অনলাইনে হাজিরা দিতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গাছের মাথায় শিক্ষক, নেট দুনিয়ায় ভাইরাল!
ছবি: সংগৃহীত
১০:৪৩ পিএম | ১৫ জুন, ২০২৬
সারাদেশে প্রাথমিক শিক্ষকদের অনলাইনে হাজিরার নির্দেশনা দিয়েছে সরকার। আর এই নির্দেশনা অনুযায়ী অনলাইনে হাজিরা দিতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাহাড়ের চূড়ায় গাছের উপরে উঠতে হয়েছে রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার পাকুজ্জোছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আবু তাহেরকে।
এ ঘটনার একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
এতে দেখা যায়, একটি আম গাছের উপর উঠে অনলাইনে হাজিরা দিচ্ছেন মোহাম্মদ আবু তাহের।
রাঙামাটি জেলার সীমান্তবর্তী বাঘাইছড়ি উপজেলাধীন পাকুজ্জোছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। উপজেলা সদর থেকে দুই কিমি দূরে রূপকারী ইউনিয়নের পাকুজ্জোছড়ি নামক স্থানে এর অবস্থান। দুই পাহাড়ের মাঝখানে প্রায় তিন থেকে চারশত ফুট নিচে ধানী জমিতে এক তলা বিশিষ্ট স্কুলটি অবস্থিত।
সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী, সকাল ৯টার মধ্যে স্কুলে হাজির হয়ে শিক্ষকদের হাজিরা খাতা অনলাইনে (হোয়াটসঅ্যাপে) উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে পাঠাতে হবে। শিক্ষা কর্মকর্তা পাঠাবেন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে। এভাবে পর্যায়ক্রমে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিদিনের তথ্য পৌঁছাবে।
সোমবার (১৫ জুন) থেকে সরকারের এই নির্দেশনা কার্যকর হয়েছে। এদিন পঞ্চাশোর্ধ্ব শিক্ষক মোহাম্মদ আবু তাহেরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আজ থেকে অনলাইনে শিক্ষক হাজিরা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আমার স্কুলটি পাহাড় থেকে প্রায় ৩-৪০০ ফুট নিচে অবস্থিত। সকালে স্কুলে এসে হাজিরা খাতার ছবি তুলে পাঠানোর জন্য ছাদে উঠলাম। কিন্তু সেখানে নেট নেই। এরপর আবারও ৩-৪০০ ফুট পাহাড়ের চূড়ায় উঠে কোথাও নেট পাচ্ছিলাম না। অবশেষে আম গাছের ডালে উঠে কোনোমতে নেট পেয়েছিলাম। আর সেখান থেকে অনেক কষ্টে টিও স্যারের (উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা) হোয়াটসঅ্যাপে হাজিরা খাতার ছবিটা পাঠালাম। তবে ছবিটা পাঠাতে দেরি হওয়াতে টিও স্যার ধমক দিয়েছেন।
গাছে উঠে এভাবে হাজিরা দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ নয় কি, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পেটের দায়ে চাকরি করি, চাকরি বাঁচাতে রিস্ক নিতেই হবে। চাকরি না থাকলে আমার ঘরের চারটি পেট কেমনে চলবে?
বাঘাইছড়ি উপজেলায় ১১৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে প্রথমদিন (সোমবার) কয়টি স্কুলের হাজিরা নিশ্চিত হয়েছে জানতে চাইলে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) সঞ্চয়ন চাকমা বলেন, ৮৮টি স্কুলের অনলাইন হাজিরা পেয়েছি। ২৮টি স্কুলের ৮৩ জন শিক্ষকের অনলাইন হাজিরা পাইনি।
যা পেয়েছেন তা যথাসময়ে পেয়েছেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যেখানে ফোর জি নেট রয়েছে সেগুলো অনলাইনে পেয়েছি আর যেখানে ফোর জি নেট নেই সেই স্কুলগুলো মোবাইলে ম্যাসেজ করে দিয়েছে। আগামীকাল (মঙ্গলবার) হাজিরার সংখ্যা বাড়তে পারে।
অনলাইন হাজিরা নিয়ে জেলা প্রাথমিক প্রধান শিক্ষক সমিতির সভাপতি নজির আহমদ তালুকদার বলেন, অনলাইনে শিক্ষক হাজিরার বিষয়টা অবশ্যই সরকারের ইতিবাচক সিদ্ধান্ত। আমরা সরকারের যেকোনো সিদ্ধান্তকে সম্মান করি। কিন্তু অনলাইন হাজিরা সমতলের শিক্ষকরা যত সহজে পারবেন। পাহাড়ে তা অনেক কঠিন ব্যাপার। কারণ রাঙামাটি জেলার এমন অনেক জায়গা আছে, যেখানে এখনো মোবাইল নেটওয়ার্কতো দূরের কথা, বিদ্যুৎও পৌঁছায়নি। প্রত্যন্ত অঞ্চলের কথা বাদ দিলাম, রাঙামাটি সদরের অনেক জায়গায়ও এখনও ঠিকমতো নেট পাওয়া যায় না। তাই পাহাড়ের বিষয়টি বিশেষ বিবেচনার জন্য সরকারের প্রতি অনুরোধ করছি।
রাঙামাটি জেলায় মোট ৭০৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। সব জায়গায়তো নেট নেই, কয়টি স্কুলের শিক্ষক হাজিরা পেয়েছেন এবং যেসমস্ত স্কুলের পাননি সে ব্যাপারে কী ব্যবস্থা নিচ্ছেন তা জানতে মুঠোফোনে কথা হয় রাঙামাটি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ডিপিইও) কফিল উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি জানান, আপাতত
নির্দেশনা হলো হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে তথ্য কালেক্ট করা। যেগুলো নেটওয়ার্কের আওতায় আছে সেগুলোর তথ্য দিচ্ছি। যেগুলো মোবাইল এসএমএসে সম্ভব সেগুলো কালেক্ট করছি। বাকিগুলোর তালিকা পাঠাব ঢাকায়। ওখানকার নির্দেশনার আলোকে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রাঙামাটি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্যমতে, জেলার ৭০৮টি স্কুলের মধ্যে প্রথমদিন (সোমবার) ৫৩৮টি স্কুলের শিক্ষক হাজিরা পাওয়া গেছে। বাকি ১৭০টি স্কুল মোবাইল নেটওয়ার্কের বাইরে থাকায় শিক্ষক হাজিরা পাওয়া যায়নি।
এসকে/এসএন