নতুন সমীকরণে লাভবান ইরান, উদ্বিগ্ন প্রতিদ্বন্দ্বীরা
ছবি: সংগৃহীত
০৮:৪৫ এএম | ১৯ জুন, ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া নতুন সমঝোতা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিতের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর এই প্রথম কোনো মার্কিন ও ইরানি প্রেসিডেন্টের মধ্যে আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয়েছে। সমর্থকদের কাছে এটি ‘শতাব্দীর সেরা চুক্তি’ হিসেবে বিবেচিত হলেও ইসরাইল ও উপসাগরীয় দেশগুলো কাছে এটি উদ্বেগের কারণ।
বুধবার (১৭ জুন) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন, যার মাধ্যমে তিন মাসের যুদ্ধের অবসান ঘটে। জি-৭ সম্মেলনের ফাঁকে ফ্রান্সের ভার্সাইয়ে চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পন্ন হয়।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৪ দফার এই সমঝোতার আওতায় ৬০ দিনের জন্য যুদ্ধবিরতি বাড়ানো হয়েছে, যার মধ্যে লেবাননও অন্তর্ভুক্ত। এ সময়ের মধ্যে স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে আলোচনা চলবে এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে।
লেবাননের বিশ্লেষক সারকিস নাওমের মতে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের জন্য এটি একটি বড় সমঝোতা, যার সফল হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। নিষেধাজ্ঞার চাপে ইরান আর অর্থনৈতিক সংকট দীর্ঘায়িত করতে পারবে না, আবার ট্রাম্পও নতুন যুদ্ধ শুরু করতে আগ্রহী নন।
ইসরাইলের জন্য ধাক্কা
ইসরাইলের জাতীয় নিরাপত্তা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ গবেষক ড্যানি সিট্রিনোভিচ এই চুক্তিকে কৌশলগত ‘বিপর্যয়’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, যে অভিযানের লক্ষ্য ছিল ইরানের শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল বা উৎখাত করা, সেটিই শেষ পর্যন্ত ইরানকে আরও বৈধতা দিয়েছে।
সিট্রিনোভিচ বলেন, ইসরাইলের প্রধান দাবিগুলোর কোনোটিই এই চুক্তিতে প্রতিফলিত হয়নি। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বা আঞ্চলিক মিত্রগোষ্ঠীগুলোর ওপর কোনো সীমাবদ্ধতা নেই, এমনকি পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ভেঙে ফেলারও সুস্পষ্ট পথ নির্ধারণ করা হয়নি। এই চুক্তি ইরানকে আরও কৌশলগত সুযোগ দিয়েছে এবং একই সঙ্গে ইসরাইলকে আরও বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
শক্তিশালী অবস্থানে ইরান
বিশ্লেষকদের মতে, চুক্তি কার্যকর থাকলে ইরান যুদ্ধের অবসান, ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ, তেল রপ্তানি পুনরায় বৃদ্ধি এবং পুনর্গঠনের জন্য বিপুল অর্থায়নের সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থাও কার্যত আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাবে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যে লক্ষ্যগুলো ছিল—ইরানের ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার পতন, পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস এবং আঞ্চলিক প্রভাব কমানো—তার কোনোটিই পুরোপুরি অর্জিত হয়নি বলে মনে করছেন সমালোচকরা।
চুক্তির ফলে লেবাননেও ইরানের প্রভাব আরও শক্তিশালী হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তেহরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর অবস্থান আরও সুদৃঢ় হতে পারে এবং দেশটি বৃহত্তর যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার অংশ হয়ে উঠতে পারে। যদিও লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন সম্প্রতি বলেছেন, যুদ্ধবিরতি বা দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহারের মতো বিষয়ে ইরান লেবাননের পক্ষে আলোচনা করতে পারে না।
তবে হিজবুল্লাহ-ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলোর দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচনার ফলে লেবাননের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে, কারণ উভয় পক্ষই নিজেদের মিত্রদের ওপর প্রভাব খাটিয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে পারবে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর উদ্বেগ
চুক্তি নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ দেখা দিয়েছে উপসাগরীয় দেশগুলোতে। তাদের আশঙ্কা, এটি অঞ্চলে ইরানের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে এবং দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করবে। উপসাগরীয় সূত্রগুলোর মতে, এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার ওপর আস্থা হারাতে পারে দেশগুলো এবং ভবিষ্যতে ইরানের সঙ্গে সমঝোতার পথ আরও জোরালো করতে পারে।
তবে ওয়াশিংটনের মধ্যপ্রাচ্য ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক অ্যালেক্স ভাতানকা মনে করেন, বহু বছরের চাপ প্রয়োগের কৌশল ব্যর্থ হওয়ার পর এটি সবচেয়ে বাস্তবসম্মত সমাধান। তার মতে, বৃহত্তর যুদ্ধ হলে উপসাগরীয় অঞ্চল কয়েক দশকের জন্য অস্থিতিশীল হয়ে পড়তে পারত।
‘বড় পরীক্ষা এখনও বাকি’
বিশ্লেষকদের মতে, চুক্তি বাস্তবায়ন, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ভবিষ্যৎ আলোচনা এবং আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়াই নির্ধারণ করবে এই সমঝোতার প্রকৃত সাফল্য। তাদের ধারণা, পুরো প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তার জায়গা হতে পারে ইসরাইল। যদিও ট্রাম্পের পৃষ্ঠপোষকতায় এগোনো এই প্রক্রিয়া পুরোপুরি ভণ্ডুল করার সম্ভাবনা কম, তবুও বিশেষ করে লেবানন ইস্যুতে নতুন উত্তেজনা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়ে গেছে।
একজন ইরানি কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, যুদ্ধের পর ইসরাইল আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক উভয় ক্ষেত্রেই আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। তার দাবি, ইরান তার লক্ষ্য অর্জন করেছে এবং হিজবুল্লাহর মতো মিত্রদের ত্যাগ না করেই আলোচনায় অংশ নিয়েছে।
টিজে/এসএন