প্রয়োজনে সংবিধান সংশোধন
ছবি: সংগৃহীত
১০:৩০ পিএম | ২৮ আগস্ট, ২০২৬
দ্বৈত নাগরিকদের সংসদ কিংবা মন্ত্রী পরিষদে যোগদান নিয়ে চলমান বিতর্কে অনেকেই আমাকে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন করেছেন।
কোনো দ্বৈত নাগরিক যদি দাবি করেন যে তিনি বিদেশি নাগরিকত্ব পরিত্যাগ করেছেন, তাহলে কেবল তার এই দাবিই কি সংসদ সদস্য বা মন্ত্রী হওয়ার জন্য যথেষ্ট? যদি যথেষ্ট না হয়, তাহলে বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের পক্ষে কী ধরনের প্রমাণ প্রয়োজন? নাগরিকত্ব পরিত্যাগের আবেদন জমা দিলেই কি ধরে নেওয়া যাবে যে তিনি আর ওই দেশের নাগরিক নন? যদি তা না হয়, তাহলে কোন পর্যায়ে গিয়ে আইনগতভাবে বলা যাবে যে তার বিদেশি নাগরিকত্বের অবসান ঘটেছে?
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এসেছে—‘Deemed Fact’ বা আইনগতভাবে কোনো বিষয়কে প্রমাণিত বা বিদ্যমান বলে ধরে নেওয়ার নীতি কি এক্ষেত্রে প্রযোজ্য? প্রমাণের অনুপস্থিতিতে একজন দ্বৈত নাগরিকের নিজস্ব দাবির ভিত্তিতে কি তাঁকে বিদেশি নাগরিকত্বমুক্ত বলে ‘deem’ করা যায়? সবশেষে কেউ কেউ জানতে চেয়েছেন, কোনো বিদেশি নাগরিককে সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া কিংবা তাকে মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ করার ক্ষেত্রে সরকার বা সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দল সংবিধান লঙ্ঘনের দায়ে পড়বে কি না।
উপরের প্রতিটি প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর আছে। বাংলাদেশের সংবিধান, সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধিবিধান এবং যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব আইনের আলোকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে এ সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট আইনগত অবস্থান তৈরি করা সম্ভব। চাইলে এ বিষয়ে আমি বিস্তারিত মতামতও প্রকাশ করতে পারি। কিন্তু আমার আইনগত ব্যাখ্যার সঙ্গে বিশিষ্টজনদের কারও কারও অফিসিয়াল মতের অমিল হতে পারে। এটাও মাথায় রাখতে হবে যে, ঐতিহাসিকভাবে সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের নামই এ ‘ঝামেলা’টির সাথে জড়িয়ে আছে। ফলে আমি জ্ঞান ফলাতে গেলে মূল সমস্যা আরও বিস্তৃত ও জটিল হবে। তাই আমি বিতর্ক বাড়াতে চাই না। তবে বিষয়টি যদি কখনো উচ্চ আদালতের বিবেচনায় আসে এবং সেখানে আমার অবদান রাখার সুযোগ সৃষ্টি হয়, তাহলে একজন আইনজীবী হিসেবে আমি অবশ্যই যথাসাধ্য অবদান রাখার চেষ্টা করব।
যাই হোক, আমার কাছে এই ঐতিহাসিক সমস্যার একটি সহজ ও স্থায়ী সমাধান আছে—সংবিধান সংশোধন করে দ্বৈত নাগরিকদের জন্য সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী হওয়ার পথ উন্মুক্ত করে দেওয়া।
সব রাজনৈতিক দল যদি ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধন করে দ্বৈত নাগরিকদের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেয়, তাহলে এ ধরনের বিতর্কের স্থায়ী অবসান ঘটতে পারে। এতে শুধু বর্তমান সংকটের সমাধানই হবে না; ভবিষ্যতেও একই ধরনের সাংবিধানিক জটিলতা এড়ানো সম্ভব হবে। সংবিধানে যা কিছুই লেখা থাকুক, প্র্যাক্টিক্যালি, দ্বৈত নাগরিকরা এ দেশে মন্ত্রী, এমপি, উপদেষ্টা, বিচারক, সমস্কারক সবই হয়েছেন। এতে কোনো কিছুই অশুদ্ধ হয়ে যায়নি। বরং আমরা দরকারে তাদের নামে শিন্নি বিলিয়েছি।
বিশ্বায়নের এই যুগে বহু বাংলাদেশি বিদেশে বসবাস করেন এবং বিদেশি নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। পাশাপাশি বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের গভীর সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও পারিবারিক সম্পর্কও বজায় রাখেন। তাদের অনেকের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, পেশাগত দক্ষতা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বাংলাদেশের জন্য মূল্যবান সম্পদ হতে পারে। তাই দ্বৈত নাগরিকত্বকে অযোগ্যতার প্রশ্ন হিসেবে না দেখে রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকেও বিবেচনা করা যেতে পারে।
গুটিকয়েক মানুষ অবশ্য প্রবাসী এবং দ্বৈত নাগরিকদের বিষয়ে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি লালন করে এবং অবশ্যই খোঁড়া যুক্তিতে। উত্তেজনা দেখাতে গিয়ে তারা ভুলে যায়, বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বৈদেশিক আয়ের উৎস হচ্ছে রেমিট্যান্স যা আসে প্রবাসীদের কাছ থেকে। এই রেমিট্যান্সের প্রবাহ অটুট রেখে জাতীয় অর্থনীতিকে সচল রাখতে যাদের অবদান অনস্বীকার্য, তাদেরকে দূরে সরিয়ে রেখে একটি সমৃদ্ধ ও টেকসই দেশ গঠন করা সম্ভব বলে আমি মনে করি না। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারেও প্রবাসীদের, বিশেষ করে দ্বৈত নাগরিকদের, ভূমিকা ছিলো অতুলনীয়। রেজিমের পতনের লক্ষ্যে রেমিট্যান্স বন্ধ করে দিয়ে ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিলো দেশপ্রেমিক প্রবাসীরা।
আমার বিশ্বাস, বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ সকল রাজনৈতিক দল নিজেদের প্রয়োজন ও জাতীয় স্বার্থ বিবেচনা করে এ ধরনের একটি সাংবিধানিক সংস্কারের উদ্যোগকে সমর্থন করবে। এতে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা দলের তাৎক্ষণিক সুবিধার চেয়ে বড় হয়ে উঠবে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও সুস্পষ্ট সাংবিধানিক কাঠামো।
বিতর্কের চেয়ে স্থায়ী সমাধান শ্রেয়। আর সেই সমাধানের প্রয়োজনে সংবিধান সংশোধনের পথেই হাঁটা উচিত। এই পদ্ধতি সহজ, লাভজনক ও হার্মলেস।
—ব্যারিস্টার আবু সায়েম