© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

ইউরোপে তীব্র তাপপ্রবাহ, ফ্রান্সে পানিতে ডুবে মৃত্যু ৪০

শেয়ার করুন:
ইউরোপে তীব্র তাপপ্রবাহ, ফ্রান্সে পানিতে ডুবে মৃত্যু ৪০

ছবি: সংগৃহীত

মোজো ডেস্ক
০২:২০ এএম | ২৪ জুন, ২০২৬
ইউরোপজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যে শরীর ঠাণ্ডা করতে গিয়ে ফ্রান্সে গত কয়েক দিনে ৪০ জন ডুবে মারা গেছে বলে মঙ্গলবার দেশটির প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন। এদিকে ব্রিটেন, ইতালি ও স্পেনও প্রচণ্ড গরমে বিপর্যস্ত।

কিছু এলাকায় রেকর্ড তাপমাত্রার কারণে স্কুল ও পরিবহন সেবায় বিঘ্ন ঘটেছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার মতে, ইউরোপে বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি হারে উষ্ণতা বাড়ছে। ফলে ভবিষ্যতে এ ধরনের দীর্ঘস্থায়ী ও তীব্র তাপপ্রবাহ আরো ঘন ঘন দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
 
ফ্রান্সজুড়ে তাপপ্রবাহের সতর্কতা

ফ্রান্সের আবহাওয়া সংস্থা মেটিও ফ্রান্স জানিয়েছে, দেশের বেশির ভাগ এলাকায় তীব্র তাপপ্রবাহের সতর্কতা জারি রয়েছে।

মঙ্গলবার সেখানে তাপমাত্রা প্রায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস (১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট) পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পশ্চিম ফ্রান্সের কিছু অংশে তাপমাত্রা ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠতে পারে।

১৯৪৭ সাল থেকে রেকর্ড রাখা শুরু হওয়ার পর এবার দেশটি তার সবচেয়ে উষ্ণ বিকেল ও রাতের অভিজ্ঞতা পেয়েছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, এ ধরনের নজিরবিহীন পরিস্থিতিতে ৫৪টি বিভাগে রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে।

তীব্র গরম থেকে বাঁচতে অনেক মানুষ খাল ও নদীতে সাঁতার কাটতে বা ঝাঁপ দিতে যাচ্ছেন। তবে ফরাসি ক্রীড়ামন্ত্রী মারিনা ফেরারি সতর্ক করে বলেছেন, অননুমোদিত বা বিপজ্জনক জায়গায় সাঁতার কাটা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

তাপপ্রবাহ নিয়ে জরুরি বৈঠকের আগে ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকোর্নু বলেন, ডুবে মৃত্যুর ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। তার মতে, ১৮ জুন থেকে এখন পর্যন্ত ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে, যাদের বেশির ভাগই তরুণ। এদিকে দক্ষিণ-পূর্ব ফ্রান্সের কার্পেনট্রাসে একটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে।

উদ্ধারকর্মীরা ২ ও ৪ বছর বয়সী দুই শিশুকে বাঁচাতে পারেননি। তাদের মা বাড়ির বাইরে পারিবারিক গাড়ির ভেতরে অচেতন অবস্থায় তাদের খুঁজে পান।

তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে ফ্রান্সে ব্যবসায়িক কার্যক্রমও ধীর হয়ে পড়েছে। প্যারিসে অনেকে তাপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা না থাকা অ্যাপার্টমেন্টে ঘুমহীন রাত কাটানোর পর চরম গরমে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। প্যারিস ও ব্রাসেলসের মধ্যে চলাচলকারী ট্রেনসহ কিছু ট্রেন বাতিল করা হয়েছে।

ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, এই পরিস্থিতিতে অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফ্রান্সের নিয়োগকর্তা সংগঠন ‘মেডেফ’-এর প্রধান প্যাট্রিক মার্টিন বলেন, ‘ফ্রান্সের স্বাভাবিক গতি ধীর হয়ে গেছে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো যতটা সম্ভব তাদের কর্মীদের সুরক্ষার জন্য সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করছে।’ এদিকে প্যারিসের বিভিন্ন দোকানে ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে বৈদ্যুতিক পাখার (ফ্যান) স্টক শেষ হয়ে গেছে।

এই তাপপ্রবাহটি ‘ওমেগা ব্লক’ নামে পরিচিত একটি আবহাওয়া পরিস্থিতির কারণে তৈরি হয়েছে। এর নামকরণ করা হয়েছে গ্রিক অক্ষর ওমেগার আকৃতির মতো হওয়ার কারণে। এতে মাঝখানে উষ্ণ বাতাস আটকে থাকে এবং দুই পাশে শীতল বাতাস অবস্থান করে, ফলে দীর্ঘ সময় ধরে তাপমাত্রা বেশি থাকে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপপ্রবাহ ও ঝড় আরো শক্তিশালী হচ্ছে। এতে শুধু তাপমাত্রাই বাড়ছে না, অনেক ক্ষেত্রে ভারি বৃষ্টিপাতও দেখা দিচ্ছে। ইতালিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ১৫টি শহরের জন্য সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে এবং কিছু এলাকায় কাজের সময় ও কার্যক্রম সীমিত করা হয়েছে। মঙ্গলবার বিকেলের দিকে আল্পস ও অ্যাপেনাইন পর্বতমালায় ঝড়ের আশঙ্কা রয়েছে, যা ভারি বৃষ্টি, দমকা হাওয়া ও শিলাবৃষ্টি আনতে পারে।

ব্রিটেনও তীব্র তাপপ্রবাহে বিপর্যস্ত। আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, মঙ্গলবার দক্ষিণ ইংল্যান্ডে তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠতে পারে। বুধবার ও বৃহস্পতিবার তা আরো বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এদিকে অতিরিক্ত গরমের কারণে পুরোনো ভবনে থাকা স্কুল (যেখানে ৩০ জনের বেশি শিক্ষার্থীর শ্রেণিকক্ষ রয়েছে) নির্ধারিত সময়ের আগেই বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

জলবায়ু আশ্রয়কেন্দ্র ও ইউরোপে তীব্র তাপপ্রবাহ

স্পেনের আবহাওয়া সংস্থা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রেড অ্যালার্ট জারি করেছে এবং বিপজ্জনক তাপপ্রবাহের বিষয়ে সতর্ক করেছে। সেখানে তাপমাত্রা ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সোমবার দিনটি ইতিমধ্যেই অত্যন্ত গরম ছিল, যার মধ্যে আন্দুজারে তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি রেকর্ড করা হয়। এরপরই এই সতর্কতা জারি করা হয়। রাতেও স্বস্তি মেলেনি। মঙ্গলবার ভোর পর্যন্ত প্রায় ৩০টি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে রেকর্ড করা হয়েছে।

মাদ্রিদে গৃহহীনসহ অসহায় মানুষের জন্য জলবায়ু-নিয়ন্ত্রিত আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। মাদ্রিদের সামুর সোশ্যালের হুয়ান কার্লোস আরেলানো বলেন, এই আশ্রয়কেন্দ্রগুলো ‘একটি জলবায়ু-নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ প্রদান করবে, মৌলিক খাবার দেবে, দর্শনার্থীদের গোসলের সুযোগ দেবে এবং কিছু সময়ের জন্য বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ করে দেবে।’

বেলজিয়ামে তীব্র তাপমাত্রার কারণে ব্রাসেলসের নিকটবর্তী টেরভুরেনের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় তাদের চূড়ান্ত পরীক্ষা কাছের একটি গির্জায় সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। স্কুলটি ইনস্টাগ্রামে জানায়, ‘ক্লাসরুমে খুব গরম, তাই আমরা গির্জায় পরীক্ষা নেব।’ তারা গির্জার বেঞ্চে বসে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার দৃশ্যও প্রকাশ করেছে।

পরিবহনে ব্যাঘাত

ইউরোপজুড়ে পরিবহন ব্যবস্থা ব্যাপক চাপের মুখে পড়েছে। ব্রিটেনের নেটওয়ার্ক রেল যাত্রীদের সতর্ক করে বলেছে, চলতি সপ্তাহের শেষ দিকে তাপমাত্রা ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছালে কেবল জরুরি প্রয়োজনেই ভ্রমণ করা উচিত। তাপপ্রবাহের কারণে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ট্রেন চলাচলে গতি সীমিত করা হতে পারে, ফলে সেবা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। লন্ডনে একই অস্থির আবহাওয়ার অংশ হিসেবে রাতভর তীব্র বজ্রঝড় হয়েছে, যার ফলে হিথ্রো বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন স্থানে বিঘ্ন ঘটে।

এমআর/টিএ 

মন্তব্য করুন