© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

২৩ বছরের ডিভোর্স যুদ্ধ শেষে মামলায় ১০০ কোটি টাকা জিতলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত নারী

শেয়ার করুন:
২৩ বছরের ডিভোর্স যুদ্ধ শেষে মামলায় ১০০ কোটি টাকা জিতলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত নারী

ছবি: সংগৃহীত

মোজো ডেস্ক
০১:৫২ পিএম | ০৫ জুন, ২০২৬
অবশেষে অবসান হলো দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা এক নজিরবিহীন আইনি লড়াইয়ের। যুক্তরাজ্যের ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘ ও নাটকীয় এক বিবাহবিচ্ছেদ (ডিভোর্স) মামলায় প্রায় ৬৬ লাখ পাউন্ড (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১০০ কোটি টাকা) ক্ষতিপূরণ জিতেছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত নারী বর্ষা গোহিল।

মামলাটির সূত্রপাত হয়েছিল ২০০২ সালে। সে সময় স্বামী ভদ্রেশ গোহিলের বিরুদ্ধে পরকীয়া ও অন্যায্য আচরণের অভিযোগ এনে ডিভোর্সের আবেদন করেন বর্ষা। তখন তিন সন্তানের এই দম্পতির বিবাহবিচ্ছেদ প্রক্রিয়াটি বেশ সহজভাবেই সম্পন্ন হয়েছিল বলে মনে হয়েছিল। সে সময় একটি সাধারণ আর্থিক রফাদফায় সম্মত হয়ে বর্ষা ৩ লাখ ৫০ হাজার পাউন্ড এবং পরিবারের ব্যবহৃত ‘পুজো’ ব্র্যান্ডের গাড়িটি নিয়ে সন্তুষ্ট থাকেন।
তবে বর্ষা মনে মনে সব সময় বিশ্বাস করতেন, তার স্বামী ভদ্রেশ ডিভোর্সের সময় নিজের সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির সঠিক হিসাব দেননি, অনেক সম্পদ লুকিয়ে রেখেছেন।

শুরুর দিকে বর্ষার এ সন্দেহের সপক্ষে কোনো জোরালো প্রমাণ ছিল না। কিন্তু কয়েক বছর পর দৃশ্যপট পুরোপুরি বদলে যায়, যখন নাইজেরিয়ার সাবেক গভর্নর জেমস ইবোরির সহযোগীদের সঙ্গে যুক্ত একটি বড় ধরনের অর্থ পাচার (মানি লন্ডারিং) মামলার প্রধান নজরে আসেন ভদ্রেশ গোহিল।

তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ অভিযোগ করে, ভদ্রেশ অফশোর কোম্পানি এবং মক্কেলদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে কোটি কোটি পাউন্ড অবৈধভাবে স্থানান্তরে সহায়তা করেছেন। দীর্ঘ তদন্তের পর অর্থ পাচার, জালিয়াতি এবং প্রতারণামূলক ষড়যন্ত্রের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন ভদ্রেশ। ২০১১ সালে ব্রিটিশ আদালত তাকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেন।

এই ফৌজদারি মামলার সূত্র ধরেই ভদ্রেশের এমন কোটি কোটি পাউন্ডের গোপন সম্পদের খোঁজ মেলে, যা মূল ডিভোর্স মামলার সময় আড়ালেই রয়ে গিয়েছিল। সরকারি আইনজীবীরা পরে ভদ্রেশের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা কোম্পানির নেটওয়ার্কের মাধ্যমে লুকিয়ে রাখা প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ পাউন্ডের সম্পদ জব্দ করার পদক্ষেপ নেন। আর এই নতুন তথ্যই বর্ষার দীর্ঘদিনের আইনি লড়াইয়ে এক নতুন গতি এনে দেয়। তিনি পুরোনো ডিভোর্সের আর্থিক মীমাংসাকে চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হন।

সম্পত্তির এই বিরোধ একপর্যায়ে যুক্তরাজ্যের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ায়। ২০১৫ সালে সুপ্রিম কোর্ট এক যুগান্তকারী রায়ে বর্ষাকে তার ডিভোর্সের আর্থিক মীমাংসার মামলাটি পুনরায় চালু করার অনুমতি দেন। আদালত পর্যবেক্ষণ দেন যে, কোনো স্বামী বা স্ত্রী যদি ইচ্ছাকৃতভাবে সম্পত্তি লুকিয়ে রাখেন, তবে সেই জালিয়াতির সুবিধা তিনি পেতে পারেন না।

তবে মামলা পুনরায় চালু হলেও বর্ষার পথ সহজ ছিল না। যুক্তরাজ্যের ‘ক্রাউন প্রসিকিউশন সার্ভিস’ দাবি করে, জব্দ করা এ সম্পত্তি সম্পূর্ণ অপরাধের মাধ্যমে অর্জিত, তাই এগুলো রাষ্ট্রীয় কোষাগারে বাজেয়াপ্ত হওয়া উচিত। অন্যদিকে বর্ষা যুক্তি দেন, এই সম্পদের অন্তত একটি অংশ তাদের বিয়ের পর বৈধ ব্যবসার মাধ্যমে অর্জিত হয়েছিল, তাই এটি বৈবাহিক যৌথ সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত। আর অভিযুক্ত ভদ্রেশ গোহিল দাবি করতে থাকেন যে, এসব সম্পত্তির কোনোটিই তার নয়!

সব পক্ষ-বিপক্ষের যুক্তি শেষে বিষয়টি লন্ডনের হাইকোর্টে গড়ায়। সেখানে বিচারপতি উইলিয়ামস জব্দ করা সম্পদের সমস্ত নথিপত্র এবং দাবিগুলো গভীরভাবে পর্যালোচনা করেন।

বিচারপতি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, জব্দ করা সম্পদের একটি অংশের উৎস সম্পূর্ণ বৈধ এবং তা এই দম্পতির যৌথ বৈবাহিক সম্পত্তি। তিনি এমন ৬৬ লাখ ৬০ হাজার পাউন্ডের ‘বৈধ’ সম্পদ চিহ্নিত করেন এবং পুরো অর্থ বর্ষা গোহিলকে দেওয়ার রায় দেন।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘ডেইলি মেইল’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, রায় দেওয়ার সময় বিচারপতি উইলিয়ামস বলেন, ‘অসততা এবং এর পরিণতির দিক থেকে এই স্বামীর আচরণ নিকৃষ্টতম পর্যায়ের।’ তিনি ভদ্রেশের আত্মপক্ষ সমর্থনের কঠোর সমালোচনা করে তাকে ‘পুরোপুরি এবং আপাদমস্তক একজন অসৎ ব্যক্তি’ হিসেবে বর্ণনা করেন।

এই অবিশ্বাস্য ও দীর্ঘ আইনি জটিলতার কথা উল্লেখ করে বিচারপতি আরও মন্তব্য করেন, এই মামলাটি যে দীর্ঘ ও আঁকাবাঁকা পথ পাড়ি দিয়েছে, তার কারণে ‘গোহিল’ নামটি বিভিন্ন দেশের আইনজীবী ও বিচারকদের স্মৃতিতে দীর্ঘদিন অম্লান থাকবে।

গত মাসে যুক্তরাজ্যের আপিল আদালত জানিয়ে দিয়েছেন যে, এই রায়ের বিরুদ্ধে আর কোনো আপিল করা যাবে না। আর এর মাধ্যমেই অবসান ঘটল ২৩ বছর ধরে চলা এক ঐতিহাসিক ডিভোর্স যুদ্ধের।

সূত্র: এনডিটিভি

কেএন/টিএ

মন্তব্য করুন