চট্টগ্রামে হঠাৎ জলদস্যুদের হানা, ১৮ দিনে লুট ৩ জাহাজ
ছবি: সংগৃহীত
০৮:২৪ পিএম | ০১ আগস্ট, ২০২৬
চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে ১৮ দিনের মধ্যে তিনটি জাহাজে হানা দিয়েছে জলদস্যুরা। এতে মোট ১০ কোটি টাকার মালপত্র লুট হয়েছে। একের পর এক এমন ঘটনায় উদ্বিগ্ন আমদানিকারকসহ বন্দর ব্যবহারকারীরা। দস্যুতা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছে চট্টগ্রাম চেম্বার।
বহির্নোঙরে জাহাজে জলদস্যুতা প্রতিরোধে নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের কাছে পাঠানো চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, জলদস্যুতার ঘটনায় অন্তত ১০ কোটি টাকার মালপত্র, জাহাজের সরঞ্জাম ও মূল্যবান যন্ত্রাংশ লুট হয়েছে। পাশাপাশি জাহাজের নিরাপত্তা ও নাবিকদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশের আমদানি-রপ্তানির ৯২ ভাগ পরিচালিত হয়। এটির বহির্নোঙরের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে জাতীয় অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষতির মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে বিদেশি শিপিং অপারেটরদের মধ্যে ঝুঁকির আশঙ্কা বাড়বে, বীমা ব্যয় এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের খরচও বেড়ে যাবে। তাই জরুরি পদক্ষেপ নিতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছি আমরা।’
সর্বশেষ গত ১৬ জুলাই ভোরে চার্লি অ্যাঙ্করেজে নোঙর করা সিয়েরা লিওনের পতাকাবাহী ট্যাঙ্কার ‘তাই শুয়েন’-এ হামলা চালায় জলদস্যুরা। জাহাজটি হংকং থেকে আনা হয় সীতাকুণ্ডে জনতা স্টিলের শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে ভাঙার জন্য। প্রায় ২০ সশস্ত্র দস্যু পাঁচটি কাঠের নৌকায় এসে হানা দেয়।
শিপিং এজেন্ট বেন লাইনের মালিক মোশাররফ হোসেন জানান, নোঙর ফেলার সময় হামলাকারীদের একটি দল নাবিকদের ব্যস্ত রাখে এবং অন্য দল ডেক থেকে নোঙরের দড়ি, ব্যাটারি ও অন্যান্য মূল্যবান সরঞ্জাম লুট করে। জাহাজের ক্যাপ্টেন তাৎক্ষণিকভাবে বন্দর নিয়ন্ত্রণ কক্ষে রেডিও বার্তা পাঠালেও কোস্টগার্ড ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই দস্যুরা পালিয়ে যায়।
এর আগে ২৯ জুন চার্লি অ্যাঙ্করেজে ডায়নামিক শিপ রিসাইক্লিংয়ের আমদানি করা ‘এমভি হাই জু’ জাহাজে ২০ থেকে ২৫ জন সশস্ত্র ডাকাত উঠে নাবিকদের জিম্মি করে প্রায় এক কোটি টাকার যন্ত্রাংশ লুট করে নিয়ে যায়। এর পরদিন যমুনা শিপ ব্রেকার্সের আমদানি করা ‘এমটি আইআরওএস’ জাহাজ থেকে কয়েক কোটি টাকার সরঞ্জাম চুরি হয়। পরে নৌ পুলিশ রাজধানীর বাংলাবাজার এলাকা থেকে প্রায় দুই কোটি টাকার চোরাই মালপত্র উদ্ধার করে।
আন্তর্জাতিক সমুদ্র নিরাপত্তা সংস্থা রিজিওনাল কো-অপারেশন এগ্রিমেন্ট অন কমবেটিং পাইরেসি অ্যান্ড আর্মড রোবেরি এগেইনস্ট শিপস ইন এশিয়া (রিক্যাপ) তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলেছে, চট্টগ্রাম বন্দরে চলতি বছরের প্রথম চার মাসে (জানুয়ারি-এপ্রিল) কোনো প্রকার দস্যুতা বা চুরির ঘটনা ঘটেনি। তবে হঠাৎ করে একের পর এক ঘটনায় চরম উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশন, শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরসহ বন্দর ব্যবহারকারী বিভিন্ন সংস্থা।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে চট্টগ্রাম চেম্বারের পাঠানো চিঠিতে তাৎক্ষণিক সহায়তা না পাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে বলা হয়, লুট করা পণ্যের বেশির ভাগ উদ্ধার করা যায়নি।
বহির্নোঙরে কয়েকটি জাহাজে চুরির অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেয় বন্দর কর্তৃপক্ষ ও কোস্টগার্ড। এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে এরই মধ্যে বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (হারবার ও মেরিন), বাংলাদেশ কোস্টগার্ড পূর্ব জোনের জোনাল কমান্ডারকে নিয়ে সমন্বয় সভা করেছেন। সভায় সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পর্যালোচনা, ঝুঁকি বিশ্লেষণ ও ভবিষ্যতে চুরি প্রতিরোধে করণীয় নির্ধারণ করা হয়। সভায় বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে বহির্নোঙরে নজরদারি বাড়ানো, অনুমোদিত ওয়াচম্যান নিয়োগ নিশ্চিত, জাহাজের আগমনের তথ্য বাধ্যতামূলক সরবরাহ, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি জোরদারসহ বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব রেফায়েত হামীম বলেন, বহির্নোঙরে চুরি বন্ধে নিরাপত্তাব্যবস্থা কঠোর করা হয়েছে। টানা অভিযান চালাচ্ছে কোস্টগার্ড। চুরির সঙ্গে জড়িত কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’
টিএ/