© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

রামিসা হত্যাআসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থন এবং যুক্তিতর্কের শুনানি আজ

শেয়ার করুন:
আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থন এবং যুক্তিতর্কের শুনানি আজ

ছবি: সংগৃহীত

মোজো ডেস্ক
১০:৩২ এএম | ০৩ জুন, ২০২৬
রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যা মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণে নজির স্থাপন হলো। এক দিনেই মামলার সাক্ষ্য সম্পন্ন করা হয়েছে। ১৮ সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জন আদালতে সাক্ষ্য দেন। স্বাভাবিকভাবে ধর্ষণ মামলায় সাক্ষীদের সমন দেওয়া, আদালতে হাজির করা, সাক্ষ্য গ্রহণ ও জেরা শেষ করতে মাসের পর মাস এমনকি বছর পেরিয়ে যায়।

গতকাল মঙ্গলবার ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালতে রামিসার বাবা, মা, বোন, স্বজন, প্রতিবেশী প্রত্যক্ষদর্শী ও তদন্ত কর্মকর্তাসহ ১৬ জন সাক্ষ্য দেন। এরপর সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ করার আবেদন জানায় রাষ্ট্রপক্ষ। আবেদন মঞ্জুর করে আদালত মামলার পরবর্তী ধাপ আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থন এবং যুক্তিতর্কের জন্য আজ বুধবার দিন ধার্য করেন। এ দুই ধাপ-আত্মপক্ষ সমর্থন ও যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হলে মামলার রায় ঘোষণা করবেন আদালত।

এদিকে আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের উপস্থিতিতে গতকাল প্রথমে সাক্ষ্য দেন মামলার বাদী রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা। তিনি আদালতে বলেন, ‘ঘটনার দিন সকাল ১০টার দিকে অফিসে থাকা অবস্থায় স্ত্রীর ফোন পেয়ে ৩০ মিনিটের ভেতর বাসায় আসেন। এসে দেখেন অনেক মানুষ দরজার সামনে জড়ো হয়েছেন। আসামিরা দরজা না খোলায় হাতুড়ি নিয়ে আসেন। এরপর লোকজনের সহায়তায় তালা ভাঙার পর দেখেন ভেতরে স্বপ্না। বাথরুমে রক্ত পড়ে আছে। দরজা ভাঙার পর আসামি স্বপ্নাকে বলেন, আমার মেয়ে কোথায়? কিন্তু চুপ ছিলেন স্বপ্না। পরে বাথরুমে রামিসার খণ্ডিত মাথা দেখেন। এ ছাড়া সোহেল-স্বপ্নার শয়নকক্ষে খোঁজাখুঁজির পর স্টিলের খাটের নিচে মেয়ের মাথা বিহীন মরদেহ দেখতে পান।’

স্বপ্নাকে বারবার বললাম, বইন দরজাটা খোল; কিন্তু খোলে নাই: রামিসার বাবার সাক্ষ্য ও জেরার পর সাক্ষী দেন রামিসার মা পারভিনা আক্তার। সাক্ষ্যতে শিশু রামিসার সন্ধান কীভাবে পান, ওই সময় কী করেছিলেন এবং কী দেখেছিলেন, তা জানান শিশুটির মা। সাক্ষ্য গ্রহণে তিনি আদালতে বলেন, ‘ঘটনার সময় আমি রান্না করছিলাম। আনুমানিক সকাল ১০টার দিকে আমি বড় মেয়ে রাইসাকে বলি, তার চাচা গোলাম মোস্তফার বাসায় যেতে। তখন ছোট মেয়ে রামিসা বলল, আম্মু আমিও আপুর সঙ্গে যাব। কিন্তু আমি তাকে বাইরে যেতে না করি। একটুর পর আমি রান্না ঘর থেকে একটা বাচ্চার চিৎকারের শব্দ শুনতে পাই। পাশের ফ্ল্যাটের আসামি সোহেলদের বাসায় বাচ্চা নেই জানতাম। তবে একটু পর রুমের বাইরে বের হলাম। কাউকে পেলাম না বাইরে। এর ৩-৪ মিনিট পর বড় মেয়ে রাইসা একা তার চাচার বাসা থেকে আসে। আমি রাইসাকে বললাম, তুমি একা কেন। রামিসা কোথায়? রাইসা বলে, সে তো আমার সাথে যায় নাই। নিচে গেছে মনে হয়। নিচে গিয়ে দেখি রামিসা নাই। আশপাশে সবার কাছে শুনতে থাকি, রামিসাকে দেখছেন। সবাই বলে, না দেখি নাই।’

তিনি বলেন, ‘বিল্ডিংয়ের নিচে, দ্বিতীয়তালার পর তিনতলায় সোহেলদের রুমে ধাক্কা দিলাম। খুলল না। পরে তাদের দরজার সামনে দেখলাম মেয়ের একটা জুতা পড়ে আছে। তখন মনে হলো আগে একটা বাচ্চার চিৎকার শুনছিলাম, ওই বাচ্চার চিৎকার কি আমার মেয়ের? তাহলে কি আমার রামিসাকে এখানে আটকে রেখেছে? এরপর আমি দরজা খোলার জন্য বারবার দরজা ধাক্কাতে থাকি। কিন্তু কেউ খোলে না। পরে লোকজন ডাকি। স্বামীকে ফোন দিলে চলে আসে।

তখন সবাই দরজা ভাঙার চেষ্টা করে। একপর্যায়ে দরজার গোল বোল্ড লক ভাঙা হয়। ভাঙা লকের ছিদ্র দিয়ে দেখি বাথরুম খোলা। ভেতরে অনেক রক্ত পড়ে আছে। রাজু নামে একটা ছেলে সেটার ভিডিও করে। আমি চিৎকার করে কাঁদতে থাকি। তখন আমি আসামি স্বপ্নাকে ভেতরে হাঁটতে দেখি। আমি বাইরে থেকে স্বপ্নাকে বারবার বলতে থাকি, বইন দরজাটা খোল। আমি তোকে কিছু বলব না। কিন্তু সে খোলেনি।’

কাঁদতে কাঁদতে পারভীনা আক্তার আরও বলেন, ‘এরপর দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে দেখি আমার মেয়ের মাথা এক জায়গায় আর দেহ আরেক জায়গায়। মাথা বাথরুমে বালতিতে। আর দেহ আসামিদের রুমের খাটের নিচে লুকিয়ে রেখেছে। পরে পুলিশ এসে। মেয়ের মরদেহ, জামাকাপড় সব নিয়ে যায়।’

এরপর শিশু হওয়ায় ক্যামেরা ট্রায়ালে সাক্ষ্য গ্রহণ হয় রামিসার বড় বোন রাইসা আক্তারের। পরে স্বজন ও প্রত্যক্ষদর্শী প্রতিবেশীরা সাক্ষ্য দেন। এ ছাড়া রামিসার চাচা মিজানুর রহমান লিটন, ফুপু মাহমুদা আক্তার, ফুপা মনিরুজ্জামান শাহীন, একই ভবনের বাসিন্দা মনির হোসেন, প্রতিবেশী জাকিরুল ইসলাম রাজন আদালতে সাক্ষ্য দেন।

এ ছাড়া সাক্ষ্য দেন আবু সামা নামের এক প্রতিবেশী। তিনি আদালতে বলেন, ‘সকাল প্রায় ১০টার দিকে নাস্তা করছিলাম। তখন দেখি পাশের বাসার জানালা বেয়ে এক ব্যক্তি খালি গায়ে নিচে নামছে। আমি তাকে চোর মনে করে চোর চোর বলে চিৎকার করি। পরে পাশের বাসা থেকে চিৎকার শুনে গিয়ে রামিসার মরদেহ দেখি।’ তিনি বলেন, ‘পরে মিডিয়ায় ছবি দেখে নিশ্চিত হই, জানালা দিয়ে নামা ব্যক্তিই আসামি সোহেল রানা।’

গতকাল দুপুর ১টার দিকে ১০ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়। আধা ঘণ্টা বিরতি দিয়ে দেড়টায় বাকি সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। এর পর কনস্টেবল রোমা আক্তার, কনস্টেবল শরীফ মিয়া, সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করা উপপরিদর্শক (এসআই) ইকবাল হোসেন, ময়নাতদন্ত প্রস্তুত করা ডা. নাসাদ জাবিন, আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদ, এসআই রাশেদুল ইসলাম ও তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশের এসআই অহিদুজ্জামান পর্যায়ক্রমে আদালতে জবানবন্দি দেন। এ সময় রাষ্ট্র নিযুক্ত আসামিপক্ষের আইনজীবী মুসা কলিমউল্লাহ তাদের জেরা করেন। এ ছাড়া আসামি যেন আদালতের বাইরে গণমাধ্যমে কোনো বক্তব্য না দেয়, তা দেখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কড়া নির্দেশনা দেন আদালত।

তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার উপপরিদর্শক অহিদুজ্জামান ভূঁইয়া নিপুণ সাক্ষ্য গ্রহণে বলেন, সোহেল রানা ও স্বপ্না একই ভবনের তৃতীয় তলায় রামিসাদের পাশের ফ্ল্যাটে বসবাস করে। ঘটনার দিন সকাল আনুমানিক সাড়ে ৯টার দিকে বাদী ও আসামিদের দুই ফ্ল্যাটের দরজার মাঝে সিঁড়িতে রামিসাকে একা পেয়ে সোহেল তার ফ্ল্যাটের কমন বাথরুমের ভেতরে নিয়ে ধর্ষণ করে। এ সময় ভুক্তভোগীর শরীর নিস্তেজ হয়ে গেলে আসামি মৃত লাশ ভেবে গুম করার চেষ্টা করে। লাশের দেহ থেকে গলা কেটে, কাঁধ থেকে দুই হাত বিচ্ছিন্ন করে, তার গোপনাঙ্গ ছুরির আঘাতে কেটে ক্ষতবিক্ষত করে। ঘটনার শুরু থেকেই আসামিকে ধর্ষণ, হত্যা, লাশ গুম করার সময় দরজা না খোলা, সোহেলকে পালিয়ে যেতে সহযোগিতা করেছে স্বপ্না। তিনি সজ্ঞানে স্বেচ্ছায়, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করায় সেও একই অপরাধে অপরাধী।

তখন আইনজীবী তদন্ত কর্মকর্তাকে প্রশ্ন করেন, ১৬১ ধারায় সাক্ষীদের জবানবন্দি ছাড়া আর কোনো প্রমাণ পাননি তাহলে আপনি। এর ওপর ভিত্তি করে চার্জশিট দিয়ে দিলেন? তখন তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, লাশ আসামিদের ঘরে পাওয়া গেছে। অন্য কোনো ব্যক্তির সম্পৃক্ততা বা শনাক্ত করা যায়নি। সোহেল রানাকে পালাতে দেখা গেছে। ঘটনাস্থলে স্বপ্না ছিলেন। তাই সোহেল ও তার স্ত্রী স্বপ্নাই এ ঘটনা ঘটিয়েছে।

সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আজিজুল রহমান দুলু সাংবাদিকদের বলেন, ‘সাক্ষীদের বক্তব্যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। ভুক্তভোগীর বাবা-মায়ের সাক্ষ্যে ঘটনার লোমহর্ষক বর্ণনা উঠে আসে। এ ছাড়া আসামি সোহেল রানা ধর্ষণ ও হত্যার পর গ্রিল কেটে পালিয়ে যাওয়ার বিষয়েও সাক্ষ্যে তথ্য এসেছে।

এর আগে গত ১৯ মে রাজধানীর পল্লবীর একটি বাসা থেকে আট বছরের শিশু রামিসার খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে ফ্ল্যাটটিতে বসবাসকারী সোহেল রানা ও তার স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করা হয়। আদালতের কাছে ধর্ষণ ও হত্যার দায় স্বীকার করে সোহেল।

কেএন/টিএ

মন্তব্য করুন