ভারতকে পুশ-ইন বন্ধের আহ্বান জানাল হিউম্যান রাইটস ওয়াচ
ছবি: সংগৃহীত
০৪:৫৮ পিএম | ১৯ জুন, ২০২৬
গত বেশ কিছুদিন ধরে বাংলাদেশ সীমান্তে যে ‘পুশ-ইন’ প্রক্রিয়া শুরু করেছে ভারত, তা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। এ ইস্যুতে সম্প্রতি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সংস্থাটি, সেখানেই জানানো হয়েছে এ আহ্বান।
বুধবার প্রকাশিত সেই প্রতিবদেনে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কভিত্তিক এই সংস্থাটি বলেছে, “যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই জাতিগতভাবে বাঙালি - যাদের অধিকাংশই পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা এবং মুসলমান - তাদের জোর করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাচ্ছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ।”
প্রতিবেদনের শুরুতে আরো বলা হয়েছে, ‘‘ভারতের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ)-এর এ পদক্ষেপ এবং তাদের (জোর করে পাঠানো মানুষ) প্রবেশ ঠেকাতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি)-এর প্রচেষ্টার ফলে দুই দেশের মাঝের শূন্যরেখায় বহু পরিবার আটকা পড়েছে।’
বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষীদের উদ্ধৃত করে জানানো হয়, গত ১ জুন থেকে এ পর্যন্ত বিএসএফের ২১টি ‘পুশ-ইনের’ প্রচেষ্টা ব্যর্থ করা হয়েছে। এসব প্রচেষ্টার মাধ্যমে শিশুসহ দুই শতাধিক মানুষকে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোয় ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল।
প্রতিবেদনে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর এশিয়া অঞ্চলের ডেপুটি ডিরেক্টর মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, “ভারতীয় কর্তৃপক্ষ পরিবারগুলোকে মৌলিক মানবাধিকার উপেক্ষা করে নিষ্ঠুরভাবে বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে, কিংবা সীমান্তে আটকে পড়া অবস্থায় ফেলে রাখছে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের উচিত মানুষকে বেআইনিভাবে বহিষ্কার করা বন্ধ করা, আইনি ও পদ্ধতিগত সুরক্ষা নিশ্চিত করা, নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা এবং মুসলিমদের সঙ্গে এ উদ্বেগজনক বিদ্বেষমূলক আচরণের অবসান ঘটানো।”
প্রতিবেদনে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানায়, এ প্রতিবেদন তৈরির সময় এমন ৯জনের সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছে, যারা ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে রাতে মানুষকে সীমান্তে নিয়ে এসে কাঁটাতারের বেড়ার ফাঁক দিয়ে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে পাঠাতে দেখেছেন। বেশ কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী ঠেলে পাঠানো মানুষদের প্রবেশ করতে না দেওয়ায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষীরা শেষ পর্যন্ত ওই মানুষদের ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেয় বলেও প্রতিবেদনে জানানো হয়।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, পশ্চিমবঙ্গে গত মার্চের নির্বাচনের ঠিক আগে নির্বাচন কমিশন তড়িঘড়ি ও বিতর্কিত প্রক্রিয়ায ভোটার তালিকা সংশোধন শেষ করে৷ এর ফলে তালিকা থেকে ৯০ লাখেরও বেশি মানুষের নাম বাদ পড়ে যায়৷ বাদ পড়াদের জন্য তাতে আটক ও দেশত্যাগে বাধ্য করার হুমকি তৈরি হয় বলেও উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে। আরো বলা হয়, এর আগে ২০১৯ সালে আসাম রাজ্যে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের ‘ত্রুটিপূর্ণ ও বৈষম্যমূলক' প্রক্রিয়ার কারণে ১৯ লাখেরও বেশি মানুষ ‘রাষ্ট্রহীন' হয়ে পড়ে, হাজার হাজার বাংলাভাষীকে আটক কেন্দ্রে রাখা হয় এবং তাদের মধ্যে অনেককে বেআইনিভাবে ‘বহিষ্কার' করা হয়।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ মনে করে, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে আটক ও বহিষ্কার করা মৌলিক মানবাধিকারের লঙ্ঘন। তাছাড়া খাদ্য, পানি, আশ্রয় বা চিকিৎসাসেবা ছাড়া মানুষকে কোথাও ফেলে রাখা নিষ্ঠুর, অমানবিক এবং মর্যাদাহানিকর আচরণের শামিল বলেও বিবেচনা করে এই সংস্থা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “ভারত সরকারের উচিত বহিষ্কারের আশঙ্কায় থাকা সব মানুষের জন্য মৌলিক আইনি সুরক্ষার সুযোগ, অর্থাৎ, বহিষ্কারের কারণ সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়ার অধিকার, আইনি প্রতিনিধিত্বের অধিকার এবং বহিষ্কারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ নিশ্চিত করা।”
এছাড়া শিশুদের বহিষ্কার করা, কিংবা অসহায় অবস্থায় ফেলে রাখাকে শিশু অধিকার সনদের লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়, এ সনদ অনুযায়ী, শিশুদের জাতীয়তা বজায় রাখার অধিকারকে সম্মান করতে এবং স্বাধীনতা থেকে তাদের বঞ্চিত করা থেকে বিরত থাকতে রাষ্ট্র বাধ্য। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ মনে করে, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে এমন দ্বিপাক্ষিক ব্যবস্থা রয়েছে যার মাধ্যমে নাগরিকত্ব যাচাই এবং নাগরিকদের সুশৃঙ্খলভাবে হস্তান্তর করা সম্ভব। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ বারবার সেই প্রক্রিয়াগুলো এড়িয়ে চলায় মানুষ এখন দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মাঝখানে আটকা পড়ছেন এবং এর ফলে তাদের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর এশিয়া অঞ্চলের উপ-পরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, “জাতীয়তা যা-ই হোক না কেন, দুই দেশের সশস্ত্র সীমান্তরক্ষীদের মাঝখানে খোলা মাঠে কাউকে রাত কাটাতে বাধ্য করা উচিত নয়। ভারতের উচিত এই নিষ্ঠুর বহিষ্কার-প্রক্রিয়া বন্ধ করা৷ সীমান্ত ব্যবস্থাপনার বিষয়টি যেন কখনো মৌলিক মানবিক মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ না করে তা দুই দেশের সরকারেরই নিশ্চিত করা উচিত।”
এসএ/এসএন