© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

আইনের ফাঁকে আটকে রাখা যায় না মাদক কারবারি ও ছিনতাইকারীদের : আইজিপি

শেয়ার করুন:
আইনের ফাঁকে আটকে রাখা যায় না মাদক কারবারি ও ছিনতাইকারীদের : আইজিপি

ছবি: সংগৃহীত

মোজো ডেস্ক
১০:৫৯ এএম | ০৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
আইনের ফাঁকফোকরের কারণে মাদক কারবারি ও ছিনতাইকারীদের অনেক সময় দীর্ঘদিন কারাগারে রাখা সম্ভব হয় না বলে মন্তব্য করেছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ও কমিউনিটি ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির চেয়ারম্যান মো. আলী হোসেন ফকির।

তিনি বলেন, মাদক ও ছিনতাইয়ের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে অনেক অপরাধীকে একাধিকবার আইনের আওতায় আনা হলেও আইনের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে তাদের দীর্ঘদিন আটক রাখা যায় না। পরে তারা আবারও একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।

শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) সকালে রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে কমিউনিটি ব্যাংকের উদ্যোগে আয়োজিত ‘আমার শহর, আমার দেশ-পরিচ্ছন্নতায় বদলে যায় বাংলাদেশ’ অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন আইজিপি।

আইজিপি বলেন, আমরা মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছি। প্রত্যেক মাদক কারবারি ও প্রত্যেক ছিনতাইকারী একাধিকবার আইনের আওতায় এসেছে। কিন্তু আইনের ফাঁকফোকরের কারণে তাদের ওইভাবে আটকে রাখতে পারিনি। তারা আবার বের হয়ে একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।

মাদক ও ছিনতাই প্রতিরোধে পুলিশের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। আইজিপি বলেন, দেশের জনসংখ্যার তুলনায় পুলিশের সংখ্যা খুবই কম। প্রায় এক হাজার মানুষের জন্য মাত্র একজন পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করেন। তাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে হবে।

তিনি বলেন, মাদক আমাদের নতুন প্রজন্মকে ধ্বংস করছে। ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক নানা নামে তরুণদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। অনেক সময় এগুলোকে এনার্জি ট্যাবলেট বা অন্য কোনো আকর্ষণীয় নামে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। আমাদের সন্তানদের এ বিষয়ে সচেতন করতে হবে।

মাদকাসক্তির ভয়াবহতা তুলে ধরে আইজিপি বলেন, একজন সন্তান মাদকে জড়িয়ে পড়লে শুধু তার নিজের জীবনই নষ্ট হয় না, পুরো পরিবারকে এর খেসারত দিতে হয়। পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করার সময় এমন ঘটনাও দেখেছি, যেখানে মাদকের টাকা না দেওয়ায় সন্তান নিজের বাবাকেই মারধর করে আহত করেছে।


মো. আলী হোসেন ফকির আরও বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি পুলিশকে জনবান্ধব ও জনগণমুখী পুলিশিং করতে হবে। তবে পুলিশকে কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালন করতে হলে জনগণের সহযোগিতা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, আমাদের পুলিশিং হবে পিপল ওরিয়েন্টেড। জনগণের প্রতি আমরা জনবান্ধব হবো। কিন্তু জনগণের সহযোগিতা ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা কঠিন। পুলিশ যদি কাজ করতে না পারে, তাহলে সমাজে কী ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়, তা আমরা দেখেছি।

অনুষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশ রক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে আইজিপি বলেন, শুধু লোক দেখানো বা প্রচারের জন্য নয়, বাস্তবে পরিবর্তন আনার লক্ষ্যেই এ ধরনের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। ঢাকা শহরের পরিবেশ দূষণ কমাতে বেশি করে গাছ লাগানো ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের শুধু পুঁথিগত শিক্ষায় সীমাবদ্ধ না রেখে পরিবেশ সংরক্ষণ, পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রমে যুক্ত করতে হবে। নতুন প্রজন্মকে দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে এ ধরনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সড়কে চলাচলের নিয়মকানুন সম্পর্কে সচেতনতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে আইজিপি বলেন, বিদেশে ছোটবেলা থেকেই শিশুদের রাস্তা পারাপার ও সড়ক ব্যবহারের নিয়ম শেখানো হয়। বাংলাদেশেও শিক্ষার্থীদের ছোটবেলা থেকে এসব বিষয়ে সচেতন করতে হবে।

‘আমার শহর, আমার দেশ-পরিচ্ছন্নতায় বদলে যায় বাংলাদেশ’ কর্মসূচিকে সরকারের পরিকল্পনার অংশ উল্লেখ করে আইজিপি বলেন, সামাজিক দায়িত্ববোধ থেকেই কমিউনিটি ব্যাংকের উদ্যোগে এ কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। ভবিষ্যতেও পুলিশ ও সাধারণ মানুষ একসঙ্গে কাজ করলে পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমেদ বলেন, আজ ৫ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাংলাদেশ পুলিশ, ঢাকা শহর ও ঢাকা সিটি করপোরেশনের জন্য একটি মাইলফলক। এই কর্মসূচির মাধ্যমে শুধু গাছ লাগানো নয়, বরং পুরো ঢাকা শহরে একটি সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন শুরু করা হয়েছে।

তিনি বলেন, কমিউনিটি পুলিশ ও কমিউনিটি ব্যাংকের উদ্যোগে আজকের যে ক্যাম্পেইনটি শুরু হলো, আমি বিশ্বাস করি এই ক্যাম্পেইনটি ঢাকা শহরের প্রত্যেকটি আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়বে।

বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মাধ্যমে জনগণকে সচেতন করার পাশাপাশি ঢাকা শহরের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করার উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়িত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন ডিএমপি কমিশনার। তিনি বলেন, এই উদ্যোগের জন্য কমিউনিটি ব্যাংক বাংলাদেশ, বাংলাদেশ পুলিশ এবং ঢাকা সিটি করপোরেশনকে অন্তর থেকে কৃতজ্ঞতা জানাই এত সুন্দর একটি মহৎ উদ্যোগ গ্রহণ করার জন্য।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম বলেন, পরিবেশ ভালো রাখতে হলে পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি সবুজায়নের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানের প্রধানরা কোনো বিষয়ে গুরুত্ব দিলে সেটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব। একইভাবে নগরবাসীও যদি ঢাকাকে নিজের শহর মনে করে ভালোবাসে, তাহলে শহরের পরিবর্তনও সম্ভব।

তিনি বলেন, ঢাকাকে বদলাতে হলে আগে আমাদের নিজেদের বদলাতে হবে। আমি যদি অন্তর দিয়ে ঢাকাকে ভালোবাসি, তাহলে আমার ঘরের মতো শহরকেও পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি রাখার চেষ্টা করব। এই দেশটা আমার, এই শহরটা আমার-আমি যদি না বদলাই, তাহলে শহর বদলাবে না।

প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় এখনই উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে মো. আব্দুস সালাম বলেন, পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার কারণে সারা পৃথিবীতেই প্রকৃতি বিরূপ হয়ে উঠছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিরাপদ রাখতে প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষায় সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

তিনি বলেন, দেশ ও প্রকৃতিকে রক্ষা করতে হলে গাছ লাগানোর কোনো বিকল্প নেই। কার্বন ডাই-অক্সাইডের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে বাঁচতে এবং অক্সিজেন পেতে হলে গাছ লাগাতেই হবে।

ঢাকার বায়ুদূষণ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে আব্দুস সালাম বলেন, বিশ্বের দূষিত শহরগুলোর তালিকায় ঢাকা প্রায়ই ওপরের দিকে থাকে, যা কোনোভাবেই সুখকর নয়। তাই নগরবাসীকে যেখানে-সেখানে ময়লা না ফেলার পাশাপাশি নিজেদের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্ব নিতে হবে।

তিনি বলেন, আমরা যদি প্রত্যেকে সিদ্ধান্ত নিই যে কোথাও আবর্জনা ফেলব না, ফেলতে দেব না এবং প্রত্যেকে অন্তত একটি করে গাছ লাগাব, তাহলে পরিবর্তন আসবেই।

নগরবাসীর মধ্যে ঢাকার প্রতি মমত্ববোধ ও ভালোবাসা তৈরি করতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন প্রশাসক। তিনি জানান, স্কুলশিক্ষার্থীদের ঢাকার ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরিয়ে দেখানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম ঢাকার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও পরিবর্তন সম্পর্কে জানতে পারবে এবং শহরের প্রতি তাদের দায়িত্ববোধ ও ভালোবাসা বাড়বে।

তিনি বলেন, আমাদের বাচ্চাদের দেখাতে হবে ঢাকা আগে কেমন ছিল, এখন কেমন আছে। তাদের ঐতিহাসিক স্থানগুলো দেখাতে হবে। এর মধ্য দিয়ে ঢাকার প্রতি একটা মমত্ববোধ, দরদ ও ভালোবাসা জন্মাবে।

নগর ব্যবস্থাপনায় পুলিশের সহযোগিতার গুরুত্ব তুলে ধরে আব্দুস সালাম বলেন, ঢাকা শহরের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে পুলিশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। পুলিশকে সহযোগিতা করা সবার দায়িত্ব।

তিনি বলেন, রাষ্ট্রের একটি অঙ্গ হিসেবে পুলিশ আমাদের স্বার্থেই কাজ করছে। তাদের সহযোগিতা করতে হবে এবং তাদের কাছ থেকেও সহযোগিতা নিতে হবে। পুলিশ ও সিটি করপোরেশন একসঙ্গে কাজ করলে নগরকে আরও সুন্দর করা সম্ভব।

নতুন প্রজন্মকে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শিশু-কিশোরদের শুধু পড়াশোনায় সীমাবদ্ধ না রেখে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, বিতর্কসহ বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রমে যুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি তাদের দেশের বিভিন্ন জায়গা ও ইতিহাসের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, নতুন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপরই এই দেশ নির্ভর করে। তাদের সঠিকভাবে গড়ে তুলতে পারলে আমরা সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব।

অনুষ্ঠান শেষে ভিকারুন্নেসা নুন স্কুল অ্যান্ড কলেজে একটি নিম গাছ রোপণ করেন পুলিশের মহাপরিদর্শক ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক। এ সময় কমিউনিটি ব্যাংকের এমডি পরিচালক ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। 

কেএন/এসএন

মন্তব্য করুন