কালজয়ী চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানের ৯১তম জন্মদিন আজ
ছবি: সংগৃহীত
১১:২৪ এএম | ১৯ আগস্ট, ২০২৬
বাংলা চলচ্চিত্র ও সাহিত্যের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নাম জহির রায়হান। নির্মাতা, লেখক ও সাংবাদিক হিসেবে অল্প সময়ের জীবনেই তিনি রেখে গেছেন অসামান্য সব সৃষ্টি। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতার পর বুদ্ধিজীবী হত্যার অনুসন্ধান- দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সামাজিক অধ্যায়ের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে ছিল তার জীবন ও কর্ম। আজ ১৯ আগস্ট, এই কালজয়ী চলচ্চিত্রকার ও লেখকের জন্মদিন।
১৯৩৫ সালের এই দিনে ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার মজুপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন জহির রায়হান। তার পিতা মাওলানা মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ ছিলেন কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসার অধ্যাপক। পরে তিনি ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষের দায়িত্বও পালন করেন। ১৯৫৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন জহির রায়হান।
সাংবাদিকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন তিনি। ‘যুগের আলো’ পত্রিকায় কাজ করার পর ‘খাপছাড়া’, ‘যান্ত্রিক’, ‘সিনেমা’সহ বিভিন্ন প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত হন। পরে ‘প্রবাহ’ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তবে সাহিত্য ও চলচ্চিত্র- দুই ক্ষেত্রেই নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন তিনি।
১৯৫৫ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘সূর্যগ্রহণ’। এরপর একে একে পাঠকের হাতে আসে ‘শেষ বিকেলের মেয়ে’, ‘আরেক ফাল্গুন’ ও ‘হাজার বছর ধরে’র মতো কালজয়ী সৃষ্টি। ‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাসের জন্য ১৯৬৪ সালে তিনি লাভ করেন মর্যাদাপূর্ণ আদমজী সাহিত্য পুরস্কার।

চলচ্চিত্রে জহির রায়হানের যাত্রা শুরু হয় ১৯৫৭ সালে ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ ছবিতে সহকারী হিসেবে কাজ করার মধ্য দিয়ে। ১৯৬১ সালে ‘কখনো আসেনি’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। এরপর নির্মাণ করেন ‘কাঁচের দেয়াল’, ‘বেহুলা’, ‘আনোয়ারা’সহ উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র। ১৯৬৪ সালে নির্মাণ করেন পাকিস্তানের প্রথম উর্দু রঙিন চলচ্চিত্র ‘সঙ্গম’। পরের বছর তার হাত ধরেই নির্মিত হয় পাকিস্তানের প্রথম সিনেমাস্কোপ চলচ্চিত্র ‘বাহানা’।
ভাষা আন্দোলনের চেতনা গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল জহির রায়হানকে। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির চেতনা থেকেই তিনি নির্মাণ করেন ‘জীবন থেকে নেয়া’, যা পরবর্তীকালে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক অনন্য রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দলিল হয়ে ওঠে।
মুক্তিযুদ্ধের সময়ও চলচ্চিত্রকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন জহির রায়হান। ১৯৭১ সালে কলকাতায় গিয়ে বরেণ্য নির্মাতা সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন ও ঋত্বিক ঘটকের মতো চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বদের উপস্থিতিতে ‘জীবন থেকে নেয়া’ প্রদর্শন করেন। ছবিটি ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করে। একই সময়ে মুক্তিযুদ্ধ ও পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার ভয়াবহতা তুলে ধরে নির্মাণ করেন ঐতিহাসিক প্রামাণ্যচিত্র ‘স্টপ জেনোসাইড’। এই চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী থেকে পাওয়া অর্থ তিনি মুক্তিযোদ্ধা তহবিলে দান করেছিলেন।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর ঢাকায় ফেরেন জহির রায়হান। এরপর তিনি নিখোঁজ বুদ্ধিজীবীদের সন্ধান এবং হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করতে সক্রিয় হন। গঠিত হয় বুদ্ধিজীবী হত্যা তদন্ত কমিটি। জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের পেছনের মূল ষড়যন্ত্রকারীদের মুখোশ উন্মোচন করবেন।
কিন্তু সেই অনুসন্ধান শেষ করে সত্য প্রকাশের সুযোগ আর তার হয়নি। ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি খবর আসে, তার নিখোঁজ ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারকে মিরপুরে আটকে রাখা হয়েছে। খবর পেয়ে ছোট ভাই জাকারিয়া হাবিব, শ্যালক বাবুল ও শাহরিয়ার কবিরসহ কয়েকজনকে নিয়ে মিরপুরের উদ্দেশে রওনা হন জহির রায়হান। নিরাপত্তার কারণে সেনাবাহিনী অন্যদের আটকে দিলেও তিনি সেনা ও পুলিশের বহরের সঙ্গে মিরপুর ১২ নম্বরের দিকে এগিয়ে যান।
মিরপুরের কালাপানি পানির ট্যাংকের কাছে তৎকালীন বিহারি ও পাকিস্তানি সৈন্যদের অতর্কিত হামলার মুখে পড়েন তারা। ওই হামলায় অনেক সেনাসদস্যের সঙ্গে জহির রায়হানও নিহত হন বলে জানা যায়। পরদিন ৩১ জানুয়ারি মিরপুর মুক্ত হলেও তার মরদেহ আর উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। পরিবারের ধারণা, রাতের অন্ধকারে তার মরদেহ গুম করা হয়। তবে তার মৃত্যুকে ঘিরে ভিন্ন দাবিও রয়েছে। জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক নির্মল সেন দাবি করেছিলেন, মুজিববাহিনীর হাতে নিহত হয়েছিলেন জহির রায়হান।
মাত্র ৩৬ বছরের জীবনে জহির রায়হান যে সাহিত্য ও চলচ্চিত্রভাণ্ডার রেখে গেছেন, তা আজও বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অমূল্য সম্পদ। তার সৃষ্টিতে যেমন ফুটে উঠেছে মানুষের জীবন, প্রেম ও সমাজবাস্তবতা, তেমনি প্রতিবাদ ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষাও পেয়েছে শক্তিশালী ভাষা। জন্মদিনে তাই নতুন করে স্মরণ করা হয় বাংলা চলচ্চিত্রের এই সাহসী নির্মাতা ও বহুমাত্রিক স্রষ্টাকে।
এসএ/টিএ