© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

কানের শব্দের নেপথ্যে রক্তনালির জটিলতা: কাটাছেঁড়া ছাড়াই চিকিৎসায় সাফল্য

শেয়ার করুন:
কানের শব্দের নেপথ্যে রক্তনালির জটিলতা: কাটাছেঁড়া ছাড়াই চিকিৎসায় সাফল্য

ছবি: সংগৃহীত

মোজো ডেস্ক
০১:৪৯ পিএম | ০১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
হৃদস্পন্দনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কানে শোঁ শোঁ শব্দ। দিনের পর দিন সেই শব্দে অতিষ্ঠ ছিলেন গাইবান্ধার রবিউল ইসলাম। রাতে ঘুমাতে পারতেন না, ব্যাহত হচ্ছিল স্বাভাবিক কাজকর্মও। বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষায় খরচ হয়েছে কয়েক লাখ টাকা। তবু সমস্যার সমাধান হয়নি। একপর্যায়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন তিনি।

শেষ পর্যন্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষায় জানা যায়, রবিউলের কানের শব্দের কারণ কানে নয়, মস্তিষ্কের রক্তনালির একটি অংশ ভেনাস সাইনাসে সংকোচন বা ব্লক। নিউরোইন্টারভেনশন বিশেষজ্ঞ ও ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হুমায়ুন কবীর হিমু ক্যাথেটারের মাধ্যমে ওই রক্তনালিতে স্টেন্ট বসিয়ে সংকুচিত অংশ খুলে দেন। বড় ধরনের কাটাছেঁড়া ছাড়াই করা এ চিকিৎসার পরই কানের শব্দ বন্ধ হয়ে যায় রবিউলের।

চিকিৎসকেরা বলছেন, পালসেটাইল টিনিটাস নামের এ সমস্যায় রোগী সাধারণত হৃদস্পন্দনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কানে শোঁ শোঁ, ভোঁ ভোঁ বা ধুপধাপ শব্দ শুনতে পান। এর অনেক কারণ কানের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও কিছু ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের রক্তনালির অস্বাভাবিকতার কারণেও এমন হতে পারে। এসব কারণ অনেক সময় শনাক্ত না হওয়ায় রোগীরা বছরের পর বছর এক চিকিৎসকের কাছ থেকে অন্য চিকিৎসকের কাছে ঘুরতে থাকেন।

ডা. হুমায়ুন কবীর হিমু বলেন, পালসেটাইল টিনিটাসের অনেক কারণ রয়েছে। এর বেশিরভাগই কানের সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে মস্তিষ্কের রক্তনালির সমস্যাজনিত কারণ নিয়ে তুলনামূলকভাবে কম আলোচনা হয়। ফলে এ ধরনের রোগীরা দীর্ঘদিন সঠিক রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হন।

তিনি বলেন, কানে শোঁ শোঁ, ভোঁ ভোঁ বা অস্বস্তিকর শব্দ যদি হৃদস্পন্দনের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়, অথবা গলার কাছে রক্তনালিতে চাপ প্রয়োগ করলে কানের শব্দ বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে পালসেটাইল টিনিটাসের সন্দেহ করা হয়। মস্তিষ্কের রক্তনালির সমস্যা সন্দেহ হলে এনজিওগ্রাম বা ডিএসএ (ডিজিটাল সাবট্রাকশন অ্যাঞ্জিওগ্রাফি) করে কারণ শনাক্ত করা যায়। এরপর রোগের ধরন অনুযায়ী চিকিৎসা পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়।

স্টেন্ট বসিয়ে খুলে দেওয়া হলো ব্লক

পালসেটাইল টিনিটাসের গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণ ভেনাস সাইনাস স্টেনোসিস বা সংকোচন। ডা. হিমু বলেন, ভেনাস সাইনাসে ব্লক বা সংকোচন হলে রক্তপ্রবাহে বাধা তৈরি হয়। এতে চাপের পরিবর্তনের কারণে কানে স্পন্দনশীল শব্দ হতে পারে। সংকুচিত অংশে স্টেন্ট বসিয়ে রক্তনালি খুলে দেওয়া হলে চাপ কমে যায় এবং অনেক ক্ষেত্রে কানের শব্দও বন্ধ হয়ে যায়।

রবিউলের চিকিৎসা সম্পর্কে ডা. হিমু বলেন, দীর্ঘদিন পালসেটাইল টিনিটাসে ভুগছিলেন তিনি। ডিএসএ করার পর তার ভেনাস সাইনাসে ব্লক শনাক্ত হয়। পরে ক্যাথেটারের মাধ্যমে রক্তনালিতে স্টেন্ট বসিয়ে সংকুচিত অংশটি খুলে দেওয়া হয়। স্টেন্ট বসানোর পরপরই তাঁর কানের শোঁ শোঁ শব্দ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।

দেশে নতুন সম্ভাবনা

ডা. হুমায়ুন কবীর হিমু বলেন, বিদেশে নিউরোইন্টারভেনশনের ওপর উচ্চতর প্রশিক্ষণ নেওয়ার সময় পালসেটাইল টিনিটাসের এ ধরনের চিকিৎসা দেখেছেন। তখন থেকেই দেশে এ চিকিৎসা নিয়ে কাজ করার আগ্রহ তৈরি হয়। প্রায় দেড় বছর আগে রবিউল তার কাছে আসেন। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তার চিকিৎসার পরিকল্পনা করা হয়।

তিনি বলেন, এর আগে অন্য এক রোগীর ভেনাস সাইনাসে স্টেন্টিং করার মাধ্যমে এ ধরনের চিকিৎসায় অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। পরে রবিউলের ক্ষেত্রেও একই পদ্ধতি প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। চিকিৎসার আগে তার মেন্টর ডা. শিরাজী শাফিকুল ইসলামের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন এবং তার পরামর্শ ও সহযোগিতায় চিকিৎসাটি সম্পন্ন করেন।

ডা. হিমুর দাবি, দেশে পালসেটাইল টিনিটাসের চিকিৎসায় ভেনাস সাইনাস স্টেন্টিংয়ের এমন প্রয়োগ আগে হয়নি। সফলভাবে চিকিৎসা সম্পন্ন হওয়ায় তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন।

‘কানে আর কোনো শব্দ নেই’

রবিউল ইসলাম বলেন, ‘কানের শোঁ শোঁ শব্দের কারণে আমি ঘুমাতে পারতাম না। কোনো কাজ ঠিকভাবে করতে পারতাম না। বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা করিয়েও কোনো ফল পাইনি। একপর্যায়ে মানসিকভাবে খুব ভেঙে পড়েছিলাম।’

তিনি জানান, গত রোববার ছোট একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মস্তিষ্কের রক্তনালিতে স্টেন্ট বসানো হয়েছে। এরপর থেকেই কানের শব্দ আর নেই। এখন তিনি স্বাভাবিক আছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হৃদস্পন্দনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিয়মিত কানে শব্দ শোনা গেলে সেটিকে সাধারণ টিনিটাস ভেবে দীর্ঘদিন ফেলে রাখা ঠিক নয়। বিশেষ করে শব্দটি যদি নাড়ির স্পন্দনের সঙ্গে ওঠানামা করে, তাহলে রক্তনালিজনিত কারণ খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

বাংলাদেশে নিউরোইন্টারভেনশনের পরিধি ক্রমেই বাড়ছে। পালসেটাইল টিনিটাসের মতো ভাসকুলার সমস্যায় ক্যাথেটারভিত্তিক চিকিৎসার এ সাফল্য দেশে আধুনিক মস্তিষ্ক ও রক্তনালির চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলছে।

কেএন/টিএ

মন্তব্য করুন