৫ মাদরাসায় শতভাগ ফেল, সিসিটিভিকে দায়ী করলেন অধ্যক্ষ
ছবি: সংগৃহীত
১০:২৮ পিএম | ১১ আগস্ট, ২০২৬
নওগাঁর মান্দা উপজেলার পাঁচটি মাদরাসা থেকে ২০২৬ সালের দাখিল পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৫৬ জন পরীক্ষার্থীর একজনও পাস করতে পারেনি। এমন ফলাফলের পেছনে পরীক্ষার কেন্দ্রে হঠাৎ সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনকে অন্যতম কারণ হিসেবে দাবি করেছেন চকদেবীররাম চকভোলাই আলিম মাদরাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. জালাল উদ্দিন।
তার দাবি, সিসিটিভি ক্যামেরার সামনে শিক্ষার্থীরা ভীত ও বিহ্বল হয়ে পড়ায় তারা পরীক্ষায় ভালো করতে পারেনি।
সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা গেছে, ১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত ও ১৯৯৯ সালে এমপিওভুক্ত কুসুম্বা শাহী দাখিল মাদরাসায় বর্তমানে ১৮ জন শিক্ষক থাকলেও ৯ জন পরীক্ষার্থীর সবাই অকৃতকার্য হয়েছে, যাদের অধিকাংশই ফেল করেছে গণিত ও পদার্থ বিজ্ঞানে। ১৯৬৫ সালে প্রতিষ্ঠিত ও ২০০২ সালে এমপিওভুক্ত রামনগর দাখিল মাদরাসায় ১৪ জন শিক্ষক কর্মরত থাকলেও পরীক্ষা দেওয়া ১৩ জনের কেউই পাস করেননি, যাদের মূল সমস্যা ছিল আরবি সাহিত্যে। এ ছাড়া ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ও ১৯৮৬ সালে এমপিওভুক্ত চকদেবীররাম চকভোলাই আলিম মাদরাসায় ২১ জন শিক্ষক থাকা সত্ত্বেও ১৫ জন পরীক্ষার্থীর সবাই অকৃতকার্য হয়েছে এবং তাদের বড় অংশ ফেল করেছে গণিত ও কুরআন মাজিদে। অন্যদিকে চকরঘুনাথ দাখিল মাদরাসা থেকে ১৩ জন এবং এলেঙ্গা দাখিল মাদরাসা থেকে ৬ জন পরীক্ষার্থীর সবাই ফেল করেছে।
এদিকে এসএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় ঘোনা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় অ্যান্ড কলেজ থেকে ২ জন এবং এসএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় জোতবাজার আদর্শ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় থেকে ৫ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়ে অকৃতকার্য হওয়ায় সেই দুটি প্রতিষ্ঠানের পাসের হারও শূন্যে নেমে এসেছে। সব মিলিয়ে ওই সাতটি প্রতিষ্ঠানের ৬৩ জন পরীক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে।
এ ফলাফল নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তাদের দাবি, একটি উপজেলার পাঁচটি মাদরাসায় একসঙ্গে শতভাগ শিক্ষার্থী ফেল করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। শিক্ষার মান, নিয়মিত পাঠদান ও প্রতিষ্ঠানগুলোর অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের দাবি জানিয়েছেন তারা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক বলেন, আমরা কষ্ট করে সন্তানদের মাদরাসায় পাঠাই। কিন্তু নিয়মিত পাঠদান ও মনিটরিংয়ের অভাবেই আজ আমাদের সন্তানদের এই করুণ পরিণতি হয়েছে। শিক্ষকদের এই গাফিলতির দায় কে নেবে?
চকদেবীররাম এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা মো. রাজিব বলেন, পড়ালেখার মান খারাপ হওয়ার কারণেই ফলাফলের এই অবস্থা হয়েছে। প্রশাসন বিষয়টি খতিয়ে দেখবে এটাই প্রত্যাশা।
কুসুম্বা শাহী দাখিল মাদরাসার সরকারি গণিত শিক্ষক মো. এজাজ আলী বলেন, আমাদের মাদ্রাসার বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই অনিয়মিত এবং অনেকে ঝরে পড়া। আমরা নিয়মিত অতিরিক্ত ক্লাস ও কোচিংয়ের ব্যবস্থা করলেও তারা নিয়মিত উপস্থিত হয় না। অভিভাবকদের সচেতন করতে অভিভাবক সমাবেশ করা হলেও সেখানেও আশানুরূপ উপস্থিতি পাওয়া যায় না। মূলত শিক্ষার্থীদের অনিয়মিত স্বভাবের কারণেই ফলাফলের এই বিপর্যয়।
চকদেবীররাম চকভোলাই আলিম মাদরাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. জালাল উদ্দিন বলেন, আমাদের মাদরাসা থেকে এবার ১৫ জন শিক্ষার্থী দাখিল পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ করে পরীক্ষার কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরার সম্মুখে পড়ে তারা ভীত ও বিহ্বল হয়ে পড়ে। ফলে পরীক্ষা ভালো করতে পারেনি। এছাড়াও বাল্যবিয়ের কারণে অনেক মেধাবী ছাত্রী ঝরে পড়া এবং করোনাকালীন দুর্বলতাও এর পেছনে প্রভাব ফেলেছে।
তিনি আরও বলেন, বিগত বছরগুলোতে আমাদের প্রতিষ্ঠানে শতভাগ পাসসহ জিপিএ-৫ পাওয়ার রেকর্ড রয়েছে। আলিম পরীক্ষাতেও শতভাগ সাফল্য ছিল। এবার দাখিলে এমন ফলে আমরা অত্যন্ত দুঃখিত। তবে আশা করছি, চলমান আলিম পরীক্ষার ফলাফলে শিক্ষার্থীরা আবারও ভালো ফল উপহার দেবে।
মান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আখতার জাহান সাথী বলেন, মান্দা উপজেলার পাঁচটি মাদরাসার শতভাগ শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হওয়ার বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই শতভাগ শিক্ষার্থী ফেল করুক, তা আমাদের কাম্য নয়। অতি শিগগিরই এসব প্রতিষ্ঠান প্রধানদের নিয়ে বসে বিগত বছরগুলোর ফলাফলের ধারা পর্যালোচনা করা হবে। যদি ধারাবাহিক খারাপ ফলাফলের চিত্র দেখা যায়, তবে তাদের কঠোর নজরদারির আওতায় আনা হবে। পাশাপাশি শিক্ষার মানোন্নয়ন ও ফলাফলের প্রসারে কার্যকর কৌশল নির্ধারণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নওগাঁ জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. শাহাদৎ হোসেন বলেন, মান্দায় শতভাগ অকৃতকার্য হওয়ার পেছনে দীর্ঘদিনের ধারাবাহিক প্রভাব রয়েছে। করোনার প্রভাবের পাশাপাশি বিগত সরকারের আমলের কারিকুলামে মূল পড়াশোনা বাদ দিয়ে নাচ-গান ও রান্নাবান্নার মতো অন্যান্য কাজের প্রাধান্য বেশি ছিল, যা শিক্ষার্থীদের পড়ার অভ্যাসে ব্যাঘাত ঘটিয়েছে। এছাড়া জুলাই আন্দোলনের কারণে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা ছেড়ে রাজপথে ছিল। এসব নানা কারণেই ফলাফলের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
আরআই/টিএ