© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

স্কালোনিকে ‘ট্রাফিক পুলিশ’ হওয়ারও অযোগ্য বলেছিলেন ম্যারাডোনা!

শেয়ার করুন:
স্কালোনিকে ‘ট্রাফিক পুলিশ’ হওয়ারও অযোগ্য বলেছিলেন ম্যারাডোনা!

ছবি: সংগৃহীত

মোজো ডেস্ক
১২:৪৮ পিএম | ০৯ জুলাই, ২০২৬
লিওনেল স্কালোনিকে আর্জেন্টিনার স্থায়ী কোচ হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পর দিয়েগো ম্যারাডোনা বলেছিলেন, ‘এই মানুষটা ট্রাফিকও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না!’ এটা ২০১৮ সালের কথা। সে সময় আর্জেন্টিনার সামনে মার্সেলো বিয়েলসা, মাউরিসিও পোচেত্তিনো কিংবা স্যুট-টাই পরা ট্যাকটিক্যাল মাস্টার ডিয়েগো সিমিওনের মতো হেভিওয়েট নামের ছড়াছড়ি।

অথচ, রাশিয়া বিশ্বকাপের বিপর্যয় কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে আর্জেন্টিনা ভরসা রাখে এমন এক অখ্যাত ও সাদামাটা মানুষের ওপর, যার খেলোয়াড়ি জীবন কেটেছে ইতালি আর স্পেনের মধ্যম সারির ক্লাবে। দেশের জার্সিতে খেলেছেন মাত্র সাতটি ম্যাচ।



হোর্হে সাম্পাওলির ব্যর্থ অধ্যায়ে পর্দার আড়ালে কাজ করার পর সামলেছেন অনূর্ধ্ব-২০ দলের দায়িত্ব। শোনা যায়, কম খরচ এবং কোনো রকম অহংকার না থাকার কারণেই পুজাতোর এক কৃষক পরিবারের সন্তানকে বেছে নিয়েছিল আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন। স্কালোনির মিশন শুরু হয়েছিল এক চিরকুট আর ফোন কলে। অনূর্ধ্ব-২০ দলের সঙ্গে হোটেলের জিমে থাকার সময় এসেছিল সেই কাঙ্ক্ষিত ফোন।

২৬ বছর ধরে অধরা কোপা আমেরিকা জয়ের জন্য দল গোছানোর দায়িত্ব পান তিনি। তবে রণকৌশল সাজানোর আগে তার সবচেয়ে বড় কাজ ছিল একটাই, জাতীয় দলের ওপর থেকে মন উঠে যাওয়া লিওনেল মেসিকে ফিরিয়ে আনা।

সেই রাতেই সহকারী কোচ পাবলো আইমারকে সঙ্গে নিয়ে মেসিকে একটি সংক্ষিপ্ত মেসেজ পাঠান স্কালোনি। মেসেজে লেখেন, ‘হাই লিও, আমি স্কালোনি। পাবলো আর আমি তোমার সঙ্গে কথা বলতে চাই।’ পরের দিন সকালে মেসির ভিডিওকলেই শুরু হয় ‘স্কালোনেতা’ সাম্রাজ্যের আসল গল্প।

মেসির সঙ্গে স্কালোনির সম্পর্কটা অবশ্য বেশ পুরোনো। ২০০৫ সালে হাঙ্গেরির বিরুদ্ধে মেসির অভিষেক ম্যাচে মাত্র ৪৫ সেকেন্ডে লাল কার্ড দেখার পর যখন তরুণ মেসি কাঁদছিলেন, তখন তার পাশে দাঁড়িয়ে রেফারির সঙ্গে লড়াই করেছিলেন স্কালোনি। 

মেসি নিজেই এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘স্কালোনির মধ্যে আমি ভাইয়ের প্রতিচ্ছবি পেয়েছিলাম।’ আর কাতার বিশ্বকাপ জয়ের পর মেসি অকপটে স্বীকার করেন, ‘তার জন্যই আজ আমি এখানে। আমি তাকে হতাশ করতে পারি না।’ এই আবেগই আর্জেন্টিনার সোনালী যুগের ভিত্তিপ্রস্তর, যার ঝুলিতে এখন দুটি কোপা আমেরিকা ও একটি বিশ্বকাপ।

স্কালোনির আসল চ্যালেঞ্জ কৌশল ছিল না, ছিল এমন এক দল গঠন করা যা মেসির ওপর চাপ না বাড়িয়ে তার বোঝা ভাগ করে নেবে। ২০২২ বা ২০২৬ সালের আর্জেন্টিনা দল হয়তো কাগজ-কলমে টুর্নামেন্টের সেরা ছিল না। দলের মূল স্তম্ভরা খেলছেন ইন্টার মায়ামি কিংবা ব্রাজিলের লিগে। প্রিমিয়ার লিগের তারকারাও ক্লাবে বাজে ফর্ম কাটিয়ে এসেছিলেন। দলে ৩০ ছোঁয়া খেলোয়াড় ছিলেন সাতজন।

প্রতিটি টুর্নামেন্টেই মনে হচ্ছিল আর্জেন্টিনা এবার ছিটকে যাবে। কিন্তু খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোই এই দলের অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৬ বিশ্বকাপ আসরেও মিশরের বিরুদ্ধে ৭৯ মিনিট পর্যন্ত দুই গোলে পিছিয়ে থেকে কিংবা কেপ ভার্দের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত সময়ে ২-২ গোলে ড্রয়ের পরিস্থিতি থেকেও জয় ছিনিয়ে এনেছে আলবিসেলেস্তেরা। কোনো অলৌকিক ট্যাকটিক্স নয়, স্রেফ অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে ভর করে জিতেছে তারা।

স্কালোনি প্রমাণ করেছেন, ফুটবল মানে শুধু বোর্ডরুমের ট্যাকটিক্স বা ডাগআউটের নাটকীয়তা নয়। তিনি শান্ত, তবে মিশরের বিরুদ্ধে অবিশ্বাস্য কামব্যাকের পর চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি তিনিও।

তবে স্কালোনি শুধু ‘ভাইবস’ বা আবেগের কোচ নন। ২০২২ বিশ্বকাপের ফাইনালে আনহেল ডি মারিয়াকে বাম প্রান্তে খেলিয়ে ফ্রান্সের রক্ষণকে যেভাবে বোতলবন্দী করেছিলেন, তা তার প্রখর ফুটবল মস্তিষ্কের প্রমাণ। বর্তমান দলে উইঙ্গারের অভাব থাকায় তিনি গোঁড়ামি না করে মাঝমাঠকে আরও সংকুচিত করেছেন। মিশরের বিরুদ্ধে ম্যাচে ডিফেন্ডার ক্রিশ্চিয়ানো রোমেরোকে ওপরে তুলে এনে গোল আদায় করা কিংবা হুলিয়ান আলভারেজকে নিচে নামিয়ে অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারকে স্ট্রাইকার পজিশনে খেলানো, তার ক্ষুরধার মস্তিস্কেরই ফসল।

আর্জেন্টিনা দলের নিউক্লিয়াস সবসময়ই লিওনেল মেসি। কিন্তু স্কালোনিই একমাত্র জাদুকর, যিনি মেসির চারপাশে এমন এক চারণভূমি তৈরি করতে পেরেছেন, যেখানে এলএম১০ নিজের সেরা ছন্দে ডানা মেলতে পারেন।

আরআই/ এসএন

মন্তব্য করুন