়ে নিজের আঞ্চলিক গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে নিয়েছে।
ভারতের এই কূটনীতির প্রভাব পড়েছে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতাতেও। ২০১৬ সালের হামলার পর ভারত ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিতব্য সার্ক (SAARC) সম্মেলন বয়কট করায় জোটটি কার্যত অচল হয়ে পড়ে। ভারত পাকিস্তানকে বাদ দিয়ে বিমসটেক (BIMSTEC)-কে চাঙ্গা করার চেষ্টা করলেও তা সফল হয়নি। উপরন্তু, বাংলাদেশে শেখ হাসিনার পতনের পর ইসলামাবাদের সঙ্গে ঢাকার সম্পর্ক উন্নত হয়েছে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বর্তমান সংকটের মধ্যেও মার্কিন-ভারত কৌশলগত অংশীদারিত্ব একেবারে শেষ হয়ে যায়নি এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য এখনও ২০০ বিলিয়ন ডলারের ওপরে রয়েছে। তবে স্থায়ী শান্তির জন্য কাশ্মীর সংকটের সমাধান এবং দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের ব্যাক-চ্যানেল কূটনীতি বা আলোচনা পুনরায় চালু করা জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সূত্র: আলজাজিরা
কেএন/এসএন