বাংলাদেশে বড় ধরনের ভূমিকম্পের শঙ্কা, ৩ থেকে ৪ লাখ প্রাণহানির ঝুঁকি!
ছবি: সংগৃহীত
১২:৩১ পিএম | ২৬ জুন, ২০২৬
ভূমিকম্পের ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ বাড়ছে। ফিলিপাইন ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে সাম্প্রতিক শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর বাংলাদেশেও বড় ধরনের ভূমিকম্পের আশঙ্কা নিয়ে আবারও আলোচনা শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে অল্প ব্যবধানে পরপর দুই দিন ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় মৃদু ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উৎকণ্ঠা বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব ছোট কম্পন বড় ভূমিকম্পের নিশ্চিত পূর্বাভাস নয়, তবে বাংলাদেশের ভূ-প্রাকৃতিক অবস্থান বিবেচনায় শক্তিশালী ভূমিকম্পের ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়ারও সুযোগ নেই।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, রাজধানী ঢাকায় ৬ থেকে ৭ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানলে ভয়াবহ মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঘটতে পারে। দুর্বল নির্মাণমানের কারণে অসংখ্য ভবন ধসে পড়তে পারে এবং এতে প্রাণহানি হতে পারে ৩ থেকে ৪ লাখ মানুষের। পাশাপাশি কয়েক বিলিয়ন ডলারের আর্থিক ক্ষতির শঙ্কাও রয়েছে। তাদের মতে, ভূমিকম্প নয় বরং অপরিকল্পিত ও দুর্বল ভবনই সবচেয়ে বড় বিপদের কারণ।
প্রকৌশলীদের বহুল প্রচলিত একটি বক্তব্য হলো, ‘ভূমিকম্প মানুষকে মারে না, দুর্বল ভবনই মানুষকে মারে।’ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় নির্মাণবিধি না মেনে ভবন নির্মাণ, নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর তদারকির ঘাটতিই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (ইউএসজিএস) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫৫টি ভূমিকম্প ঘটে। অন্যদিকে কম্প্রিহেনসিভ আর্থকোয়াক ক্যাটালগ (কমক্যাট) ও অন্যান্য সংস্থার তথ্য বলছে, প্রতিবছর গড়ে ৭ বা তার বেশি মাত্রার প্রায় ১৫ থেকে ১৬টি বড় ভূমিকম্প হয়।
বিশেষজ্ঞরা ব্যাখ্যা করেছেন, ভূমিকম্পের মাত্রা (ম্যাগনিটিউড) এবং তীব্রতা (ইনটেনসিটি) এক বিষয় নয়। মাত্রা নির্ধারণ করে ভূমিকম্পে কত শক্তি নির্গত হয়েছে, আর তীব্রতা বোঝায় কোনো এলাকায় এর প্রভাব কতটা ছিল। দুটি বিষয়ই বেশি হলে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা ভয়াবহ আকার ধারণ করে।
ভূতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশ এমন একটি ভূকম্পনপ্রবণ অঞ্চলে অবস্থান করছে, যেখানে বড় ধরনের ভূমিকম্প হওয়ার বাস্তব ঝুঁকি রয়েছে। গবেষকদের মতে, দেশে ৮ মাত্রার ভূমিকম্পের একটি ‘রিটার্ন পিরিয়ড’ বা পুনরাবৃত্তির চক্র রয়েছে, যা সাধারণত ৩০০ থেকে ৩৫০ বছর পরপর ঘটে। ১৭৬২ সালে আরাকান অঞ্চলে প্রায় ৮ মাত্রার এবং ১৮৯৭ সালে ডাউকি ফল্টে ৮ দশমিক ১ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়েছিল। তবে এই চক্রের অর্থ এই নয় যে এখনই ৮ মাত্রার ভূমিকম্প হবে; এমন ঘটনার সময় নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ মেহেদী আহমেদ আনসারীর মতে, ৭ থেকে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার একটি ভূমিকম্প বাংলাদেশে যে কোনো সময় ঘটতে পারে। তিনি জানান, অতীতে ১৮৬৯ সালে কাছাড়ে ৭ দশমিক ৫, ১৮৮৫ সালে বেঙ্গল ভূমিকম্পে ৭ দশমিক ১, ১৯১৮ সালে শ্রীমঙ্গলে ৭ দশমিক ৬ এবং ১৯৩০ সালে ধুবড়িতে ৭ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল। ১৫০ থেকে ২০০ বছরের ভূমিকম্প চক্র বিবেচনায় এখন আবারও বড় ধরনের কম্পনের সম্ভাবনা রয়েছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের চারপাশে কয়েকটি সক্রিয় ফল্ট লাইন রয়েছে, যা দেশের জন্য বড় ঝুঁকির কারণ। এর মধ্যে ময়মনসিংহ থেকে সিলেট হয়ে ভারতের সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত ডাউকি ফল্ট সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। এছাড়া আরাকান ফল্ট, নোয়াখালী থেকে সিলেট এবং সিলেট থেকে কাছাড় পর্যন্ত বিস্তৃত প্লেট বাউন্ডারিগুলোও পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত থাকায় বড় ধরনের ভূমিকম্পের সম্ভাবনা তৈরি করে।
মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, বড় ভূমিকম্প হলে সেটি মোকাবিলায় দেশের প্রস্তুতি এখনও যথেষ্ট নয়। জাইকা ও সিডিএমপির এক জরিপে দেখা গেছে, ঢাকায় ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে প্রায় ৭২ হাজার ভবন ধসে পড়তে পারে। তবে কোন ভবনগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে, তার নির্দিষ্ট তালিকা এখনো নেই।
টিজে/এসএন