চবিতে জুলাই ফেস্টে সাঈদীর ছবি-বাণী সংবলিত ফেস্টুন প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে বিতর্ক
ছবি: সংগৃহীত
০৪:০৫ পিএম | ০৫ আগস্ট, ২০২৬
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) আয়োজিত ‘জাগ্রত জুলাই: কালচারাল ফেস্ট’-এর চিত্রকলা ও গ্রাফিতি প্রদর্শনীতে জামায়াতে ইসলামীর প্রয়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছবি ও একটি বাণীসংবলিত ফেস্টুন প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টিকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও বামপন্থী ছাত্রসংগঠনের নেতারা আপত্তি তুলেছেন।
অন্যদিকে চাকসুর জিএসের দাবি, সাঈদীর বাণী প্রদর্শনে আপত্তির কিছু নেই।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) সকালে শহীদ আব্দুর রব হল মাঠে দুই দিনব্যাপী ‘জাগ্রত জুলাই: কালচারাল ফেস্ট’-এর উদ্বোধন হয়।
উদ্বোধনস্থলের পাশে প্রথমে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এবং দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছবি ও বাণীসংবলিত ফেস্টুন রাখা হয়। পরে অনুষ্ঠান শেষে সাঈদীর ফেস্টুনটি মাঠের অন্য পাশে সরিয়ে নেওয়া হয়।
ফেস্টুনে সাঈদীর নামে লেখা ছিল, ‘আমি দেখতে পাচ্ছি বাংলাদেশের ভাগ্যাকাশে উত্তর গগণে কালো মেঘ জমা হয়েছে। যদি সক্ষমভাবে মোকাবিলা করতে না পারেন, তবে এমন গাঢ় কালো অমাবস্যার রাত আসতে পারে, যার সুবহে সাদিক হওয়া অসম্ভব।’
এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে ছাত্রদল প্যানেল থেকে নির্বাচিত চাকসুর এজিএস আইয়ুবুর রহমান তৌফিক বলেন, ‘চাকসুকে দলীয় প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা হচ্ছে। তার ভাষ্য, সব মত ও আদর্শের শিক্ষার্থীর প্রতিনিধিত্বকারী একটি প্রতিষ্ঠানে সাঈদীর ফেস্টুন রাখা আপত্তিকর।
পরে জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার ফেস্টুন এনে বিষয়টিকে ‘ব্যালেন্স’ করার চেষ্টা করা হয়েছে।
তৌফিকের দাবি, জুলাই আন্দোলনের সামগ্রিক ইতিহাস তুলে ধরার পরিবর্তে আয়োজনটিতে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ধারার প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, জামায়াতপন্থি কবি মতিউর রহমান মল্লিকের ফেস্টুন থাকলেও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কোনো ফেস্টুন ছিল না। একই সঙ্গে জুলাই আন্দোলনে নারীদের অবদানও উপস্থাপন করা হয়নি।
চবি ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক সজ্জাদ হোসেন হৃদয় বলেন, যুদ্ধাপরাধে দণ্ডিত ও বিতর্কিত ব্যক্তির ছবি প্রদর্শনের মাধ্যমে ইতিহাস বিকৃত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তার অভিযোগ, শিক্ষার্থীদের অর্থে চাকসুর ব্যানারে দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে। এ ঘটনায় চাকসু ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের জবাবদিহি দাবি করেন তিনি।
অন্যদিকে ছাত্রশিবির প্যানেল থেকে নির্বাচিত চাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সাঈদ বিন হাবিব বলেন, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী বাংলাদেশের বহু মানুষের শ্রদ্ধার ব্যক্তি। তাঁর দাবি, যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাঈদীর বিরুদ্ধে রায় হয়েছিল, সেটিকে সে সময় বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা বিতর্কিত বলেছিল।
তিনি আরও বলেন, ‘চাকসুর অনুষ্ঠানে বেগম খালেদা জিয়া, জিয়াউর রহমান ও দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী—বাংলাদেশকে ধারণ করেছেন, এমন তিনজনের বাণী রাখা হয়েছে। শিক্ষার্থীরা এটি ইতিবাচকভাবেই গ্রহণ করেছেন।’
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুমাইয়া সিকদার বলেন, ‘জুলাইয়ের স্মৃতি সংরক্ষণের আড়ালে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী রাজনীতিকে স্বাভাবিক হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীকে সহযোগিতা করা ব্যক্তিদের মধ্যে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী অন্যতম।’
চবি গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিলের সদস্য রিশাদ আমীন বর্ণের অভিযোগ, ছাত্রশিবির চাকসুর ব্যানার ব্যবহার করে নিজেদের রাজনৈতিক বক্তব্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। তাঁর মতে, জুলাই ফেস্টে সাঈদীর ছবি প্রদর্শন সেই প্রচেষ্টারই অংশ।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাকসুর সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আল-ফোরকানকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তাঁর সাড়া পাওয়া যায়নি।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই দিনব্যাপী চিত্রকলা ও গ্রাফিতি প্রদর্শনী এবং শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। মঙ্গলবার সকাল ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘর গ্যালারিতে প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আল-ফোরকান। পরে চাকসু কেন্দ্রে শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতারও উদ্বোধন করেন তিনি।
উপাচার্য বলেন, জুলাইয়ের ঘটনাগুলো জাতির জন্য স্মরণীয়। সেই সময় স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা গণতন্ত্র, স্বাধীন মতপ্রকাশ ও নিরাপদ রাষ্ট্রের স্বপ্নে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। তাঁদের আত্মত্যাগের কারণেই আজ মানুষ স্বাধীনভাবে কথা বলার সুযোগ পাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আরআই/টিএ