ডিটক্সের নতুন পদ্ধতি কফি এনিমা, কতটা ভয়ংকর এই ট্রেন্ড?
ছবি: সংগৃহীত
০৩:৫৯ পিএম | ২০ আগস্ট, ২০২৬
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্প্রতি সবচেয়ে বিতর্কিত ও আলোচিত স্বাস্থ্য ট্রেন্ডগুলোর একটি হয়ে উঠেছে ‘কফি এনিমা’। সাধারণ চিকিৎসা পদ্ধতিতে তীব্র কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে বা বিশেষ কোনো পরীক্ষার আগে পায়ুপথ দিয়ে তরল প্রবেশ করিয়ে অন্ত্র পরিষ্কারের প্রক্রিয়াকে ‘এনিমা’ বলা হয়। তবে বর্তমানে এই প্রক্রিয়ায় সাধারণ চিকিৎসাকাজে ব্যবহৃত তরলের পরিবর্তে ফুটিয়ে ঠান্ডা করা ব্ল্যাক কফি ব্যবহার করার প্রচলন দেখা যাচ্ছে, যা নিয়ে সামাজিক মাধ্যম ও চিকিৎসাঙ্গনে শুরু হয়েছে ব্যাপক তোলপাড়। TVNetworks & Stations
কীভাবে শুরু হলো এই ট্রেন্ড?
বাংলাদেশে বিষয়টির মূল সূত্রপাত ঘটে ডক্টর জাহাঙ্গীর কবিরসহ কয়েকজন বিকল্প স্বাস্থ্য পরামর্শক ও ওয়েলনেস ইনফ্লুয়েন্সারের ভিডিও বক্তব্যের পর। তাঁরা দাবি করেন, কফি এনিমা ‘ফাংশনাল মেডিসিন’-এর একটি কার্যকর অংশ। তাঁদের এই আলোচনার পর ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটকে কফি এনিমা সম্পর্কিত নানাবিধ ভিডিও ছড়াতে শুরু করে। ইন্টারনেটে প্রচার করা হচ্ছে যে, পায়ুপথ দিয়ে কফি প্রবেশ করালে তা সরাসরি লিভার ও বৃহদান্ত্রে পৌঁছে জমে থাকা বর্জ্য পরিষ্কার করে এবং শরীরকে অলৌকিক উপায়ে ‘ডিটক্স’ বা বিষমুক্ত করে।
একই সঙ্গে আইবিএস (IBS), দীর্ঘদিনের কোষ্ঠকাঠিন্য, গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা দূরীকরণ এবং দ্রুত ওজন কমানোর সহজ উপায় হিসেবেও এটিকে উপস্থাপন করা হচ্ছে। ফলে কৌতূহলবশত বহু মানুষ অনলাইনে কফি এনিমা কিট কিনে ঘরে বসেই এটি প্রয়োগের চেষ্টা শুরু করেছেন।
চিকিৎসাবিজ্ঞান ও বিশেষজ্ঞদের প্রতিক্রিয়া
সোশ্যাল মিডিয়ার এই ট্রেন্ডের বিপরীতে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পরিপাকতন্ত্র বিশেষজ্ঞ ও প্রথাগত চিকিৎসকেরা। দেশের শীর্ষস্থানীয় লিভার ও গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিশেষজ্ঞদের মতে, কফি এনিমা দিয়ে লিভার বা শরীর ডিটক্স করার কোনো বৈজ্ঞানিক বা ক্লিনিক্যাল সমর্থন আন্তর্জাতিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে নেই। মানবদেহের লিভার ও কিডনি প্রাকৃতিকভাবেই ২৪ ঘণ্টা শরীরকে বিষমুক্ত রাখার কাজ সম্পন্ন করে। ফলে কৃত্রিমভাবে মলদ্বারে কফি প্রবেশ করিয়ে ডিটক্সিফিকেশনের তথ্যটিকে অবৈজ্ঞানিক ও বিভ্রান্তিকর হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
মারাত্মক যেসব স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে কোনো চিকিৎসকের তত্ত্বাবধান ছাড়া ঘরে বসে এনিমা গ্রহণ করলে ভয়াবহ শারীরিক বিপর্যয় ঘটতে পারে:
অন্ত্রে ছিদ্র (Bowel Perforation): অনভিজ্ঞ হাতে এনিমা টিউব প্রবেশ করালে কোলনের দেয়াল ফেটে জীবনঘাতী অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ হতে পারে।
ইলেক্ট্রোলাইট ভারসাম্যহীনতা: অতিরিক্ত এনিমা ব্যবহারের ফলে শরীর থেকে সোডিয়াম ও পটাশিয়ামের মতো জরুরি খনিজ পদার্থ বের হয়ে গিয়ে হঠাৎ হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
ইনফেকশন ও পোড়া ক্ষত: কফির তাপমাত্রা সামান্য বেশি থাকলে বা উপাদান অস্বাস্থ্যকর হলে অভ্যন্তরীণ স্পর্শকাতর টিস্যু পুড়ে যাওয়া বা মারাত্মক ইনফেকশন হতে পারে।
উপকারী ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস: বৃহদান্ত্রের প্রাকৃতিক মাইক্রোবায়োম বা উপকারী জীবাণু ধ্বংস হয়ে হজমপ্রক্রিয়া স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কোনো ভাইরাল ভিডিও বা চমকপ্রদ দাবি দেখে বৈজ্ঞানিক ভিত্তিহীন চিকিৎসাপদ্ধতি নিজের ওপর প্রয়োগ করা মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। সুস্থ থাকার জন্য কোনো শর্টকাট উপায়ের ওপর নির্ভর না করে নিবন্ধিত অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই একমাত্র নিরাপদ পথ।
এসএন