দিনে ৪০টা সিগারেট! কীভাবে ধূমপান ছাড়লেন সংগীতশিল্পী বিশাল?
ছবি: সংগৃহীত
০৮:৫৪ এএম | ০১ আগস্ট, ২০২৬
দিনে ৪০টি সিগারেট খাওয়ার মতো মারাত্মক বদভ্যাস এক ঝটকায় কীভাবে ছেড়ে দেওয়া যায়? সম্প্রতি ইউটিউব চ্যানেল ‘হিউম্যানস অব বোম্বে’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজের জীবনযাত্রার এই অভাবনীয় পরিবর্তনের কথাই শেয়ার করেছেন বিখ্যাত বলিউড সংগীতশিল্পী ও সুরকার বিশাল দাদলানি।
হঠাৎ একদিন নিজেকে নিয়ে চরম বিরক্ত হয়ে বিশাল সিদ্ধান্ত নেন আর নয়! কীভাবে ৪০টি সিগারেট থেকে একবারে শূন্যে নেমে এলেন—এমন প্রশ্নের জবাবে সহজ ভাষায় তিনি বলেন, ‘কারণ আমি নিজেই নিজের মালিক।’
ধূমপান ত্যাগ করা কখনোই সহজ নয়, তবে চিকিৎসকেরা বলছেন যে বিশালের এই গল্প প্রমাণ করে যে দীর্ঘদিনের শৃঙ্খল ভেঙে যেকোনো ভারী ধূমপায়ী ধূমপান ছেড়ে দিতে পারেন এবং এর স্বাস্থ্যসুফল প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয়।
ধূমপান ছাড়লে কী ঘটে শরীরে?
ভারতের অমৃতা হাসপাতালের পালমোনোলজি বিভাগের প্রধান ডা. অর্জুন খান্না বলেন, ‘৪০ বছরের ধূমপায়ীকেও ধূমপান ছাড়াতে চিকিৎসকেরা সফল হয়েছেন। প্রথম দিনটি সবচেয়ে কঠিন নয়, কঠিন হলো এই বিশ্বাস ধরে রাখা যে আপনি নিকোটিনের চেয়েও বেশি শক্তিশালী।’
চিকিৎসকদের মতে, শেষ সিগারেটটি ফেলে দেওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই শরীর নিজেকে মেরামত করা শুরু করে:
প্রথম ২০ মিনিটে: হৃদস্পন্দন এবং রক্তচাপ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে শুরু করে।
কয়েক ঘণ্টার মধ্যে: রক্তে কার্বন মনোক্সাইডের মাত্রা দ্রুত কমতে থাকে।
কয়েক সপ্তাহের মধ্যে: ফুসফুসের কার্যক্ষমতা বাড়তে শুরু করে, শ্বাসপ্রশ্বাস সহজ হয় এবং কাশি কমে আসে।
১ বছরের মধ্যে: হৃদরোগের ঝুঁকি অর্ধেকে নেমে আসে। দীর্ঘমেয়াদে স্ট্রোক, ক্রনিক ফুসফুসের রোগ এবং বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকি বহুলাংশে হ্রাস পায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, তামাক প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে ৮০ লাখেরও বেশি মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়, যা প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ।
ভারতের টিজিএইচ অনকো লাইফ ক্যানসার সেন্টারের মেডিকেল অনকোলজিস্ট ডা. রভিকুমার ওয়াটেগাঁওকর জানান, ‘অনেকে ভাবেন বহু বছর ধরে ধূমপান করায় যা ক্ষতি হওয়ার তা হয়েই গেছে, এখন ছেড়ে লাভ নেই—এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। আপনি যেদিনই ধূমপান ছাড়বেন, সেদিন থেকেই শরীর নিজের ক্ষত পূরণ করা শুরু করবে।’
ধূমপান সফলভাবে ছাড়ার কিছু বাস্তবসম্মত পরামর্শ
ডা. অর্জুন খান্না ধূমপান ছাড়ার জন্য সহজ কিছু উপায় তুলে ধরেছেন:
১. ইচ্ছাকে ১০ মিনিট বিলম্বিত করুন: যখনই ধূমপানের তীব্র ইচ্ছা জাগবে, নিজেকে বলুন—‘আমি ১০ মিনিট পর খাব’। এই ১০ মিনিটে ইচ্ছা অনেকটাই কমে যায়।
২. পানি পান করুন: ইচ্ছা হলেই এক গ্লাস পানি পান করুন।
৩. হাঁটাহাঁটি ও গভীর শ্বাস: ছোটখাটো হাঁটা দিন এবং ধীরে ধীরে গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম করুন।
৪. উপকরণ সরিয়ে ফেলুন: ঘর ও চারপাশ থেকে সিগারেট, লাইটার এবং অ্যাসট্রে একবারে ফেলে দিন।
৫. ট্রিগার চিহ্নিত করুন: চা-কফির বিরতি, মানসিক চাপ, অ্যালকোহল বা আড্ডার সময় ধূমপানের ইচ্ছা বেশি জাগলে সেই অভ্যাসগুলোর জায়গায় বিকল্প কিছু গ্রহণ করুন (যেমন: বই পড়া, গান শোনা বা স্বাস্থ্যকর স্ন্যাক্স খাওয়া)।
পুনরায় ধূমপান শুরু হলে ভেঙে পড়বেন না
সার্জিক্যাল অনকোলজিস্ট ডা. অমিত চক্রবর্তী বলেন, ‘একবারে ব্যর্থ হওয়া মানেই চেষ্টা ছেড়ে দেওয়া নয়। অনেকেই স্থায়ীভাবে ধূমপান ছাড়ার আগে একাধিকবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। প্রতিটি ধূমপানমুক্ত দিনই একটি সুস্থ ও দীর্ঘ জীবনের পথে একেকটি ধাপ।’ প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ‘নিকোটিন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি’ বা ওষুধের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে।
বিশাল দাদলানির এই গল্পটি মনে করিয়ে দেয় যে কোনো ধূমপায়ীই সুস্থ জীবনের সীমানার বাইরে চলে যাননি। ডা. অর্জুন খান্নার ভাষায়, ‘আপনি যে সিগারেটটি খাচ্ছেন না, প্রতিটিতে জয় হচ্ছে আপনার ফুসফুসের। আপনার নিখুঁত ইচ্ছাশক্তির প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন কেবল একটি শক্ত সিদ্ধান্ত এবং প্রতিদিন সেই সিদ্ধান্তের ওপর টিকে থাকার সাহসিকতা।’
সূত্র: এনডিটিভি লাইফলাইন
এসএ/টিকে