© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

জলদস্যুতার আড়ালে বিশ্বজয়ের গল্প: নরওয়ের ভাইকিংদের রোমাঞ্চকর ইতিহাস

শেয়ার করুন:
জলদস্যুতার আড়ালে বিশ্বজয়ের গল্প: নরওয়ের ভাইকিংদের রোমাঞ্চকর ইতিহাস

ছবি: সংগৃহীত

মোজো ডেস্ক
০২:২২ পিএম | ১৬ জুলাই, ২০২৬
পপ কালচার, হলিউডের সিনেমা কিংবা কমিকস—'ভাইকিং' শব্দটা শুনলেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে একদল হিংস্র, শিংওয়ালা হেলমেট পরিহিত জলদস্যুর ছবি। যারা সমুদ্র চিরে এসে গ্রামকে গ্রাম জ্বালিয়ে দিচ্ছে, আর লুটপাট করছে ধন-সম্পদ। কিন্তু ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায় অন্য এক চিত্র। নিষ্ঠুর যোদ্ধা পরিচয়ের আড়ালে তারা ছিল সমসাময়িক পৃথিবীর সেরা নাবিক, দূরদর্শী ব্যবসায়ী এবং দক্ষ কারিগর।

আজ থেকে প্রায় বারোশো বছর আগের সেই রোমাঞ্চকর 'ভাইকিং যুগ' এবং তাদের আসল ইতিহাস নিয়ে আজ আমাদের এই বিশেষ আয়োজন।

'ভাইকিং' কোনো জাতি নয়, ছিল একটি পেশা!
আমাদের অনেকেরই ধারণা ভাইকিং বোধহয় কোনো নির্দিষ্ট জাতির নাম। কিন্তু নরওয়েজিয়ান ইতিহাসবিদদের মতে, এটি আসলে কোনো জাতি ছিল না, বরং ছিল একটি পেশা বা কাজ। প্রাচীন নর্স (Old Norse) ভাষায় 'ভাইকিং' শব্দের অর্থ হলো 'সমুদ্রাভিযান' বা 'লুটের উদ্দেশ্যে যাত্রা করা'। আজ থেকে প্রায় ১২০০ বছর আগে (৭৯৩ থেকে ১০৬৬ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে) বর্তমান নরওয়ে, ডেনমার্ক এবং সুইডেন—অর্থাৎ স্ক্যান্ডিনেভিয়ান অঞ্চলের যেসব মানুষ জীবিকা বা ভাগ্যান্বেষণে সমুদ্রপথে অন্য দেশে পাড়ি জমাত, তাদেরই বলা হতো ভাইকিং।

শিংওয়ালা হেলমেটের জনপ্রিয় গুজব
ভাইকিংদের নিয়ে সবচেয়ে বড় মিথ্যাটি ছড়িয়েছে তাদের হেলমেট নিয়ে। বাস্তবে ভাইকিংরা কখনই শিংওয়ালা হেলমেট পরত না। যুদ্ধক্ষেত্রে শিংওয়ালা হেলমেট পরা অত্যন্ত বিপজ্জনক, কারণ শত্রুর তরবারি বা কুড়াল খুব সহজেই সেই শিংয়ে আটকে আঘাত হানতে পারে। ১৯ শতকের দিকে ইউরোপের বিভিন্ন নাটক ও অপেরায় ভাইকিংদের একটু বেশি নাটকীয় বা ভয়ঙ্কর দেখানোর জন্য পোশাক পরিচালকরা এই শিংওয়ালা হেলমেটের প্রচলন করেন, যা পরে বিশ্বজুড়ে ভুলভাবে জনপ্রিয় হয়ে যায়।

প্রকৌশলের বিস্ময়: ভাইকিং 'লংশিপ'
ভাইকিংদের বিশ্বজয়ের মূল চাবিকাঠি ছিল তাদের তৈরি বিশেষ জাহাজ, যা 'লংশিপ' (Longship) নামে পরিচিত। এই জাহাজগুলো ছিল সে যুগের প্রকৌশলের এক বিস্ময়। ওক কাঠ দিয়ে তৈরি এই জাহাজগুলো ছিল অত্যন্ত হালকা ও নমনীয়, যার ফলে সমুদ্রের বিশাল ঢেউয়ের ধাক্কাতেও এগুলো ভাঙত না।

সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় ছিল এদের 'অগভীর ড্রাফট' বা তলা। মাত্র ৩ ফুট পানিতেও এই জাহাজগুলো অনায়াসে ভাসতে পারত। ফলে গভীর সমুদ্র পাড়ি দিয়ে তারা যেকোনো দেশের ভেতরে সরু ও অগভীর নদী দিয়ে হুট করে ঢুকে পড়তে পারত। জাহাজের উভয়মুখী সুচালো ডিজাইনের কারণে দিক পরিবর্তন না করেই দাঁড়ের সাহায্যে এটিকে উল্টো দিকেও দ্রুত চালানো যেত।

কলম্বাসের ৫০০ বছর আগেই আমেরিকায়!
সাধারণত ক্রিস্টোফার কলম্বাসকে আমেরিকার আবিষ্কারক বলা হলেও, ইতিহাস বলছে কলম্বাসেরও প্রায় ৫০০ বছর আগে ভাইকিংরা উত্তর আমেরিকায় পৌঁছেছিল। ভাইকিং নাবিক 'লেইফ এরিকসন'-এর নেতৃত্বে তারা বর্তমান কানাডার নিউফাউন্ডল্যান্ড উপকূলে বসতি স্থাপন করেছিল, যার প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণও পাওয়া গেছে। কোনো কম্পাস বা আধুনিক মানচিত্র ছাড়াই কেবল তারা, সূর্য আর সমুদ্রের পাখি দেখে তারা আইসল্যান্ড, গ্রিনল্যান্ড ও আমেরিকা জয় করেছিল।

জলদস্যুতার বাইরে: কৃষক ও ব্যবসায়ী জীবন
সমুদ্রাভিযান বা যুদ্ধের বাইরে ভাইকিংদের একটা শান্ত ও সাধারণ জীবন ছিল। স্ক্যান্ডিনেভিয়ার তীব্র শীত আর পাথুরে পাহাড়ি জমিতে চাষাবাদ করা কঠিন ছিল বলেই অনেকে সমুদ্রে যেত। কিন্তু বছরের বাকি সময় তারা নিজ দেশে সাধারণ কৃষক, কামার, পশুপালক ও কারিগর হিসেবে জীবনযাপন করত। এছাড়া তারা বিশ্বজুড়ে এক বিশাল বাণিজ্য নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিল। বাগদাদ থেকে শুরু করে কনস্টান্টিনোপল (বর্তমান ইস্তাম্বুল) পর্যন্ত তাদের তৈরি করা রুট দিয়ে সুতা, চামড়া এবং মূল্যবান পাথরের ব্যবসা চলত।

অবসান ও রেখে যাওয়া স্মৃতি
১০৬৬ খ্রিষ্টাব্দে ইংল্যান্ডের স্ট্যামফোর্ড ব্রিজের যুদ্ধে ভাইকিং রাজা হারাল্ড হার্ডরাডার পরাজয় এবং স্ক্যান্ডিনেভিয়ান অঞ্চলে খ্রিষ্টধর্মের বিস্তারের ফলে ধীরে ধীরে ভাইকিং যুগের অবসান ঘটে।

রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ আর লুণ্ঠনের কালো অধ্যায় বাদ দিলে, মানুষের দুঃসাহস আর প্রকৃতির প্রতিকূলতাকে জয় করার এক অনন্য উদাহরণ ভাইকিংরা। আধুনিক বিশ্বকে যোগাযোগের নতুন পথ দেখানো এবং সমুদ্র জয়ের যে বীজ তারা বুনেছিল, তা মানব ইতিহাসের পাতায় তাদের চিরস্মরণীয় করে রেখেছে।

এসএন 

মন্তব্য করুন