বিশ্বকাপে কি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র মুখোমুখি হবে?
ছবি: সংগৃহীত
০৪:১১ পিএম | ১০ জুন, ২০২৬
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। যে হামলায় শীর্ষ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বকে হারায় ইরান। এর পাল্টা জবাব হিসেবে ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার ঘাটিসমূহে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে ইরান। সেই সংঘাত তখন থেকে চলমান এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ক্ষেপণাস্ত্র, যুদ্ধবিমান, ড্রোন, বিস্ফোরক নৌকা, সমুদ্র মাইনসহ নিজেদের হাতে থাকা অত্যাধুনিক সামরিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে যাচ্ছে।
একই সঙ্গে দুই দেশ যুদ্ধের অবসানের লক্ষ্যে পরোক্ষ আলোচনাও চালিয়ে যাচ্ছে। এ পর্যন্ত সংঘাতে হাজারো মানুষের মৃত্যু হয়েছে, লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকট সৃষ্টি হয়েছে। সংঘাতের তিন মাসের বেশি সময় পার হলেও কে এগিয়ে রয়েছে তা স্পষ্টভাবে বলা কঠিন। কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়েই ভিন্ন ভিন্ন কৌশলগত লক্ষ্য নিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে।
এমন অচলাবস্থার মধ্যেই ১১ জুন থেকে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় শুরু হতে যাচ্ছে বিশ্বকাপ ফুটবলের ২৩তম আসর। রাজনৈতিক সংঘাত সত্বেও ইরান সরকার দেশটির ফুটবল দলকে যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলতে পাঠিয়েছে। প্রধান ক্যাম্প হিসেবে ইরান মেক্সিকোর তিহুয়ানা শহরকে বেছে নিলেও গ্রুপ পর্বে তাদের তিনটি ম্যাচের ভেন্যুই যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্যে দুটি ক্যালিফোর্নিয়ায় এবং বাকি ম্যাচটির ভেন্যু ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্য।
ফুটবলপ্রেমী ও বিশ্লেষকদের মধ্যে এখন ব্যাপক আলোচনা চলছে, এই দুই ঐতিহাসিক প্রতিদ্বন্দ্বী কি এবারের বিশ্বকাপে কোনো পর্যায়ে মুখোমুখি হবে? আলাদা আলাদা গ্রুপে থাকলেও আসরের নকআউট পর্বে এই দুই দলের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না। আর অনেকেই এই সম্ভাব্য ম্যাচটিকে 'মাদার অব অল ম্যাচ' বলে আখ্যায়িত করছেন।
রাউন্ড অব ৩২-এ মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা
বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি নয়। তবে চলমান যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে সম্ভাব্য ম্যাচটি ব্যাপক আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
২০২৫ সালের ৫ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের ড্রয়ে দুই দলকে আলাদা গ্রুপে রাখা হয়। ইরান পড়েছে গ্রুপ ‘জি’-তে, যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ বেলজিয়াম, মিশর ও নিউজিল্যান্ড। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র রয়েছে গ্রুপ ‘ডি’-তে, যেখানে তাদের সঙ্গে আছে অস্ট্রিয়া, প্যারাগুয়ে ও তুরস্ক।
ফলে গ্রুপপর্বে দুই দলের মুখোমুখি হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তাদের দেখা হতে পারে শুধুমাত্র নকআউট পর্বে। সবচেয়ে বাস্তবসম্মত সম্ভাবনা হলো রাউন্ড অব ৩২। তবে এর জন্য উভয় দলকেই নিজেদের গ্রুপে রানার্স-আপ (দ্বিতীয় স্থান) হতে হবে।
ফিফার নকআউট ব্র্যাকেট বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, যদি যুক্তরাষ্ট্র গ্রুপ ডি-তে দ্বিতীয় হয় এবং ইরান গ্রুপ জি-তে দ্বিতীয় হয়, তাহলে টেক্সাসের আর্লিংটনে রাউন্ড অব ৩২ পর্বে তারা একে অপরের মুখোমুখি হবে।
২০২২ এর বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বের ম্যাচের পর যুক্তরাষ্ট্রের ব্রেন্ডন অ্যারনসন ইরানের আবুলফজল জালালিকে আলিঙ্গন করছেন। ছবি: রয়টার্স
রাউন্ড অব ১৬-তেও হতে পারে লড়াই
আরেকটি সম্ভাবনা হলো রাউন্ড অব ১৬-এ দুই দলের সাক্ষাৎ।
এক্ষেত্রে সমীকরণ তুলনামূলক সহজ; দুই দলকেই নিজেদের গ্রুপে চ্যাম্পিয়ন হতে হবে। এরপর রাউন্ড অব ৩২-এ নিজেদের প্রতিপক্ষকে হারিয়ে পরবর্তী পর্বে উঠতে হবে। যদি যুক্তরাষ্ট্র গ্রুপ ডি-এর শীর্ষে থাকে, তাহলে রাউন্ড অব ৩২-এর ম্যাচ ৮১-তে তারা গ্রুপ বি, ই, এফ, আই অথবা জে-এর কোনো তৃতীয়-স্থানধারী দলের মুখোমুখি হবে।
অন্যদিকে ইরান যদি গ্রুপ জি-এর শীর্ষে থাকে, তাহলে ম্যাচ ৮২-তে তারা গ্রুপ এ, ই, এইচ, আই অথবা জে-এর কোনো তৃতীয়-স্থানধারী দলের বিপক্ষে খেলবে। দুই দলই যদি নিজেদের ম্যাচ জিতে যায়, তাহলে রাউন্ড অব ১৬-এ বহু প্রতীক্ষিত যুক্তরাষ্ট্র–ইরান দ্বৈরথের মঞ্চ তৈরি হতে পারে।
কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হওয়ার ক্ষীণ সম্ভাবনা
যদিও গাণিতিক সম্ভাবনা বলছে কোয়ার্টার ফাইনালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দেখা হতে পারে, তবে এটি রাউন্ড অব ৩২ বা রাউন্ড অব ১৬-এর তুলনায় অনেক বেশি জটিল একটি সমীকরণ।
এক্ষেত্রে দুই দলের অন্তত একটিকে রানার্স আপ এবং অপরটিকে তৃতীয় হয়ে নকআউট পর্বে আসতে হবে।

উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্রকে গ্রুপ ডি-তে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করতে হবে, আর ইরানকে সেরা তৃতীয়-স্থানধারী দলগুলোর একটি হিসেবে নকআউট পর্বে উঠতে হবে এবং এমন একটি ব্র্যাকেটে পড়তে হবে, যা যুক্তরাষ্ট্রের একই পাশে অবস্থান করে।
এরপর দুই দলকেই রাউন্ড অব ৩২ এবং রাউন্ড অব ১৬-এর ম্যাচ জিততে হবে। তাহলেই কোয়ার্টার ফাইনালে তাদের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
অন্যদিকে, উল্টো পরিস্থিতিও সম্ভব। সেক্ষেত্রে ইরানকে গ্রুপ জি-তে দ্বিতীয় হতে হবে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে সেরা তৃতীয়-স্থানধারী দল হিসেবে নকআউট পর্বে উঠতে হবে। এরপর উভয় দল নিজেদের প্রথম দুই নকআউট ম্যাচ জিতলে কোয়ার্টার ফাইনালে তাদের দেখা হবে।
যুক্তরাষ্ট্র–ইরান অতীত লড়াই:
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এ পর্যন্ত তিনবার মুখোমুখি হয়েছে।
* ১৯৯৮ বিশ্বকাপে প্রথম দেখায় ইরান ২-১ গোলে জয় পায়।
* ২০০০ সালে একটি প্রীতি ম্যাচে দুই দল ১-১ গোলে ড্র করে।
* ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্র ১-০ গোলে জিতে গ্রুপপর্ব থেকে ইরানকে বিদায় করে।
১৯৯৮ বিশ্বকাপ: ‘মাদার অব অল গেমস’
১৯৯৮ বিশ্বকাপে দুই দেশের ম্যাচটি ছিল রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর। ১৯৭৯ সালের ইরান হস্টেজ ক্রাইসিসের দুই দশকেরও কম সময় পরে অনুষ্ঠিত হওয়ায় ম্যাচটিকে অনেক সংবাদমাধ্যম ও বিশ্লেষক ‘মাদার অব অল গেমস’ নামে অভিহিত করেছিল। তবে রাজনৈতিক উত্তেজনার মাঝেও ইরানের খেলোয়াড়রা ম্যাচের আগে মার্কিন খেলোয়াড়দের হাতে সাদা ফুল তুলে দেন, যা ছিল শান্তি ও সৌহার্দ্যের প্রতীক।
১৯৯৮ বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বের ম্যাচের আগে যুক্তরাষ্ট্রের খেলোয়াড়দের বরণ করে নেয় ইরানের খেলোয়াড়রা। সেই ম্যাচে যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে খেলেছিলেন বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের বর্তমান কোচ থমাস ডুলি। ছবি: এপি
এই অনন্য ক্রীড়াসুলভ আচরণের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় দলই ফিফার ফেয়ার প্লে পুরস্কার লাভ করে।
যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে সেই ম্যাচটি খেলেছিলেন বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের নতুন প্রধান কোচ থমাস ডুলি।
২০২৬ সালে কী অপেক্ষা করছে?
২০২৬ বিশ্বকাপে দুই দলেরই নকআউট পর্বে ওঠার সম্ভাবনা যথেষ্ট উজ্জ্বল। ফলে বহু প্রতীক্ষিত আরেকটি যুক্তরাষ্ট্র–ইরান দ্বৈরথের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
এশিয়া থেকে ইরান নিয়মিতই বিশ্বকাপে জায়গা করে নিলেও কখনোই গ্রুপ পর্বের বাধা পার হতে পারে না। এবার টুর্নামেন্টের ফরম্যাটের কারণে সেই সম্ভাবনা বেশ উজ্জ্বল। অন্যদিকে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র তাদের তথাকথিত ‘গোল্ডেন জেনারেশন’ নিয়ে এবার অনেক দূর যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে।
গ্রুপপর্ব শুরু হলে দুই দলের প্রকৃত শক্তি ও ফর্ম সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে। তখনই বোঝা যাবে রাউন্ড অব ৩২, রাউন্ড অব ১৬ কিংবা কোয়ার্টার ফাইনালে বহুল আলোচিত যুক্তরাষ্ট্র–ইরান ম্যাচ সত্যিই বাস্তবে রূপ নেয় কি না।
টিজে/টিএ