চিকেন নেক নিয়ে নতুন পরিকল্পনা ভারতের
ছবি: সংগৃহীত
০২:১৩ পিএম | ০৭ আগস্ট, ২০২৬
ভারত ও মিয়ানমারের মধ্যে দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধ মেটাতে সীমিত পরিসরে ভূমি বিনিময়ের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সীমান্তের কিছু অমীমাংসিত অংশ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে। অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে প্রস্তাবটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত তা অনুমোদন পেলে দুই দেশের মধ্যে নতুন সীমান্ত সমঝোতার পথ খুলতে পারে।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের চারটি রাজ্য অরুণাচল প্রদেশ, নাগাল্যান্ড, মণিপুর ও মিজোরামের সঙ্গে মিয়ানমারের এক হাজার ৬৪৩ কিলোমিটার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্ত রয়েছে। এর বড় অংশে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের কাজ চলছে। কিন্তু মণিপুরের চান্দেল জেলার কয়েকটি এলাকায় সীমান্ত নির্ধারণ নিয়ে বিরোধ থাকায় সেই কাজ আটকে রয়েছে।
ভারতীয় গণমাধ্যমের তথ্যানুযায়ী, প্রায় এক দশমিক ৪৪ বর্গমাইল বা তিন দশমিক ৭২ বর্গকিলোমিটার এলাকা বিনিময়ের একটি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে। সংশ্লিষ্ট এলাকায় সীমান্ত চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা গেলে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ সম্পন্ন করা সহজ হবে বলে মনে করছে নয়াদিল্লি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল সম্প্রতি বলেছেন, সীমান্তের কিছু অংশ এখনো অমীমাংসিত রয়েছে। উভয় দেশ আলোচনার মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজছে।
বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, সীমান্ত দিয়ে মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান এবং অবৈধ অনুপ্রবেশের ঘটনাই ভারতকে দ্রুত সীমান্ত সুরক্ষায় উদ্যোগী করেছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সীমান্ত আরও স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগের একমাত্র স্থলপথ হিসেবে পরিচিত চিকেন নেক করিডরের নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই দিল্লির উদ্বেগ রয়েছে। যদিও সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এই ভূমি বিনিময় উদ্যোগের সঙ্গে চিকেন নেকের সরাসরি কোনো সম্পর্কের কথা বলেনি, তবু অনেকের মতে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সামগ্রিক নিরাপত্তা জোরদারের বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ এবং সীমান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির চেষ্টা চলছে।
ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর দাবি, সীমান্তের দুর্গম এলাকাগুলো দিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই মাদক, অস্ত্র ও বিভিন্ন ধরনের চোরাচালান পরিচালিত হচ্ছে। সেই সঙ্গে অবৈধ অনুপ্রবেশও বেড়েছে। এসব কারণে সীমান্তে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি পুরো সীমান্তে বেড়া নির্মাণকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে কেন্দ্র। তবে ভূমি বিনিময়ের সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত ঘিরে মণিপুরে আপত্তিও দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় কয়েকটি সংগঠন বলেছে, ভারতের কোনো ভূখণ্ড অন্য দেশের কাছে হস্তান্তর মেনে নেওয়া হবে না। তাদের দাবি, সীমান্ত নির্ধারণের নামে মণিপুরের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করা উচিত নয়। আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো মিয়ানমারের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি। সামরিক অভ্যুত্থানের পর দেশটির সীমান্তবর্তী অনেক এলাকা এখন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ফলে সীমান্ত নিয়ে দুই দেশের মধ্যে কোনো সমঝোতা হলেও বাস্তবায়ন কতটা সহজ হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
ভারত বর্তমানে কালাদান বহুমুখী পরিবহণ প্রকল্প এবং ভারত, মিয়ানমার ও থাইল্যান্ড মহাসড়ক প্রকল্পকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে সীমান্ত স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
এর আগে বাংলাদেশের সঙ্গে স্থলসীমান্ত চুক্তির মাধ্যমে দীর্ঘদিনের ছিটমহল সমস্যার সমাধান করেছিল ভারত। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এবার মিয়ানমারের সঙ্গেও সীমান্ত বিরোধ মেটাতে চায় নয়াদিল্লি। তবে বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি, স্থানীয় বিরোধিতা এবং মিয়ানমারের অস্থিতিশীল রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় এই উদ্যোগ কত দ্রুত বাস্তবায়ন হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
এসএন