পূর্বসূরিদের তুলনায় ভিন্ন কৌশলে ইরানের নতুন নেতা, নিচ্ছেন বড় ঝুঁকি
ছবি: সংগৃহীত
০৬:২৪ এএম | ১১ জুন, ২০২৬
চলতি সপ্তাহে ইসরাইলে ইরানের চালানো ক্ষেপণাস্ত্র হামলাগুলোকে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে দুঃসাহসিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। দীর্ঘদিন ধরে ছায়া যুদ্ধ (প্রক্সি ওয়ার), গোপন অভিযান এবং মেপে মেপে পাল্টা জবাব দেওয়ার যে অলিখিত নীতি মধ্যপ্রাচ্যে চলে আসছিল, এই হামলার মাধ্যমে ইরান সেই চিরচেনা সমীকরণটি ভেঙে দিতে চাইছে।
লেবাননে ইসরাইলি হামলার জবাবে সরাসরি ইসরাইলকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে তেহরান মূলত এই বার্তাই দিল যে, তাদের ‘রেড লাইন’ বা চূড়ান্ত সীমা এখন আর কেবল নিজেদের সীমান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। একই সাথে ইরানের বর্তমান নেতৃত্ব যে কোনো বড় ঝুঁকি নিতেও প্রস্তুত।
গত ৮ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও তেহরানের অভিযোগ- ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে এই যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করছে। একদিকে যখন পরোক্ষ কূটনৈতিক আলোচনা চলছিল, অন্যদিকে তখন মার্কিন বাহিনী ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। পাশাপাশি লেবাননের প্রধানমন্ত্রীর তথ্যমতে, যুদ্ধবিরতির শর্ত উপেক্ষা করে ইসরাইল লেবাননে (এমনকি রাজধানী বৈরুতেও) প্রায় ৩,৫০০ বার হামলা চালিয়েছে।
এর জবাবে ইরান প্রথমে মার্কিন ও পারস্য উপসাগরীয় লক্ষ্যবস্তুগুলোতে সীমিত আকারে পাল্টা হামলা চালায়। তবে তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছিল যে, কূটনীতি ব্যর্থ হলে তারা ভারত মহাসাগর থেকে শুরু করে লোহিত সাগর এবং ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত নৌপথ অবরুদ্ধ করে যুদ্ধ আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে দেবে। গত মঙ্গলবার রাতে একটি মার্কিন সামরিক হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার পর দুই পক্ষের মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া গোলাগুলি পুরো অঞ্চলের পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলেছে।
আঞ্চলিক মিত্রদের রক্ষায় অনড় তেহরান
চলতি সপ্তাহে ইসরাইলে চালানো হামলার মাধ্যমে ইরান স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, তাদের আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর ইসরাইলি হামলা হলে তেহরান আর চুপ থাকবে না, বরং সরাসরি জবাব দেবে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো অন্তর্বর্তীকালীন শান্তি চুক্তির আলোচনায় সৃষ্ট কূটনৈতিক অচলাবস্থা ভাঙা এবং হিজবুল্লাহকে সমর্থন জোগানো।
ইরানের প্রধান আলোচক ও পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ গত সোমবার বলেন, "কাগজে-কলমে থাকা যে যুদ্ধবিরতি মাটিতে বারবার লঙ্ঘন করা হচ্ছিল, আমরা সেই সমীকরণটি উল্টে দিয়েছি। যতক্ষণ না প্রকৃত বিশ্বাস গড়ার সদিচ্ছা দেখা যাবে, ইরানের প্রতিক্রিয়া এমনই থাকবে।"
বিশ্লেষকদের মতে, তেহরানের এই মনোভাবের পেছনে রয়েছে দেশটির নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব। তারা ইসলামি প্রজাতন্ত্রটির দীর্ঘদিনের চেনা কৌশল ‘কৌশলগত ধৈর্য’ এবং রক্ষণাত্মক অবস্থান থেকে সরে আসছেন। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে তারা এখন সরাসরি সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি ব্যবহারে অনেক বেশি ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত।
এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ইরানের বর্তমান নেতৃত্বকে আগের চেয়ে "বেশি যৌক্তিক" এবং "যথেষ্ট বাস্তবসম্মত" বলে বর্ণনা করেছেন।
সিএনএন-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন সাবেক মধ্যপ্রাচ্য শান্তি আলোচক অ্যারন ডেভিড মিলার বলেন, "ইরানিরা এখন ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রকে বেশ চাপে ফেলে দিয়েছে। তারা ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত এবং তারা মনে করছে এই পরিস্থিতিতে তারাই জিতছে। বর্তমান যুদ্ধবিরতি তাদের স্বার্থ রক্ষা করছে না।"
বদলে যাওয়া রণকৌশল
২০২০ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে মার্কিন হামলায় ইরানের শীর্ষ জেনারেল কাসেম সোলেইমানি নিহত হওয়ার পর তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির অধীনে ইরান অত্যন্ত সতর্কভাবে জবাব দিয়েছিল। ইরাকে মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগে তারা মার্কিন বাহিনীকে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সময় দিয়েছিল, যাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যায়। এমনকি ২০২৫ সালের জুনে মার্কিন-ইসরাইল যৌথ হামলার জবাবেও ইরান সমানুপাতিক ও নিয়ন্ত্রিত প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল।
তবে মার্কিন থিংক ট্যাংক ‘কুইন্সি ইনস্টিটিউট’-এর নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পার্সি মনে করেন, এবারের হিসাব-নিকাশ ভিন্ন। তিনি বলেন, "গত কয়েক দশকের মধ্যে এবারই প্রথম কোনো আঞ্চলিক শক্তি ইসরাইলের সামরিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সরাসরি এভাবে কঠোর সামরিক শক্তিপ্রয়োগের সক্ষমতা ও সদিচ্ছা দেখাল।"
ইসরাইলের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার ইরান শাখার সাবেক প্রধান ড্যানি সিট্রিনোভিচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ লিখেছেন, "গত ২৪ ঘণ্টার ঘটনা আবারও প্রমাণ করেছে যে, ইরানের বর্তমান নেতৃত্ব বিশ্বাস করে— যা কূটনীতির মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব নয়, তা শেষ পর্যন্ত শক্তিপ্রয়োগের মাধ্যমেই আদায় করতে হবে।"
ওয়াশিংটন-তেল আবিব ফাটলের সুযোগ নিচ্ছে ইরান
এই সংঘাতের শেষ কোথায়, তা নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের মধ্যে তৈরি হওয়া মতভেদকেও কাজে লাগাতে চাচ্ছে ইরান। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ট্রাম্প প্রকাশ্যেই ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাথে দ্বিমত পোষণ করেছেন এবং জোর দিয়ে বলেছেন যে তেহরানের সাথে একটি কূটনৈতিক চুক্তি সম্ভব এবং ইসরাইল তা মেনে নিতে বাধ্য হবে।
ইরানের এই কৌশল কাজও করছে। গত সোমবার ইসরাইলে ইরানের হামলার পর ট্রাম্প পরিস্থিতি শান্ত করতে নেতানিয়াহুর সাথে পরপর দুইবার ফোনে কথা বলেন এবং তাকে পাল্টা হামলা না চালানোর অনুরোধ জানান।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই স্পষ্ট করে বলেছেন, ইসরাইলের কর্মকাণ্ডের দায় ওয়াশিংটনকেই নিতে হবে এবং এটি কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করবে। অন্যদিকে, একজন ইসরাইলি সামরিক কর্মকর্তা জোর দিয়ে বলেছেন যে, ইরানের ওপর তাদের হামলায় মার্কিন বাহিনীর কোনো ভূমিকা ছিল না, তবে তারা ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করতে সহায়তা করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এখন ওয়াশিংটনকে এমন এক দোলাচলের মধ্যে ফেলে দিয়েছে যেখানে যুক্তরাষ্ট্রকে হয় ইসরাইলের সামরিক স্বাধীনতা রক্ষা করতে হবে, নয়তো ইরানের সাথে কূটনৈতিক পথ সচল রাখতে হবে।
সূত্র: সিএনএন
এসকে/টিএ