গ্র্যামি থেকে সরে দাঁড়াল বিটিএস, কেন এই সিদ্ধান্ত?
ছবি: সংগৃহীত
০৭:২৫ পিএম | ৩১ জুলাই, ২০২৬
আগামী গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডসে নিজেদের কোনো গান জমা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার জনপ্রিয় কে-পপ ব্যান্ড বিটিএস। আর এই ঘোষণার পরই বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা।
ভক্তদের একাংশ মনে করছেন, রেকর্ডিং একাডেমির নতুন ‘বেস্ট এশিয়ান পপ মিউজিক পারফরম্যান্স’ বিভাগ চালুর প্রতিবাদেই এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে ব্যান্ডটি। তবে গ্র্যামির সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের দাবি, নতুন বিভাগটি বিশেষভাবে বিটিএসকে লক্ষ্য করে তৈরি করা হয়নি।
বিটিএসের সাত সদস্য আরএম, জিন, সুগা, জে-হোপ, জিমিন, ভি ও জাংকুক আলাদা আলাদা ইনস্টাগ্রাম পোস্টে একই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, ‘আমরা আশা করি, অঞ্চল বা ভাষার সীমার বাইরে গিয়ে সংগীতকে তার নিজস্ব মূল্যেই শোনা ও গ্রহণ করা হবে।’
বিটিএসের এই সিদ্ধান্তের পর তাদের ভক্তরাও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পাশাপাশি সংগীতের চার্টে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। ব্যান্ডটির ‘অ্যারিরাং’ অ্যালবামের ‘এলিয়েনস’ গানটি এ সপ্তাহে ৭৮টি অঞ্চলের আইটিউনস সং চার্টে শীর্ষস্থান দখল করেছে। গানটির বিষয়বস্তুতেও নিজেদের ‘বহিরাগত’ হিসেবে চিহ্নিত করা এবং সেই পরিচয়কে নিজেদের শক্তিতে পরিণত করার বার্তা রয়েছে।

নতুন বিভাগ নিয়েই কি আপত্তি?
অনেকের ধারণা, গ্র্যামিতে নতুন ‘বেস্ট এশিয়ান পপ মিউজিক পারফরম্যান্স’ বিভাগ চালুর বিষয়টিই বিটিএসের সিদ্ধান্তের পেছনে বড় কারণ। সমালোচকদের অভিযোগ, নতুন বিভাগটি বিটিএসসহ অন্যান্য এশীয় শিল্পীদের মূলধারার প্রতিযোগিতা থেকে আলাদা করে একটি উপশ্রেণিতে সীমাবদ্ধ করতে পারে।
গ্র্যামির নিয়ম অনুযায়ী, একটি গান প্রতি বছর মাত্র একটি পারফরম্যান্স বিভাগে জমা দেওয়া যায়। ফলে এশিয়ান পপ বিভাগে গান জমা দিলে বিটিএসকে ‘বেস্ট পপ ডুও/গ্রুপ পারফরম্যান্স’ বিভাগে একই গানের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ ছাড়তে হতে পারে। এই বিভাগেই ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত তিনবার মনোনয়ন পেয়েও পুরস্কার জিততে পারেনি ব্যান্ডটি।
তবে বিটিএস তাদের বিবৃতিতে গ্র্যামির নতুন বিভাগকে সরাসরি উল্লেখ করেনি।বরং অঞ্চল বা ভাষার সীমার বাইরে সংগীতকে তার নিজস্ব মূল্য দিয়ে বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে।
‘পুরস্কার শুধু ট্রফি নয়’
সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির যোগাযোগ বিভাগের অধ্যাপক হং সিওক-কিয়ংয়ের মতে, পুরস্কার শুধু একটি ট্রফি নয়; এর মাধ্যমে কোনো প্রতিষ্ঠান একজন শিল্পী বা শিল্পকে একটি নির্দিষ্ট ধরনের কর্তৃত্ব ও স্বীকৃতি দেয়।
‘দ্য কোরিয়া হেরাল্ড’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, এই কর্তৃত্ব টিকে থাকে মানুষের সম্মতির ওপর। তাঁর বিশ্লেষণে, বিটিএসের সিদ্ধান্তকে সেই স্বীকৃতি দেওয়ার প্রক্রিয়া থেকে নিজেদের সম্মতি প্রত্যাহারের একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যেতে পারে।
হংয়ের মতে, কে-পপের বর্তমান বৈশ্বিক অবস্থান এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এর জন্য আর মার্কিন সংগীতশিল্পের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির ওপর আগের মতো নির্ভর করার প্রয়োজন নেই। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কে-পপের উত্থান মূলত ভক্তদের শক্তি ও নিজস্ব সাংস্কৃতিক ভিত্তি থেকে তৈরি হয়েছে; পশ্চিমা সমালোচক বা সংগীতশিল্পের গেটকিপারদের অনুমোদন থেকে নয়।
‘এই বিভাগ বিটিএসের জন্য ছিল না’ তবে নতুন বিভাগ তৈরির সঙ্গে যুক্তদের সবাই বিষয়টিকে একইভাবে দেখছেন না। রেকর্ডিং একাডেমির সদস্য জিনা কোডা জানিয়েছেন, নতুন বিভাগটি বিশেষভাবে বিটিএসকে মাথায় রেখে তৈরি করা হয়নি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া একাধিক পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘এটি একটি নতুন বিভাগ এবং এখানে কোনো কিছুই নিখুঁত নয়, আর এর প্রথম সংস্করণটি অনেক দিক থেকেই বিটিএস-এর জন্য আদৌ কোনো বিভাগ ছিল না।’ তাঁর মতে, নতুন বিভাগটি এমন শিল্পীদের জন্য তৈরি করা হয়েছে, যারা এখনো পর্যাপ্ত দৃশ্যমানতা ও স্বীকৃতি পাননি। কোডার ভাষায়, এটি ‘দশকের পর দশক ধরে জনপ্রিয় পপ সুপারস্টার নয়’-এর জন্য।
এশীয় শিল্পীদের গ্র্যামিতে আরো বেশি দৃশ্যমানতা তৈরির লক্ষ্যে দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টার ফল হিসেবেই নতুন বিভাগটি এসেছে বলে দাবি করেন তিনি। বিজয়ী নির্ধারণে সাধারণ দর্শকের ভোট নয়, বরং সংগীত পেশাজীবী ও শিল্পীদের সমন্বয়ে গঠিত একটি যাচাই করা ভোটিং কমিটি কাজ করে বলেও জানান কোডা। তবে তিনি স্বীকার করেন, নতুন বিভাগটি চূড়ান্ত সমাধান নয়; বরং সঠিক পথে এগিয়ে যাওয়ার একটি ধাপ।
গ্র্যামির ব্যাখ্যা কী?
বিটিএসের সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই রেকর্ডিং একাডেমিও নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। একাডেমির প্রধান নির্বাহী জানিয়েছেন, কোনো শিল্পী নতুন কোনো জঁরভিত্তিক বিভাগে গান জমা দিলেই তিনি সাধারণ বিভাগ থেকে বাদ পড়ে যান না।
অর্থাৎ, এশিয়ান পপ বিভাগে কোনো গান জমা দিলেও একজন শিল্পী একই সঙ্গে ‘রেকর্ড অব দ্য ইয়ার’, ‘অ্যালবাম অব দ্য ইয়ার’ এবং ‘সং অব দ্য ইয়ার’-এর মতো জেনারেল ফিল্ড বিভাগেও বিবেচিত হতে পারেন।
দীর্ঘদিন ধরেই গ্র্যামি নিয়ে প্রশ্ন
গ্র্যামির ক্ষেত্রে বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। কোন শিল্পী বা গানকে শ্রেষ্ঠ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে, সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে।
গ্র্যামির মনোনয়ন নির্ধারণ করেন প্রায় ১৫ হাজার ভোটিং সদস্য—গায়ক, প্রযোজক, প্রকৌশলীসহ সংগীতশিল্পের বিভিন্ন পেশাজীবী। চার্টের অবস্থান বা স্ট্রিমিংয়ের সংখ্যা সরাসরি যোগ্যতার মাপকাঠি হিসেবে বিবেচিত হয় না। ফলে পুরো প্রক্রিয়াটি অনেকটাই ভোটারদের ব্যক্তিগত মূল্যায়ন ও পছন্দের ওপর নির্ভরশীল।
২০২১ সালে গ্র্যামির বিতর্কিত গোপন মনোনয়ন পর্যালোচনা কমিটির বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়ে দ্য উইকেন্ড তাঁর গান জমা দেওয়া বন্ধ করেছিলেন। ভোটিং ব্যবস্থায় পরিবর্তনের পর ২০২৫ সালে তিনি আবার গ্র্যামিতে ফিরে আসেন।
ফ্র্যাঙ্ক ওশানও গ্র্যামির মনোনয়ন ও যাচাই প্রক্রিয়াকে পুরোনো বলে সমালোচনা করেছেন। ২০২৪ সালের গ্র্যামি মঞ্চে জে-জেডও তাঁর স্ত্রী বিয়ন্সে কখনো ‘অ্যালবাম অব দ্য ইয়ার’ পুরস্কার না পাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেছিলেন।
এ ছাড়া গ্র্যামির নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সাল পর্যন্ত একাডেমির সদস্যদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা নারীদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ ছিল। যদিও ২০২৫ সালে নতুন করে যুক্ত হওয়া প্রায় ৩ হাজার ৮০০ সদস্যের অর্ধেকের বয়স ছিল ৩৯ বছর বা তার কম।
সব মিলিয়ে বিটিএসের গ্র্যামিতে গান জমা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত শুধু একটি পুরস্কার থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘটনা নয়; এটি সংগীতের বৈশ্বিক স্বীকৃতি, এশীয় শিল্পীদের অবস্থান এবং পশ্চিমা সংগীতশিল্পের দীর্ঘদিনের পুরস্কার কাঠামো নিয়েও নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
এসএ/টিএ