বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করেন নেতানিয়াহু, জানালেন নিজেই
ছবি: সংগৃহীত
০৫:৪৬ পিএম | ১০ জুলাই, ২০২৬
এবার ফিফা বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। এ কথা তিনি নিজেই জানিয়েছেন। সেই সঙ্গে জানিয়েছেন কারণও। তিনি বলেছেন, এই সমর্থনের কারণ ফুটবল তারকা লিওনেল মেসি নন, বরং আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই।
ফুটবল বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে মিশরের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার জয়ের পর ম্যাচের রেফারিং নিয়ে তীব্র বিতর্ক ও সমালোচনা চলছে। তার মধ্যে প্রকাশ্যে আর্জেন্টিনাকে সমর্থনের কথা জানালেন ইসরাইলের এই যুদ্ধবাজ নেতা।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) এক পডকাস্টে অংশ নিয়ে নেতানিয়াহু জানান, এবার ফুটবল বিশ্বকাপে তিনি আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করছেন। আর এই সমর্থনের পেছনে মূল কারণ দেশটির বর্তমান প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সম্পর্ক।
সাক্ষাৎকারে উপস্থাপক যখন মন্তব্য করেন যে, সম্ভবত লিওনেল মেসির কারণেই নেতানিয়াহু আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করছেন। তখন নেতানিয়াহু জবাবে বলেন, ‘না। মেসির আগে প্রধানমন্ত্রী (প্রেসিডেন্ট) মিলেই।’
এরপর নেতানিয়াহু প্রেসিডেন্ট মিলেইর প্রশংসা করে বলেন, ‘তিনি একজন সত্যিকারের সুপারস্টার। তিনি ইসরাইলের সবচেয়ে বড় বন্ধু।’নেতানিয়াহুর এই মন্তব্য আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট মিলেইর প্রতি তার ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সমর্থনেরই প্রতিফলন বলে মনে করা হচ্ছে।

নেতানিয়াহু ইসরাইলের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ মেয়াদে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকারী রাজনীতিক। তিনি ১৯৮৪ সালে জাতিসংঘে ইসরাইলের রাষ্ট্রদূত হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।
এরপর ১৯৯৬ সালে তিনি প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন। পরবর্তীতে ২০০৯ থেকে ২০২১ পর্যন্ত একটানা এবং ২০২২ সালের ডিসেম্বরে উগ্র ডানপন্থি দলগুলোর সহায়তায় পুনরায় সরকার গঠন করেন।
নেতানিয়াহুর ধর্ম ইহুদি হলেও ব্যক্তিগত জীবনে তিনি একজন ধর্মনিরপেক্ষ বা সেক্যুলার ইহুদি হিসেবে পরিচিত, যিনি খুব কট্টরভাবে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান মেনে চলেন না। তিনি মূলত ইহুদি জাতীয়তাবাদ এবং জায়নবাদে বিশ্বাস করেন।
অন্যদিকে হাভিয়ের মিলেই জন্মসূত্রে একজন রোমান ক্যাথলিক। তবে তিনি ইহুদি ধর্মের প্রতি গভীর অনুরাগী এবং নিয়মিত তোরাহ অধ্যয়ন করেন। তিনি ইহুদি ধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন এবং বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন যে, প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব ছাড়ার পর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ইহুদি ধর্মে দীক্ষিত হবেন।
২০২৩ সালের শেষ দিকে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই মিলেই ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছেন। রাজধানী বুয়েনস আইরেসের একজন অর্থোডক্স রাবাই তার প্রধান আধ্যাত্মিক গুরু, যাকে তিনি ইসরাইলে আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন।
মিলেই ইহুদিদের কট্টরপন্থী হাসিদিক শাখা ‘চাবাদ-লুবাভিচের’ প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল। তিনি নিউইয়র্কে অবস্থিত বিখ্যাত রাবাই মেনাচেম মেন্ডেল স্নিয়ারসনের সমাধি একাধিকবার দর্শন করেছেন।
২০২৬ সালের জুন মাসে তিনি চাবাদের একটি বিশেষ আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা হিসেবে ‘জুডিও-ক্রিশ্চিয়ান মূল্যবোধের’ প্রশংসা করেন। তার এই অনন্য ধর্মীয় অনুরাগের কারণে ২০২৫ সালে তাকে ‘জেনেসিস প্রাইজ’ বা ‘ইহুদি নোবেল’ দেওয়া হয়, যা কোনো অ-ইহুদি রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তিনি প্রথম লাভ করেন।
মিলেইয়ের এই ধর্মীয় বিশ্বাস আর্জেন্টিনার দীর্ঘদিনের নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতিকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে এবং তিনি নিজেকে ‘বিশ্বের সবচেয়ে বড় জায়নবাদী রাষ্ট্রপ্রধান’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন।
আন্তর্জাতিক আইন অমান্য করে মিলেই আর্জেন্টিনার দূতাবাস তেল আবিব থেকে বিতর্কিত জেরুজালেমে স্থানান্তরের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছেন। ক্ষমতা গ্রহণের পর তিনি আর্জেন্টিনার পূর্ববর্তী অবস্থান পরিবর্তন করে ফিলিস্তিনের হামাস এবং লেবাননের হিজবুল্লাহকে আনুষ্ঠানিকভাবে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেছেন।
জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে আর্জেন্টিনা অতীতে ইসরাইল-বিরোধী বা ফিলিস্তিনের পক্ষে ভোট দিলেও মিলেইর অধীনে দেশটি এখন সর্বদা ইসরাইলের পক্ষে এককভাবে ভোট দিচ্ছে। এমনকি তার প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসরাইল-বিরোধী একটি প্রস্তাবে ভোট দেওয়ায় মিলেই তাকে তাৎক্ষণিক বরখাস্ত করেন।
মিলেই মনে করেন, ইসরাইল হলো চরমপন্থার বিরুদ্ধে পশ্চিমা সভ্যতার একটি ‘সুরক্ষা প্রাচীর’ এবং ইসরাইলের পরাজয় মানে পুরো পশ্চিমা বিশ্বের পতন। বিশ্লেষকদের মতে, ফিফা বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে সমর্থন নিয়ে নেতানিয়াহুর মন্তব্য ফুটবলের চেয়ে রাজনৈতিক সম্পর্ককেই বেশি গুরুত্ব দেওয়ার ইঙ্গিত বহন করে।
বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের অন্যতম শিরোপাপ্রত্যাশী দল হিসেবে টুর্নামেন্টে অংশ নিয়েছে। দলটিকে ঘিরে সমর্থকদের প্রত্যাশাও তুঙ্গে। তবে শেষ ষোলের ম্যাচে মিশরের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার জয় নিয়ে তুমুল বিতর্ক চলছে।
স্থানীয় সময় গত মঙ্গলবার (৭ জুলাই) রাতে যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায় অনুষ্ঠিত ম্যাচে ৭৯ মিনিট পর্যন্ত ২-০ গোলে এগিয়ে ছিল মিশর। কিন্তু শেষ মুহূর্তে আর্জেন্টিনা ৩-২ ব্যবধানে জিতে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে। ম্যাচে একাধিক রেফারিং সিদ্ধান্তকে ‘ম্যাচের ফল নির্ধারণে প্রভাব ফেলেছে’ বলে অভিযোগ ওঠে। যার প্রেক্ষিতে মিশরীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন এরই মধ্যে একটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেছে।
এমআর/টিকে