রাজধানীর নিউমার্কেটে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ছাত্রদল-যুবদল সংঘর্ষ, আহত ১৫
ছবি: সংগৃহীত
০২:৫৫ এএম | ১২ আগস্ট, ২০২৬
রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় চাঁদা আদায়, দোকান দখল ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ঢাকা কলেজ ছাত্রদল এবং নিউমার্কেট থানা যুবদলের নেতাকর্মীদের মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে মিরপুর রোডের বলাকা সিনেমা হলের সামনে এই সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। সংঘর্ষে উভয় পক্ষের মোট ১৫ জন আহত হয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সূত্রে জানা গেছে। এদের মধ্যে ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের ৮ জন এবং নিউমার্কেট থানা যুবদলের সদস্যসচিব কে. এম. চঞ্চলের গ্রুপের ৭ জন সদস্য রয়েছেন। আহতদের কয়েকজনকে চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং অন্যদের পপুলার হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সংঘর্ষের ঘটনার পরপরই চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে ঢাকা কলেজের সাধারণ শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসের সামনের সড়কে বিক্ষোভ মিছিল করেন।
ঘটনার শুরু এবং দায়ভার নিয়ে দুটি সংগঠনের পক্ষ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করা হয়েছে।
ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের দাবি, নিউমার্কেট থানা যুবদলের সদস্যসচিব কে. এম. চঞ্চলের অনুসারী হিসেবে পরিচিত মো. সোহেল এবং আজিম ওরফে ‘গুন্ডা আজিম’ বলাকা সিনেমা হলের সামনের ফুটপাতের দোকান ও ভ্যানগাড়ি থেকে জোরপূর্বক চাঁদা তুলতে যান। এ খবর পেয়ে ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের কয়েকজন সদস্য সেখানে গিয়ে চাঁদা আদায়ে বাধা দিলে দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা শুরু হয়।
ছাত্রদলের অভিযোগ, এর কিছুক্ষণ পর কে. এম. চঞ্চলের নেতৃত্বে ৫০ থেকে ৬০ জনের একটি দল লাঠিসোঁটা, রামদা, চাপাতি ও চাইনিজ কুড়ালসহ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়।
ভুক্তভোগী ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী সুমন সিকদার জানান, ক্যাম্পাসের দিকে যাওয়ার পথে তারা চাঁদাবাজির ঘটনা দেখে প্রতিবাদ করলে তাদের গালাগাল করা হয় এবং পরবর্তীতে সশস্ত্র হামলা চালানো হয়।
২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী মো. সায়মন ইসলাম জানান, সন্ধ্যায় বলাকা হলের সামনে যুবদলের নেতাকর্মীরা চাঁদা দাবি করলে দোকানদারের খবরের ভিত্তিতে তারা গিয়েছিলেন। সেখানে যুবদল সদস্যসচিব কে. এম. চঞ্চলের নেতৃত্বে তাদের ওপর হামলা করা হয় এবং তার মাথায় চাইনিজ কুড়াল দিয়ে আঘাত করা হয়।
ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সাগর খান জানান, খবর পেয়ে তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছে ১৫ থেকে ২০ জনকে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালাতে দেখেন। এতে গুরুতর আহত ৮ জনসহ মোট ১০-১২ জন শিক্ষার্থী রক্তাক্ত হন।
আহতরা হলেন—ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক প্রিন্স খন্দকার (২৬), মো. সুমন সিকদার (২৮), আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সাগর খান (৩২), সায়মন ইসলাম (২৭), সদস্য মুসফিকুর রহিম (২৬), জিহাদুল ইসলাম (২৯), শাকিব হাসান (২৭) এবং ইমরান হোসেন (২৫)।
এ ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে নিউমার্কেট থানায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে বলে ছাত্রদল নেতারা জানান।
অন্যদিকে ছাত্রদলের তোলা সমস্ত অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে নিউমার্কেট থানা যুবদল। তাদের পাল্টা দাবি, তারা কোনো চাঁদাবাজি বা দোকান দখলের সঙ্গে যুক্ত নন।
যুবদলের নেতাদের ভাষ্যমতে, মঙ্গলবার বিকালে মার্কেট বন্ধ থাকার সুযোগ কাজে লাগিয়ে ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের সাবেক ও বর্তমান কয়েকজন সদস্য নিউমার্কেটের কিছু দোকান দখল এবং দোকানদারদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের চেষ্টা করছিলেন।
নিউমার্কেট থানা যুবদলের সাবেক আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মো. রহিম, ১৮ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের আহ্বায়ক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক মো. সোহেল, সদস্য আজিম পাটওয়ারী এবং যুগ্ম আহ্বায়ক চায়না সুমন জানান, মার্কেট বন্ধ থাকায় তারা সেখানে আড্ডা দিচ্ছিলেন। ছাত্রদলের চাঁদাবাজির চেষ্টা দেখে তারা ‘দলের নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজি চলবে না’ বলে বিষয়টি মীমাংসা করে সেখান থেকে সরে যান।
যুবদল নেতাদের অভিযোগ, তারা পরবর্তীতে প্রিয়াঙ্গন মার্কেটের গলিতে অবস্থিত যুবদল কার্যালয়ে গিয়ে বসলে সন্ধ্যা ৭টার দিকে ঢাকা কলেজের ৭০ থেকে ৮০ জন ছাত্রদল নেতাকর্মী গিয়ে কার্যালয়ে হামলা ও ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। এ সময় কার্যালয়ে থাকা টেলিভিশন, আসবাবপত্রের পাশাপাশি বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান, প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান এবং ঢাকা-১০ আসনের সংসদ সদস্য শেখ রবিউল আলমের ছবি ভাঙচুর করে ছিঁড়ে ফেলা হয়।
সংঘর্ষে যুবদলের আহত হিসেবে যাদের নাম পাওয়া গেছে তারা হলেন—কাঁটাবন ইউনিট যুবদলের সদস্য মো. জাকির হোসেন, এলিফ্যান্ট রোড ইউনিট যুবদলের সদস্য মো. সুজন, নিউমার্কেট থানা যুবদলের সাবেক সদস্য মো. সোহেল, সুমন, ১৮ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সদস্য শাহ আলম, ইদ্রিস, রাকিব এবং নিউমার্কেট থানা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মো. সুমন মিয়া। যুবদল নেতারাও এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে জড়িতদের বিচার দাবি করেছেন এবং থানায় মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানান।
এ ঘটনায় নিউমার্কেট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আইয়ুব হোসেন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, নিউমার্কেট এলাকায় মারামারির খবর তারা পেয়েছেন, তবে হতাহতের সঠিক সংখ্যা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
তিনি জানান, পুলিশ খবরটি গুরুত্বের সঙ্গে তদারকি করছে এবং এখনও পর্যন্ত থানায় কোনো পক্ষের লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পাওয়া মাত্রই পুলিশ নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা ও অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
একেএস/টিএ