কারাগারে ডন, ‘সালমান শাহকে হত্যায় ১২ লাখ টাকায় চুক্তি হয়’
ছবি: সংগৃহীত
০৭:৫০ পিএম | ০৯ আগস্ট, ২০২৬
আবারও আলোচনায় ঢালিউডের জনপ্রিয় নায়ক সালমান শাহ হত্যা মামলা। রোববার এই মামলার আট নম্বর আসামি আশরাফুল হক ডনকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এরই মধ্যে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন পেছানো হয়েছে বারবার। তবে ডনকে গ্রেফতারের মধ্যদিয়ে সালমান শাহ হত্যা মামলাটি অগ্রগতি পাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দীর্ঘদিন পলাতক থাকার পর রোববার (৯ আগস্ট) বিমানবন্দরে গ্রেফতারের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাকে আদালতে হাজির করা হয়। এদিন এজলাসে মাথানিচু করে রাষ্ট্রপক্ষের উপস্থাপিত অভিযোগ শোনেন মামলার এজাহারনামীয় আট নম্বর আসামি আশরাফুল হক ডন। পরে শুনানি শেষে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত।
এদিন আদালতে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী। এক আসামির স্বীকারোক্তির বরাত দিয়ে তিনি বলেন, ‘১২ লাখ টাকার বিনিময়ে সালমান শাহকে হত্যার চুক্তির কথা সেখানে উঠে আসে।’
বিকেল ৫টার দিকে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা এজলাসে উঠলে ডনের বিষয়ে শুনানি শুরু হয়। এ সময় ডনকে মাথানিচু করে দাঁড়িয়ে আদালতে উপস্থাপিত অভিযোগ শুনতে দেখা যায়। শুনানির শুরুতে তাকে পুলিশের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলতেও দেখা যায়।
শুনানিতে ঢাকা মহানগর আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী রাষ্ট্রপক্ষে বক্তব্য দেন। তিনি আদালতকে বলেন, ‘সালমান শাহ হত্যা মামলাটি দীর্ঘদিন ধরে চলমান এবং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলা। আশরাফুল হক ডন রোববার ভোর ৫টার দিকে দেশ ছাড়ার চেষ্টা করার সময় বিমানবন্দরে গ্রেফতার হয়েছেন। তিনি দেশের বাইরে চলে গেলে আজীবনের জন্য পলাতক থাকতে পারেন।’
পিপি আরও বলেন, ‘একটি ঘটনার পর সালমান শাহ হত্যা মামলার মোড় ঘুরে যায়। সালমান শাহকে হত্যার পর তার ছোট ভাইকে অপহরণের চেষ্টা করা হয়েছিল। এ ঘটনায় ক্যান্টনমেন্ট থানায় একটি অভিযোগ করা হয়েছিল।’
ওই মামলায় এক আসামির স্বীকারোক্তির বরাত দিয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আদালতে বলেন, ‘১২ লাখ টাকার বিনিময়ে সালমান শাহকে হত্যার চুক্তির কথা সেখানে উঠে আসে। এমন আসামিকে কারাগারে রাখা প্রয়োজন বলেও আদালতে যুক্তি দেন তিনি।’
তবে আশরাফুল হক ডনের পক্ষে কোনো জামিন আবেদন করা হয়নি। ফলে তার পক্ষে জামিনের বিষয়ে কোনো শুনানি হয়নি। রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য ও সিআইডির আবেদনের ওপর শুনানি শেষে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা সিআইডির আবেদন মঞ্জুর করেন। পরে আশরাফুল হক ডনকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত।
বিমানবন্দরে আটক, আদালতের হাজতখানা হয়ে এজলাসে
রোববার ভোর ৫টার দিকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ আশরাফুল হক ডনকে আটক করে। রমনা থানার অধিযাচনমূলে তাকে আটক করা হয় বলে সিআইডির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরে তাকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পাঠানো হয়। প্রথমে আদালতের হাজতখানায় রাখা হয় তাকে। বিকেল ৫টার দিকে তাকে এজলাসে তোলা হলে শুরু হয় শুনানি।
আদালতে পাঠানো সিআইডির প্রতিবেদনে বলা হয়, আশরাফুল হক ডন দীর্ঘদিন ধরে পলাতক ছিলেন। তাকে পুলিশ হেফাজতে এনে মামলার বিষয়ে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদের প্রক্রিয়া চলছিল। জামিনে মুক্তি পেলে তদন্ত কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি তিনি পুনরায় পলাতক হতে পারেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে সিআইডি। এ কারণে তার জামিনের ঘোর বিরোধিতা করে তাকে জেলহাজতে আটক রাখার আবেদন করে তদন্ত সংস্থা।
আটবার পেছিয়েছে সিআইডির তদন্ত প্রতিবেদন
সালমান শাহ হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখও এরই মধ্যে আটবার পিছিয়েছে। ২০২৫ সালের ২১ অক্টোবর রমনা থানায় নতুন করে হত্যা মামলা হওয়ার পর মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
সর্বশেষ গত ২৩ জুলাই তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য ছিল। কিন্তু সেদিনও তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক জিয়াউল মোর্শেদ প্রতিবেদন জমা দিতে পারেননি। পরে আদালত আগামী ৩০ আগস্ট প্রতিবেদন দাখিলের নতুন দিন ধার্য করেন।
মামলায় সালমান শাহর স্ত্রী সামিরা হক, তার মা লতিফা হক লিও ওরফে লুসি, অভিনেতা আশরাফুল হক ডনসহ মোট ১১ জনকে আসামি করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় পরিকল্পিত হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।
মরদেহ উত্তোলনের উদ্যোগ
তদন্তের অংশ হিসেবে গত ২০ মে সালমান শাহর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তার মরদেহ কবর থেকে উত্তোলনের অনুমতি চান তদন্ত কর্মকর্তা। পরে আদালত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে মরদেহ উত্তোলন, সুরতহাল প্রস্তুত ও ময়নাতদন্তের অনুমতি দেন।
তবে এ আদেশের বিরুদ্ধে বাদীপক্ষ আবেদন করলে আদালত তা নথিভুক্ত করেন। পরে গত ২২ জুন দেহাবশেষ উত্তোলনের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সিলেটের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পিংকি সাহাকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
যেভাবে হত্যা মামলায় গড়ায়
মামলার নথি অনুযায়ী, ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর চিত্রনায়ক সালমান শাহ মারা যান। প্রথমে এ ঘটনায় অপমৃত্যুর মামলা হয়। পরে তার বাবা প্রয়াত কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী ঘটনাটিকে হত্যা দাবি করে মামলা হিসেবে তদন্তের আবেদন করেন।
সিআইডি ১৯৯৭ সালে দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদনে সালমান শাহর মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে মত দেয়। বাদীপক্ষ ওই প্রতিবেদন চ্যালেঞ্জ করে আদালতে রিভিশন আবেদন করে।
দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত রিভিশন মঞ্জুর করে মামলাটি হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন। ওই আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে সালমান শাহর মামা মোহাম্মদ আলমগীর রমনা থানায় নতুন করে হত্যা মামলা করেন।
আরআই/টিএ