ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬আইভরি কোস্টকে হারালেই বিশ্বকাপের দুঃস্বপ্ন কাটবে জার্মানির
ছবি: সংগৃহীত
০৯:১৮ পিএম | ২০ জুন, ২০২৬
২০১৮ এবং ২০২২ সালের বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব থেকেই লজ্জাজনক বিদায়ের পর, জার্মানি এবারের টুর্নামেন্টে এসেছে একরকম লাইমলাইটের আড়ালে থেকেই। ফুটবল বিশ্বের এই চিরন্তন পরাশক্তি এবার তাদের পঞ্চম বিশ্বকাপ উঁচিয়ে ধরার দৌড়ে ফেভারিটদের তালিকায় রয়েছে মাত্র সপ্তম স্থানে।
নিজেদের প্রথম ম্যাচ জিতে জার্মানি অন্তত সেই কাজটা করে দেখিয়েছে, যা তারা সবশেষ দুই বিশ্বকাপে করতে পারেনি। ফলে ২০১৪ সালের সেই ঐতিহাসিক বিশ্বকাপ ফাইনালের পর, এবারই প্রথম নকআউট পর্বে যাওয়া প্রায় নিশ্চিত মনে হচ্ছে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের। তবে গ্রুপ তারা চ্যাম্পিয়ন হয়ে পরের রাউন্ডে যাবে, নাকি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে টেবিলের নিচের পজিশন নিয়ে পার হবে—তা অনেকটাই নির্ভর করছে আজ টরন্টোতে আইভরি কোস্টের বিপক্ষে ম্যাচের ফলের ওপর। বাংলাদেশ সময় আজ রাত দুটায় মুখোমুখি হবে এই দুই দল।
গ্রুপ ‘ই’-তে নিজেদের প্রথম ম্যাচে জার্মানি-আইভরি কোস্ট দুই দলই অবশ্য জয়ের মুখ দেখেছে। তবে তাদের সেই জয়ের গল্পটা ছিল একদম ভিন্ন ঘরানার। জুলিয়ান নাগলসম্যানের দল শুরুতে কুরাসাওয়ের কাছে গোল খেয়ে কিছুটা চমকে গেলেও, শেষ পর্যন্ত প্রতিপক্ষকে ৭-১ গোলে উড়িয়ে দিয়ে মাঠ ছাড়ে। অন্য দিকে, ‘দ্য এলিফ্যান্টস’ খ্যাত আইভরি কোস্টের জয়টি ছিল চরম ভাগ্যের ছোঁয়া মাখানো; দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ইকুয়েডরের তিনটি শট পোস্টে লেগে ফিরে আসার পর, ম্যাচের একদম শেষ মুহূর্তের নাটকীয় গোলে ১-০ ব্যবধানের এক ঘামঝরানো জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে আফ্রিকান পরাশক্তিরা।
আইভরি কোস্টের বিপক্ষে একটি জয় জার্মানির জন্য সরাসরি সেরা দুইয়ে থেকে শেষ ৩২ যাওয়া নিশ্চিত করে দেবে। শুধু তাই নয়, এই ম্যাচের চার ঘণ্টা পর কানসাস সিটিতে হতে যাওয়া ম্যাচে ইকুয়েডর যদি কুরাসাওকে হারাতে ব্যর্থ হয়, তবে গ্রুপ ‘ই’-এর চ্যাম্পিয়ন হওয়াটাও অনেকটাই নিশ্চিত হয়ে যাবে জার্মানদের।

তবে সবকিছু পরিকল্পনা মতো না হলে দেখতে হতে পারে অন্য দৃশ্যও। জার্মানি আইভরি কোস্টকে হারানোর পরও ইকুয়েডর যদি তাদের শেষ দুটি ম্যাচে—প্রথমে কুরাসাও এবং গ্রুপের শেষ ম্যাচে জার্মানিকে হারিয়ে দেয়, তবে সমীকরণটা দারুণ আকর্ষণীয় মোড় নেবে। সেক্ষেত্রে জার্মানি, আইভরি কোস্ট এবং ইকুয়েডর—তিন দলেরই পয়েন্ট গিয়ে দাঁড়াতে পারে সমান ৬-এ! আর তখনই গ্রুপ টেবিলের ভাগ্য নির্ধারণে প্রয়োজন পড়বে সেই নতুন টাইব্রেকার নিয়মের মারপ্যাঁচ।
গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন বা রানার্স-আপ হওয়ার হিসাবটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গ্রুপে যারা প্রথম হবে, তারা নকআউট পর্বে খেলবে অন্য গ্রুপের সুবিধাজনক কোনো তৃতীয় স্থান অর্জনকারী দলের বিপক্ষে। অন্য দিকে, রানার্স-আপ হওয়া দলকে শেষ ৩২-এ মুখোমুখি হতে হবে ফ্রান্স, নরওয়ে, সেনেগাল এবং ইরাককে নিয়ে গঠিত কঠিন গ্রুপটির রানার্স-আপ দলের সঙ্গে। আর কোনোমতে তৃতীয় হয়ে পরের রাউন্ডে যাওয়া দলটিকে লড়তে হবে কোনো এক শক্তিশালী গ্রুপ চ্যাম্পিয়নের বিরুদ্ধে; যা হতে পারে সময়ের অন্যতম পরাশক্তি ইংল্যান্ড কিংবা মেক্সিকো!
অবশ্য সম্প্রতি যে ছন্দে আছে জার্মানি, তাতে কঠিন সব সমীকরণ নিয়ে না ভাবলেও হয়তো চলবে তাদের। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত তারা টানা ১০টি ম্যাচে জয়ের ধারায় রয়েছে এবং এই ম্যাচগুলোর ৯টিতেই তারা প্রতিপক্ষের জালে দুই বা ততোধিক গোল পুরেছে।
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠ বলছে, মাঠের অন্য প্রান্তে অর্থাৎ নিজেদের রক্ষণে চরম ভুগছে জার্মানরা। বিশ্বকাপে টানা ৭টি ম্যাচে তারা গোল হজম করেছে, যা ১৯৭০ সালের পর তাদের সবচেয়ে দীর্ঘতম গোল খাওয়ার রেকর্ড। আর বিশ্বমঞ্চে জার্মানি সর্বশেষ ‘ক্লিন শিট’ (কোনো গোল না খাওয়া) পেয়েছিল সেই ২০১৪ সালে, ব্রাজিলের মাটিতে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ঐতিহাসিক ফাইনাল ম্যাচে!
অন্য দিকে, আইভরি কোস্ট মাঠে নামছে টানা পঞ্চম জয়ের খোঁজে।
ইকুয়েডরকে হারানোর পাশাপাশি বিশ্বকাপের ঠিক আগে, গত ৪ জুন প্যারিসের মাটিতে প্রীতি ম্যাচে বিশ্ব র্যাংকিংয়ের তিন নম্বর দল ফ্রান্সকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়েছিল তারা; যা আফ্রিকান এই দলটির আত্মবিশ্বাসকে এখন তুঙ্গে নিয়ে গেছে। চলতি বছরে তাদের সর্বশেষ পরাজয়টি এসেছিল গত জানুয়ারিতে, আফ্রিকান কাপ অব নেশনসের (আফকন) কোয়ার্টার ফাইনালে মিশরের বিপক্ষে।
জার্মান কোচ ইউলিয়ান নাগেলসম্যান সম্ভবত কুরাসাওকে গুঁড়িয়ে দেওয়া সেই একই একাদশের ওপরই ভরসা রাখতে যাচ্ছেন। তবে সেটা হলে ডেনিজ উন্দাভের জন্য কিছুটা নির্মমই হবে। স্টুটগার্টের এই ফরোয়ার্ড গত ম্যাচে বদলি হিসেবে জামাল মুসিয়ালার জায়গায় মাঠে নেমেছিলেন; শেষ ২৬ মিনিট খেলেই তিনি নিজে এক গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন আরও দুটি। যার ওপর ভর করে ২০১৪ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের বিপক্ষে সেই ঐতিহাসিক সেমিফাইনালের পর নিজেদের সবচেয়ে বড় জয়টি তুলে নেয় জার্মানি। মাঠের যেকোনো পজিশনে খেলতে অভ্যস্ত এই উন্দাভ ‘ডাই মানশাফট’দের হয়ে মাত্র ১০ ম্যাচে মাঠে নেমেই ইতিমধ্যে ৭টি গোল ও ৪টি অ্যাসিস্ট নিজের নামের পাশে যোগ করেছেন।
আইভরি কোস্টের কোচ এমার্স ফায়ে-কে অবশ্য একাদশ সাজাতে বেশ কিছু কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ইকুয়েডরের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে আক্রমণভাগে শুরু করেছিলেন ইলি ওয়াহি। তবে ম্যাচের এক ঘণ্টা পার হওয়ার ঠিক আগেই তাঁর জায়গায় মাঠে নামানো হয় অঁজে-ইয়োয়ান বোনিকে।
ভিসা জটিলতার কারণে ইলি ওয়াহির এই ম্যাচের জন্য কানাডায় প্রবেশাধিকার প্রথমে আটকে দেওয়া হয়েছিল। গত মাসেই লিগ ওয়ানের ক্লাব নিসের হয়ে খেলার সময় তাঁর নাম জড়িয়েছিল একটি স্পোর্টস বেটিং কেলেঙ্কারির (জুয়া) সাথে। তবে শেষ পর্যন্ত তাঁকে ভ্রমণের অনুমতি দেওয়া হয়েছে এবং এই ম্যাচে তাঁর খেলার সম্ভাবনা এখনো টিকে রয়েছে। আক্রমণভাগে ফায়ের হাতে বিকল্প হিসেবে বোনি ছাড়াও প্রথম ম্যাচে বেঞ্চে বসে থাকা উমার ডিয়াকিটে এবং ইভান গেসান্দের মতো বিকল্প আছে।
এমআর/টিকে