পোশাক রপ্তানিতে ধীরগতি, ‘বাংলাদেশ মানেই সস্তা’ ধারণাই কি বড় বাধা?
ছবি: সংগৃহীত
১২:১৪ এএম | ৩১ জুলাই, ২০২৬
বিশ্ব পোশাক বাণিজ্য আবারও প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরেছে। ২০২৫ সালে বৈশ্বিক পোশাক রফতানির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৭৪ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে, যা আগের বছরের তুলনায় ৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ বেশি। কিন্তু বাজার সম্প্রসারণের এই ইতিবাচক চিত্রে বাংলাদেশের সাফল্য তুলনামূলকভাবে সীমিত। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রফতানিকারক দেশ হিসেবে অবস্থান ধরে রাখলেও দেশের রফতানি বেড়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৮৯ শতাংশ। একই সময়ে ভিয়েতনাম ১০ দশমিক ৫৩ শতাংশ এবং কম্বোডিয়া ১৬ দশমিক ৮৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে।
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, বিশ্ববাজার যখন প্রসারিত হচ্ছে তখন সেই প্রবৃদ্ধির উল্লেখযোগ্য অংশ কেন বাংলাদেশের ঝুলিতে আসছে না?
শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, এর কারণ শুধু গ্যাস সংকট, উচ্চ সুদহার বা উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি নয়। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের একটি ধারণাগত সংকট। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের একটি বড় অংশ এখনও বাংলাদেশকে মূলত কম খরচে পোশাক উৎপাদনের দেশ হিসেবেই বিবেচনা করে। ফলে উচ্চমূল্যের, প্রযুক্তিনির্ভর কিংবা বেশি মূল্য সংযোজনকারী পণ্যের পরিবর্তে বাংলাদেশের জন্য বরাদ্দ হয় তুলনামূলক কম দামের অর্ডার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন না ঘটলে পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেল দেশের একটি গণমাধ্যমকে বলেন, ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশ কম মূল্য সংযোজনের পোশাক উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল ছিল। বর্তমানে শিল্প উচ্চমূল্যের ও উদ্ভাবনী পণ্য উৎপাদনের দিকে অগ্রসর হতে চাইলেও নানা সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ছে। তার মতে, এসব সীমাবদ্ধতার একটি অংশ দেশের অভ্যন্তরীণ হলেও বড় একটি কারণ আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের প্রচলিত মানসিকতা।
তার ভাষ্য, অনেক আন্তর্জাতিক ক্রেতা এখনও মনে করেন বাংলাদেশ মানেই কম দামে উৎপাদন। অন্য কোনো দেশের জন্য যে দামে তারা একটি পণ্য কিনতে রাজি হন, একই পণ্যের জন্য বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আরও কম মূল্য নির্ধারণের চেষ্টা করেন। অনেক ক্ষেত্রেই ভালো মানের বা উচ্চমূল্যের পণ্যের পরিবর্তে কম দামের অর্ডারই বাংলাদেশে দিতে আগ্রহী থাকেন তারা। তিনি মনে করেন, ভবিষ্যতে শুধু কম দামের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব হবে না, তাই এই মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি।
বিশ্ব পোশাকশিল্পের প্রতিযোগিতার ধরনও দ্রুত বদলে যাচ্ছে। একসময় যেখানে উৎপাদন ব্যয় কমানোই ছিল আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর প্রধান লক্ষ্য, সেখানে এখন দ্রুত সরবরাহ, ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি, পরিবেশগত দায়বদ্ধতা, কার্বন নিঃসরণ হ্রাস এবং সরবরাহ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা সমান গুরুত্ব পাচ্ছে।
অর্থাৎ, বর্তমান প্রতিযোগিতায় শুধু কম দাম নয়, বরং উৎপাদনের গতি, প্রযুক্তির ব্যবহার, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও নির্ভরযোগ্যতাই মূল বিবেচ্য হয়ে উঠেছে।
এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চীন, ভিয়েতনামসহ প্রতিযোগী দেশগুলো উৎপাদন ব্যবস্থায় ব্যাপক প্রযুক্তি বিনিয়োগ করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন ব্যবস্থা, ডিজিটাল সরবরাহ ব্যবস্থা এবং শক্তিশালী ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ গড়ে তুলে তারা নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ এখনও অনেকাংশে কম দামের অর্ডারের ওপর নির্ভরশীল থাকায় এই রূপান্তরে পিছিয়ে রয়েছে।
মহিউদ্দিন রুবেলের মতে, বাজারে এমন কিছু আন্তর্জাতিক ক্রেতা রয়েছেন যারা বাস্তবসম্মত উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন মূল্য প্রস্তাব করেন। বাংলাদেশের অনেক কারখানার অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা ও কাজের প্রয়োজনীয়তার সুযোগ নিয়ে তারা অস্বাভাবিক কম দামে অর্ডার নেওয়ার চেষ্টা করেন।
তিনি বলেন, অনেক সময় এমন মূল্য নির্ধারণ করা হয়, যা বাস্তবে উৎপাদন করাই সম্ভব নয়। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, একটি শীতকালীন জ্যাকেটের জন্য মাত্র পাঁচ ডলার মূল্য প্রস্তাব করা হয়, অথচ ওই দামে মানসম্মত জ্যাকেট উৎপাদন সম্ভব নয়। তার মতে, এ ধরনের অস্বাস্থ্যকর মূল্য প্রতিযোগিতা শুধু কারখানার মুনাফাই কমায় না, দীর্ঘমেয়াদে পুরো শিল্পের সক্ষমতাকেও দুর্বল করে।
এদিকে বিশ্বজুড়ে আল্ট্রা ফাস্ট ফ্যাশনের পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিভিন্ন দেশে নতুন পরিবেশ আইন, বাধ্যতামূলক ট্রেসেবিলিটি এবং টেকসই উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। মহিউদ্দিন রুবেলের মতে, এই বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোকেও তাদের ক্রয়নীতিতে পরিবর্তন আনতে হবে।
তার মতে, ভবিষ্যতের পোশাকশিল্প কেবল সস্তা পণ্যের ওপর নির্ভর করে টিকে থাকতে পারবে না। উন্নত মানের, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই পণ্যের দিকে এগোতে হবে। সেই রূপান্তরের দায় শুধু কারখানার নয়; প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোকেও অংশীদার হতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের দৃষ্টিভঙ্গির সমালোচনা করলেই হবে না। বাংলাদেশের নিজেদেরও বেশ কিছু কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকট, বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, উচ্চ সুদহার, ব্যাংকঋণের সংকট, লজিস্টিকস ব্যয়, বন্দরজট, দক্ষ জনবলের অভাব এবং উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদনে সীমিত সক্ষমতা শিল্পের প্রতিযোগিতা কমিয়ে দিচ্ছে। পাশাপাশি এখনও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কারখানা ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি, তথ্যভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থাপনা ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করতে পারেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু তৈরি পোশাক কারখানার সক্ষমতা বাড়ালেই হবে না। সুতা, কাপড়, ডাইং, ফিনিশিং, রাসায়নিক ও আনুষঙ্গিক শিল্পে আরও বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন। এতে বিদেশি কাঁচামালের ওপর নির্ভরতা কমবে, উৎপাদনের সময় কমবে এবং দ্রুত অর্ডার সরবরাহ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো সংকট দেখা দিলেও বাংলাদেশের উৎপাদন সক্ষমতা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান স্বল্পমেয়াদি দরপত্রভিত্তিক ব্যবসায়িক মডেল থেকে বেরিয়ে আসাও জরুরি। কারণ এই ব্যবস্থায় প্রতিবারই মূল্য কমানোর প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। এর পরিবর্তে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড, স্থানীয় প্রস্তুতকারক, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং আর্থিক খাতের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে হবে। যৌথ বিনিয়োগের মাধ্যমে ডিজিটাল প্রযুক্তি, গবেষণা, স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন, দক্ষতা উন্নয়ন এবং উদ্ভাবনে গুরুত্ব বাড়াতে হবে।
এতে বাংলাদেশ শুধু বৃহৎ পরিসরে পোশাক উৎপাদনকারী দেশ হিসেবেই নয়, উচ্চমূল্য সংযোজনকারী, প্রযুক্তিনির্ভর এবং নির্ভরযোগ্য বৈশ্বিক উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবেও নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে পারবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দিনের মূল প্রশ্ন আর এটি নয় যে বাংলাদেশ আরও কম দামে পোশাক তৈরি করতে পারবে কি না। বরং এখন ভাবতে হবে কীভাবে দেশকে আরও দ্রুত, আরও স্বচ্ছ, আরও প্রযুক্তিনির্ভর এবং উচ্চমূল্য সংযোজনকারী বৈশ্বিক উৎপাদন অংশীদারে রূপান্তর করা যায়।
তাদের মতে, এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনই হতে পারে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পদক্ষেপ। কারণ বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় এখন শুধু সর্বনিম্ন মূল্য নয়, বরং গতি, স্থিতিস্থাপকতা, টেকসই উৎপাদন, ডিজিটাল স্বচ্ছতা এবং পারস্পরিক আস্থাই প্রতিযোগিতার নতুন ভিত্তি। বাংলাদেশ যদি দ্রুত এই পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারে, তাহলে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রফতানিকারক দেশের পরিচয়ের পাশাপাশি উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদন, উদ্ভাবন এবং টেকসই শিল্পায়নেও বৈশ্বিক নেতৃত্বের সুযোগ তৈরি হবে। অন্যথায় বিশ্ববাজার সম্প্রসারিত হলেও সেই প্রবৃদ্ধির বড় অংশ প্রতিযোগী দেশগুলোর দখলেই থেকে যাবে।
এমআই/টিএ