© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

রয়টার্স এর প্রতিবেদনযুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে তীব্র দ্বন্দ্ব, সিআইএর তথ্য দেয়া বন্ধ

শেয়ার করুন:
যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে তীব্র দ্বন্দ্ব, সিআইএর তথ্য দেয়া বন্ধ

ছবি: সংগৃহীত

মোজো ডেস্ক
০৭:৫৭ এএম | ০৩ জুন, ২০২৬
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে অভ্যন্তরীণ প্রভাব বিস্তার ও কাজের পরিধি নিয়ে তীব্র বিরোধ তৈরি হয়েছে। গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান এবং দায়িত্বের সীমা নিয়ে এই কোন্দল এতটাই চরম আকার ধারণ করেছে যে, কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (সিআইএ) দেশের প্রধান গোয়েন্দা পরিচালকের কার্যালয় থেকে তৈরি করা কিছু গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা মূল্যায়নে তথ্য দেয়া বন্ধ করে দিয়েছে। এর মধ্যে চলমান ইরান যুদ্ধ সংক্রান্ত অত্যন্ত সংবেদনশীল মূল্যায়নও রয়েছে।


পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সরাসরি অবগত একজন মার্কিন কর্মকর্তা এবং তিনজন ব্যক্তির বরাত দিয়ে মঙ্গলবার (২ জুন) এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই বিস্ফোরক তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সিআইএ এবং ‘অফিস অব দ্য ডিরেক্টর অব ন্যাশনাল ইনটেলিজেন্স’ (ওডিএনআই)-এর মধ্যে এই অভ্যন্তরীণ লড়াই এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চলছে। এর ফলে জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিশ্লেষণমূলক যৌথ কাজগুলো মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, যা মার্কিন প্রেসিডেন্টরা সাধারণত জটিল বৈদেশিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ব্যবহার করে থাকেন।

বিরোধের মূলে ‘টাস্কফোর্স’
উদ্বেগজনক এই দ্বন্দ্বের নেপথ্যে রয়েছে জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক তুলসী গ্যাবার্ডের নির্দেশে ২০২৫ সালের এপ্রিলে গঠিত একটি বিশেষ টাস্কফোর্স। জন র‍্যাটক্লিফের নেতৃত্বাধীন সিআইএ-র অভিযোগ, গ্যাবার্ডের এই ‘ডিরেক্টর্স ইনিশিয়েটিভস গ্রুপ’ গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান এবং রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা ফাঁসের প্রচলিত নিয়মকানুন লঙ্ঘন করে অত্যন্ত বিপজ্জনকভাবে কাজ করছে। অন্যদিকে, ওডিএনআই কর্মকর্তাদের দাবি, সিআইএ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাদের এই গ্রুপের কাছে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ বন্ধ করে রেখেছে।

যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে লিপ্ত এবং চীন-রাশিয়ার মতো ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে, ঠিক তখনই দেশটির গোয়েন্দা ব্যবস্থার এই সমন্বয়হীনতা ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর দেশটির ১৮টি গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে সমন্বয় সাধনের জন্য ওডিএনআই পদটি তৈরি করা হয়েছিল, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি প্রমাণ করছে যে সেই সংকট কাটেনি।

ওডিএনআই-এর সাবেক ডেপুটি ডিরেক্টর বেথ স্যানার বলেন, ‘ওডিএনআই-এর কাজ হলো পুরো গোয়েন্দা ব্যবস্থার ধমনিগুলোকে সচল রাখা। তারা যখন এই কাজ করতে ব্যর্থ হয়, তখন সংস্থাগুলো নিজেদের গুটিয়ে নেয় এবং এটি শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের গোয়েন্দা ব্যর্থতার ঝুঁকি তৈরি করে।’

কর্মকর্তা বহিষ্কার ও প্রতিশোধের রাজনীতি
সূত্রমতে, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তুলসী গ্যাবার্ড দায়িত্ব নেয়ার পরপরই এই বিরোধের সূত্রপাত হয়। তিনি দায়িত্ব নিয়েই প্রেসিডেন্টের প্রতিদিনের অত্যন্ত গোপনীয় গোয়েন্দা ব্রিফিং তৈরির ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন, যা ঐতিহ্যগতভাবে সিআইএ-ই প্রধান ভূমিকা পালন করে আসছিল।

এরপর গোয়েন্দা সংস্থায় ‘রাজনৈতিক প্রভাব’ দূর করার নামে গ্যাবার্ড বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করলে দূরত্ব আরও বাড়ে। এই টাস্কফোর্স জন এফ কেনেডি হত্যাকাণ্ড, নির্বাচনের ভোটিং মেশিনের নিরাপত্তা এবং কোভিড-১৯-এর উৎস অনুসন্ধানের কাজ শুরু করে। তবে সমালোচক এবং সাবেক কর্মকর্তাদের দাবি, ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের ওপর প্রতিশোধ নিতেই এই গ্রুপ গঠন করা হয়েছিল।

গত বছরের মে মাসে গ্যাবার্ড সিআইএ-র দুজন সিনিয়র কর্মকর্তাকে বহিষ্কার করেন। এরপর আগস্টে তিনি ৩৭ জন বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তার সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স বাতিল করেন, যার ফলে বিদেশে কর্মরত সিআইএ-র এক ছদ্মবেশী কর্মকর্তার পরিচয় ফাঁস হয়ে যায়। অভিযোগ রয়েছে, ২০১৬ সালের মার্কিন নির্বাচনে ডনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষে রাশিয়ার হস্তক্ষেপ সংক্রান্ত ২০১৭ সালের একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনের প্রতিশোধ হিসেবেই গ্যাবার্ড এই পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।

তদন্তে ইন্সপেক্টর জেনারেল
সংস্থা দুটির এই স্নায়ুযুদ্ধ গত মাসে জনসমক্ষে আসে, যখন ওডিএনআই-এর টাস্কফোর্সে কর্মরত এক সিআইএ কর্মকর্তা মার্কিন সিনেট কমিটিকে জানান যে, কোভিড-১৯-এর উৎস সংক্রান্ত গোয়েন্দা তথ্য পেতে সিআইএ তাদের বাধা দিচ্ছে। এই অভিযোগের পর বর্তমানে ইনটেলিজেন্স কমিউনিটির স্বাধীন ওয়াচডগ ‘ইন্সপেক্টর জেনারেলের’ কার্যালয় একটি আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেছে।

সরে দাঁড়াচ্ছেন গ্যাবার্ড
এদিকে, তীব্র বিতর্কের মুখে থাকা জাতীয় গোয়েন্দা প্রধান তুলসী গ্যাবার্ড গত সপ্তাহে ঘোষণা দিয়েছেন, স্বামীর অসুস্থতার কারণে আগামী ৩০ জুন তিনি পদত্যাগ করবেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এরইমধ্যে ফেডারেল হাউজিং ফাইন্যান্স এজেন্সির প্রধান বিল পুলটেকে ভারপ্রাপ্ত জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক হিসেবে নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছেন।

তবে ওডিএনআই-এর মুখপাত্র অলিভিয়া কোলম্যান এবং হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ডেভিস ইঙ্গল দাবি করেছেন, অভ্যন্তরীণ মতভেদের এই খবরগুলো সত্য নয় এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা দল অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে আমেরিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছে।

টিজে/টিকে 

মন্তব্য করুন