© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

মিডলইস্ট আই-এর প্রতিবেদনট্রাম্পের ‘ইরান চুক্তি’ ভেঙে দিতে চান কেন নেতানিয়াহু?

শেয়ার করুন:
ট্রাম্পের ‘ইরান চুক্তি’ ভেঙে দিতে চান কেন নেতানিয়াহু?

ছবি: সংগৃহীত

মোজো ডেস্ক
০৪:৫২ পিএম | ০৮ জুন, ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য কূটনৈতিক সমঝোতার আলোচনা নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে এমন কোনো সমঝোতা ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে বলে মনে করেন বিশ্লেষক সামি আল-আরিয়ান।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডলইস্ট আই-এ প্রকাশিত এক নিবন্ধে তিনি দাবি করেন, নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা দৃষ্টিভঙ্গি এমন যে, ইরানকে আঞ্চলিকভাবে দুর্বল বা নিষ্ক্রিয় না করা পর্যন্ত তিনি কোনো স্থায়ী সমাধানকে সফল বলে মনে করেন না।

সামি আল-আরিয়ানের মতে, নেতানিয়াহুর বিশ্বাস হলো মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ইরান ও তার মিত্রগোষ্ঠীগুলো। তাই গাজায় হামাস, লেবাননে হিজবুল্লাহ কিংবা অঞ্চলের অন্যান্য ইরানপন্থী শক্তিকে দুর্বল না করে যুদ্ধের অবসান ঘটানো সম্ভব নয় বলে তিনি মনে করেন। বিশ্লেষকের ভাষ্য অনুযায়ী, নেতানিয়াহু এমন একটি আঞ্চলিক বাস্তবতা দেখতে চান যেখানে ইসরাইল হবে প্রধান প্রভাবশালী শক্তি এবং যুক্তরাষ্ট্র তার কৌশলগত নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে ভূমিকা পালন করবে।

নিবন্ধে বলা হয়েছে, গাজা, পশ্চিম তীর, লেবানন, সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেন এবং ইরানকে ঘিরে যে অস্থিরতা ও সংঘাত চলছে, সেগুলোকে আলাদা আলাদা ঘটনা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বরং এগুলো বৃহত্তর আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য ও প্রভাব বিস্তারের লড়াইয়ের অংশ। লেখকের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে সামরিক অভিযান এবং ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ সত্ত্বেও ইসরায়েল তার কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক লক্ষ্য পুরোপুরি অর্জন করতে পারেনি। তবে নেতানিয়াহু এটিকে কৌশলগত ব্যর্থতা হিসেবে না দেখে বরং আরও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা হিসেবে বিবেচনা করছেন।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক বাস্তবতা আগের তুলনায় অনেক ভিন্ন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি, যেখানে দেশের ভেতরে দীর্ঘস্থায়ী বিদেশি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার বিরোধিতা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সামরিক সম্পৃক্ততার বিষয়ে জনসমর্থন কমে এসেছে। রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—উভয় দলের অনেক ভোটারই বিদেশে ব্যয়বহুল সামরিক অভিযান চালানোর ব্যাপারে আগ্রহ হারিয়েছেন।

বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছেন, কেন মার্কিন জনগণকে অন্য দেশের নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষার জন্য অর্থনৈতিক ও সামরিক মূল্য দিতে হবে। তাদের বক্তব্যের সঙ্গে অনেক সাধারণ আমেরিকানও একমত হচ্ছেন। তারা মনে করেন, বিদেশি সংঘাতের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি পায়, অর্থনৈতিক চাপ বাড়ে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও বৃদ্ধি পায়।

এছাড়া আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রেক্ষাপটও ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্লেষকের মতে, যদি যুক্তরাষ্ট্র কোনো নতুন বৃহৎ সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে এবং তার নেতিবাচক প্রভাব অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পড়ে, তাহলে কংগ্রেসে ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তিত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ট্রাম্পের জন্য তার রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

আন্তর্জাতিক পর্যায়েও পরিস্থিতি বেশ সংবেদনশীল। নিবন্ধে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে সেখানে কোনো ধরনের অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হলে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যাহত হতে পারে এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থাও চাপের মুখে পড়তে পারে।

লেখক আরও উল্লেখ করেন যে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরান ও তার মিত্রগোষ্ঠীগুলোর বিভিন্ন হামলার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এর ফলে অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের সামরিক উপস্থিতি ও নিরাপত্তা কাঠামোর কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় কিছু সামরিক সরঞ্জাম ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী অস্ত্রের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় মার্কিন সামরিক সক্ষমতার ওপরও অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে বলে বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে।

সামি আল-আরিয়ানের মতে, এসব বাস্তবতা ওয়াশিংটনকে বুঝতে বাধ্য করছে যে শুধুমাত্র সামরিক শক্তির মাধ্যমে সব রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করা সবসময় সম্ভব নয়। দীর্ঘমেয়াদে সংঘাতের পরিবর্তে কূটনৈতিক সমাধান খোঁজাই অনেক ক্ষেত্রে বেশি কার্যকর হতে পারে।

নিবন্ধে আরও বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের অন্যতম লক্ষ্য ছিল ইরানকে এমন অবস্থায় নিয়ে যাওয়া, যাতে দেশটি তার পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করতে বাধ্য হয় এবং আঞ্চলিক প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনে। তবে লেখকের মতে, সেই লক্ষ্য পুরোপুরি অর্জিত হয়নি। একইভাবে ইরানও যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিকভাবে পরাজিত করতে পারেনি কিংবা অঞ্চল থেকে তাদের প্রভাব সম্পূর্ণভাবে সরিয়ে দিতে সক্ষম হয়নি। ফলে উভয় পক্ষ এমন এক বাস্তবতায় পৌঁছেছে, যেখানে কেউই নিজেদের কাঙ্ক্ষিত পূর্ণ বিজয় নিশ্চিত করতে পারছে না।

এই পরিস্থিতিতে ইরানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হতে পারে রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকা এবং নিজস্ব নীতিগত স্বাধীনতা বজায় রাখা। লেখকের মতে, কোনো যুদ্ধবিরতি বা রাজনৈতিক সমঝোতা যদি ইরানকে ধ্বংস না করেই সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ দেয়, তাহলে সেটিকে অনেকেই তেহরানের জন্য একটি কৌশলগত সাফল্য হিসেবে দেখবে। আর ঠিক এই কারণেই এমন সমঝোতা নেতানিয়াহুর কাছে অস্বস্তিকর হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

বিশ্লেষণে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, পাকিস্তানসহ কয়েকটি আঞ্চলিক দেশ ও কূটনৈতিক পক্ষের মাধ্যমে সম্ভাব্য একটি সমঝোতা কাঠামো নিয়ে আলোচনা চলছে বলে বিভিন্ন মহলে ধারণা করা হচ্ছে। আলোচনায় অন্তত ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি, হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করা, ইরানের ওপর আরোপিত কিছু অর্থনৈতিক বিধিনিষেধ আংশিকভাবে শিথিল করা এবং ভবিষ্যৎ আলোচনার জন্য একটি রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করার মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আপাতত ভবিষ্যতের আলোচনার জন্য রেখে দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

লেখকের মূল্যায়ন অনুযায়ী, এমন কোনো সমঝোতা কার্যকর হলে ইরান অর্থনৈতিকভাবে কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে তার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বা আঞ্চলিক মিত্রদের প্রভাব পুরোপুরি বিলুপ্ত হবে না। ফলে এই ধরনের সমঝোতা ইসরাইলের বর্তমান নেতৃত্বের প্রত্যাশার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।

সবশেষে সামি আল-আরিয়ান মন্তব্য করেন যে, মধ্যপ্রাচ্য বর্তমানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সন্ধিক্ষণে অবস্থান করছে। একদিকে রয়েছে সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা, অন্যদিকে রয়েছে আরও বিস্তৃত ও বিধ্বংসী আঞ্চলিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি। তার মতে, দীর্ঘমেয়াদে শুধুমাত্র সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে কোনো রাষ্ট্র আঞ্চলিক আধিপত্য ধরে রাখতে পারে না। তাই সংঘাতের পরিবর্তে আলোচনার পথ বেছে নেওয়া হলে তা অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য ইতিবাচক হতে পারে। তবে উত্তেজনা যদি আরও বাড়ে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্য নতুন করে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তা সংকটের মুখোমুখি হতে পারে।

টিজে/এসএন 

মন্তব্য করুন