যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তিচুক্তির পথে বাধা নেতানিয়াহু!
ছবি: সংগৃহীত
০৮:০০ এএম | ০৪ জুন, ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তিচুক্তি এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার আলোচনার পথে এখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
বিশেষ করে লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে, যা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যকার অস্থির মিত্রভাকে নতুন করে পরীক্ষার মুখে ফেলেছে।
নেতানিয়াহু বর্তমানে এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক চাপের মুখোমুখি। সম্প্রতি ইসরায়েলের পার্লামেন্ট 'নেসেট ভেঙে দেওয়ার বিল প্রথম চেষ্টায় ১০৬-০ ভোটে পাস হওয়ায় আগামী শরতে দেশটিতে আগাম নির্বাচনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ইরানি নেতৃত্বের ওপর সফল হামলার পর জনমত জরিপে তাঁর সমর্থন কিছুটা বাড়লেও গাজা, লেবানন ও ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় তাঁর জনপ্রিয়তা এখন পড়তির দিকে। একই সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে প্রতারণা ও ঘুষের অভিযোগে দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা মামলার শুনানিও চলতি সপ্তাহে আবার শুরু হয়েছে।
রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এবং বিচারপ্রক্রিয়া এড়াতে আসন্ন নির্বাচনের আগে তাঁকে প্রমাণ করতে হবে যে হামাস, হিজবুল্লাহ ও ইরানের বিরুদ্ধে তাঁর সামরিক অভিযান সফল হয়েছে। লবিং গ্রুপ 'জে স্ট্রিট'-এর প্রধান নীতি কর্মকর্তা ইলান গোল্ডেনবার্গ মনে করেন, নির্বাচনে ভোটারদের দেখানোর মতো জোরালো কোনো সাফল্য না থাকায় নেতানিয়াহুকে হয় লেবাননে বিজয় ছিনিয়ে আনতে হবে, নয়তো চূড়ান্ত বিজয়ের লক্ষ্যে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার গল্প শোনাতে হবে।
এই সংঘাতের জেরে গত সোমবার নেতানিয়াহু বৈরুতের দক্ষিণ শহরতলিতে বোমা হামলার হুমকি দিলে ইরান জানায়, সংঘাত বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা স্থগিত রাখবে। এর ফলে ট্রাম্পের চুক্তি খুব কাছাকাছি, এমন দাবির মুখে আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হলে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে এক উত্তপ্ত ফোনালাপ হয়। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের তথ্যমতে, ট্রাম্প ক্ষুব্ধ হয়ে নেতানিয়াহুকে বলেন, আপনি এসব কী ছাইপাঁশ করছেন?' এবং দাবি করেন যে তিনি না থাকলে নেতানিয়াহু কারাগারে থাকতেন।
তবে ইসরায়েলের গণমাধ্যম চ্যানেল ১২ এর রাজনৈতিক বিশ্লেষক অমিত সেগাল জানান, এটি ছিল মূলত দুই নেতার মধ্যকার একটি ভুল-বোঝাবুঝি: ট্রাম্প ভেবেছিলেন নেতানিয়াহু যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছেন, আর নেতানিয়াহু ভেবেছিলেন ট্রাম্প পুরোপুরি যুদ্ধবিরতির কথা বলছেন। অবশ্য ট্রাম্প পরে জানান যে তিনি দ্রুতই এই ছোটখাটো সমস্যা সামলে নিয়েছেন।
নেতানিয়াহু অতীতে বিল ক্লিনটনসহ যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচজন প্রেসিডেন্টের সময়কাল দেখলেও প্রত্যেকের সঙ্গেই তাঁর সম্পর্কের টানাপোড়েন ছিল। অতীতে তিনি ট্রাম্পকে ইরানে একসঙ্গে হামলা চালানোর জন্য রাজি করাতে পারলেও, ট্রাম্পের কাছে এখন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমীকরণই বেশি অগ্রাধিকার পাচ্ছে। বিশেষ করে মেমোরিয়াল ডের ছুটিতে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের গড় দাম করোনা মহামারির পর সর্বোচ্চ হওয়ায় ট্রাম্প তেলের দাম নিয়ে চিন্তিত।
মূলত নেতানিয়াহুর ইশারাতেই ট্রাম্প চলছেন-এমন অপবাদ ঘোচাতে এবং ইসরায়েলের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ দেখাতে মার্কিন প্রশাসন এই ফোনালাপের তথ্য ফাঁস করে থাকতে পারে। ফোনালাপের পর নেতানিয়াহু বৈরুতে আক্রমণ না করার আশ্বাস দিলেও, তার কয়েক ঘণ্টার মাথায় গত মঙ্গলবার ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় আটজন নিহত হন।
সমীকরণের অপর পক্ষে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়ে বিশ্বের মোট তেল বাণিজ্যের ২০ শতাংশ আটকে দিয়েছে, যাতে অর্থনৈতিক চাপে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় বসতে বাধ্য হয়।
তবে মার্কিন অবরোধের কারণে ইরানের অর্থনীতি ও তেলশিল্পের ভবিষ্যৎও হুমকির মুখে। ইরানকে চুক্তিতে রাজি করাতে জব্দ করা অর্থ ফেরত দেওয়ার মতো সুবিধা দেওয়া হতে পারে, যদিও ওবামা আমলের এমন সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচক ট্রাম্প নিজে এই পথে হাঁটতে অনিচ্ছুক। নেতানিয়াহুর দর-কষাকষির প্রধান হাতিয়ার লেবানন অভিযান হলেও, ট্রাম্প জানিয়েছেন তিনি চুক্তি স্বাক্ষরের খুব কাছাকাছি আছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের যা প্রয়োজন, তা তারা আদায় করেই ছাড়বেন।
এফআর/টিকে