© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

নেপাল-তিব্বতে ভয়াবহ বন্যা-ভূমিধসনেপালে-তিব্বতে নিহত বেড়ে ৬৩৩, নিখোঁজ বেড়ে প্রায় ৩ হাজার

শেয়ার করুন:
নেপালে-তিব্বতে নিহত বেড়ে ৬৩৩, নিখোঁজ বেড়ে প্রায় ৩ হাজার

ছবি: সংগৃহীত

মোজো ডেস্ক
১১:০৯ এএম | ২৯ আগস্ট, ২০২৬
নেপাল ও তিব্বতের সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা ৬০০ ছাড়িয়েছে। হিমবাহ ধসে সৃষ্ট আকস্মিক পানির স্রোতে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ার পর সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা উদ্ধার অভিযান আবারও শুরু হয়েছে। তবে নতুন করে একটি হ্রদ সৃষ্টি হওয়ায় দ্বিতীয় দফায় বন্যার আশঙ্কা এখনো রয়েছে। 

শনিবার (২৯ আগস্ট) আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেপালে এ দুর্যোগে ৬২৬ জনের মৃত্যু এবং ১ হাজার ৯২৪ জন নিখোঁজ রয়েছেন।তিব্বতে মারা গেছেন আরও পাঁচজন, নিখোঁজ ৫৫৮ জন। সব মিলিয়ে দুই অঞ্চলে মৃত ৬৩১ জন এবং নিখোঁজ প্রায় আড়াই হাজার মানুষ। দুর্গম এলাকায় এখনো উদ্ধারকারী দল পৌঁছাতে না পারায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় নেপাল সরকার ভারত ও চীনের কাছে বিশেষজ্ঞ সহায়তা চেয়েছে। উদ্ধারকাজে সহায়তার জন্য দুই দেশ থেকে বিশেষজ্ঞ দল পাঠানো হচ্ছে। এসব দলে দুর্গম এলাকা ও সুড়ঙ্গে আটকে পড়া মানুষ উদ্ধারে দক্ষ সদস্যরাও থাকবেন। শনিবার তাদের নেপালে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।

এর আগে বিদেশি বড় আকারের উদ্ধারকারী দল পাঠানো নিয়ে কিছুটা অনাগ্রহ দেখিয়েছিল নেপাল সরকার। একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক উদ্ধারকর্মী বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে চলমান উদ্ধার কার্যক্রমে বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা ছিল। তবে পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে ওঠায় মানুষের জীবন রক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এখন আন্তর্জাতিক সহায়তা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

বুধবার সকালে হিমালয়ের প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতায় একটি হিমবাহের বড় অংশ ধসে পড়ে। প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার নিচে নেমে আসার সময় এর সঙ্গে বিপুল পরিমাণ পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষ মিশে যায়। পরে সেগুলো লেন্দে নদীতে আছড়ে পড়লে মুহূর্তের মধ্যে তৈরি হয় প্রবল পানির স্রোত।

এই স্রোত নেপালের রাসুয়া, নুওয়াকোট ও ধাদিং জেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে ত্রিশূলী নদীর পানির উচ্চতা প্রায় ৯ মিটার বেড়ে যায়। এতে বহু ঘরবাড়ি, সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বেশ কিছু এলাকা বাইরের দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

প্রথমদিকে দুর্যোগের পেছনে ভূমিকম্পকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে মনে করা হয়েছিল। তবে পরে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা জানায়, ভূমিকম্পের মতো যে কম্পন শনাক্ত হয়েছিল, সেটি আসলে হিমবাহ ধসের সময় সৃষ্ট ভূমিধস থেকেই তৈরি হয়েছিল।

এদিকে, হিমবাহ ধসের স্থানে নতুন একটি হ্রদ তৈরি হয়েছে। ধসের পর হ্রদটির পানি দ্রুত বাড়তে থাকায় সেটির প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে দ্বিতীয় দফায় আকস্মিক বন্যা হতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়। এ কারণে কিছু সময়ের জন্য উদ্ধার অভিযান বন্ধ রাখা হয়েছিল। পরে ঝুঁকি পর্যালোচনা করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণযোগ্য মনে হওয়ায় আবারও উদ্ধারকাজ শুরু করা হয়েছে।

তবে হিমবাহ ও জলাধার বিশেষজ্ঞরা এখনো ঝুঁকি পুরোপুরি কেটে গেছে বলে মনে করছেন না। কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের হিমবাহজনিত দুর্যোগ বিশেষজ্ঞ আলটন বায়ার্স জানিয়েছেন, নতুন তৈরি হওয়া হ্রদের পানি যে প্রাকৃতিক বাঁধের পেছনে আটকে আছে, সেটি অত্যন্ত অস্থিতিশীল। সেখানে জমে থাকা আলগা পাথর ও ধ্বংসাবশেষ দিয়েই বাঁধটি তৈরি হওয়ায় এটি যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হ্রদের পানি ধীরে ধীরে স্বাভাবিকভাবে বেরিয়ে যাওয়া সবচেয়ে নিরাপদ পরিস্থিতি। প্রয়োজনে চীনা উদ্ধারকারী ও প্রকৌশলীরা বিভিন্ন হাতে-চালিত পদ্ধতি ব্যবহার করে হ্রদের পানি নিয়ন্ত্রিতভাবে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। এর আগে হিমবাহের হ্রদ ভেঙে বন্যাপ্রবণ বিভিন্ন অঞ্চলে এমন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে।

দুর্যোগ পরিস্থিতি পরিদর্শনে বৃহস্পতিবার তিব্বতের গিরং এলাকায় যান চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং। একই সময়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং উদ্ধার তৎপরতা নিয়ে বৈঠক করেন। তিনি হিমবাহের হ্রদগুলোর ওপর নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি বৈজ্ঞানিকভাবে উদ্ধার ও ত্রাণ পরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দেন।

নেপালের এই ভয়াবহ দুর্যোগে ইতোমধ্যে ভারত, জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক রেডক্রস ফেডারেশন, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা সহায়তা নিয়ে এগিয়ে এসেছে।

তবে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে যোগাযোগব্যবস্থা। কাদা, ভূমিধস ও বন্যার পানিতে বহু সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দুর্গত অনেক এলাকায় এখনো উদ্ধারকারী দল পৌঁছাতে পারেনি। ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে আটকে থাকা মানুষের প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে পুরোপুরি জানা সম্ভব হচ্ছে না। উদ্ধার অভিযান যত এগোবে, হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

এমআর/টিএ  




মন্তব্য করুন