© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

কলকাতায় হোটেল বন্ধ, চিকিৎসা নিতে গিয়ে বিপাকে বাংলাদেশিরা

শেয়ার করুন:
কলকাতায় হোটেল বন্ধ, চিকিৎসা নিতে গিয়ে বিপাকে বাংলাদেশিরা

ছবি: সংগৃহীত

মোজো ডেস্ক
১১:০৮ এএম | ০৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
চিকিৎসার জন্য কলকাতায় এসে হাসপাতাল খোঁজার পাশাপাশি এখন বাংলাদেশি রোগী ও স্বজনদের বড় দুশ্চিন্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে—থাকবেন কোথায়?

একদিকে রোগীর চিকিৎসা, অন্যদিকে থাকার জন্য নিরাপদ ও সাশ্রয়ী জায়গা খোঁজা। কলকাতার বিভিন্ন এলাকায় হোটেল ও গেস্টহাউস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এমন পরিস্থিতিতে পড়ছেন বাংলাদেশ থেকে চিকিৎসা নিতে আসা অনেকে। আগে যে এলাকায় তুলনামূলক কম খরচে থাকা যেত, সেখানকার বহু আবাসন বন্ধ থাকায় রোগী ও স্বজনদের যেতে হচ্ছে দূরের এলাকায়। এতে বাড়ছে যাতায়াত ও আবাসন খরচ।

কেউ বেশি টাকা দিয়ে হোটেল নিচ্ছেন, কেউ হাসপাতাল থেকে অনেক দূরে থাকছেন। আবার থাকার জায়গা না পেয়ে ফুটপাত বা সড়কের পাশে রাত কাটানোর ঘটনাও ঘটছে বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষ চিকিৎসার জন্য কলকাতায় যান। বিশেষ করে নিউ মার্কেট, মারকুইস স্ট্রিট, ফ্রি স্কুল স্ট্রিটসহ আশপাশের এলাকায় কম খরচের হোটেল ও গেস্টহাউস থাকায় রোগী ও স্বজনদের কাছে এসব এলাকা জনপ্রিয় ছিল।


কিন্তু গত ১৯ আগস্ট মির্জা গালিব স্ট্রিটের শিখা ইন হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর পরিস্থিতি বদলে যায়। ওই ঘটনায় ৯ জনের মৃত্যু হয়, যাদের মধ্যে সাতজন বাংলাদেশি।

অগ্নিকাণ্ডের পর কলকাতা পুরসভা, ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ শহরের বিভিন্ন হোটেল-গেস্টহাউসে পরিদর্শন ও অভিযান চালায়। নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে শোকজ করা হয়। এরপর নিউ মার্কেট ও আশপাশের এলাকায় অনেক বাজেট হোটেল ও গেস্টহাউস বন্ধ হয়ে যায়।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সব মিলিয়ে শতাধিক হোটেল ও গেস্টহাউস বন্ধ হয়েছে।

হোটেল বন্ধের সবচেয়ে বড় ধাক্কা সামলাতে হচ্ছে রোগী ও তাদের স্বজনদের।

একজন রোগীকে নিয়ে কলকাতায় আসা পরিবারের জন্য হাসপাতালের কাছাকাছি থাকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত চিকিৎসা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা কিংবা অস্ত্রোপচারের পর রোগীকে হাসপাতালে নেওয়া-আনা করতে হয়। কিন্তু হাসপাতালের আশপাশে সাশ্রয়ী আবাসন না থাকায় অনেককেই দূরের এলাকায় যেতে হচ্ছে।

ফলে চিকিৎসার খরচের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে অতিরিক্ত হোটেল ভাড়া, যাতায়াত ব্যয় ও সময়। গুরুতর অসুস্থ রোগী কিংবা বয়স্কদের ক্ষেত্রে ভোগান্তি আরও বেশি।

বাংলাদেশি রোগীদের একটি অংশ কম খরচের আবাসন খুঁজে থাকেন। সেই সুযোগ কমে যাওয়ায় কেউ বেশি দামে অপেক্ষাকৃত ভালো হোটেলে উঠছেন, আবার কেউ হাসপাতাল থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছেন।

পরিস্থিতির মধ্যে কলকাতার বাংলাদেশ ডেপুটি হাইকমিশনও সতর্কতা জারি করেছে। বাংলাদেশিদের ভ্রমণের আগে আইনগতভাবে অনুমোদিত ও নিরাপদ হোটেলে কক্ষ নিশ্চিত করে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

অর্থাৎ, চিকিৎসার জন্য কলকাতায় যাওয়ার আগে এখন শুধু হাসপাতাল বা চিকিৎসকের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়; থাকার জায়গাটিও আগেই নিশ্চিত করতে হচ্ছে।

এদিকে, হোটেল সংকটের প্রভাব পড়েছে কলকাতার হাসপাতালগুলোর ওপরও। বাংলাদেশি রোগীর সংখ্যা কমে যাওয়ায় কয়েকটি হাসপাতাল সরাসরি বাংলাদেশে গিয়ে রোগীদের সঙ্গে যোগাযোগের উদ্যোগ নিয়েছে।

নিউ আলিপুরের বিপি পোদ্দার হাসপাতাল বাংলাদেশে প্রতিনিধি দল পাঠানোর পরিকল্পনা করেছে। একই সঙ্গে হাসপাতালের কাছেই নিজস্ব আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

হাসপাতালটির গ্রুপ অ্যাডভাইজার সুপ্রিয়া চক্রবর্তী জানান, বাংলাদেশি রোগীদের জন্য নিরাপদ ও সংগঠিত আবাসনের ব্যবস্থা করা এখন গুরুত্বপূর্ণ।

উডল্যান্ডস মাল্টিস্পেশালিটি হাসপাতালও বাংলাদেশে প্রতিনিধি দল পাঠানোর পরিকল্পনা করছে। রোগী ও স্বজনদের থাকার সুবিধার জন্য আলিপুর এলাকার কয়েকটি গেস্টহাউস ও হোটেলের সঙ্গে সমঝোতা করেছে হাসপাতালটি।

হাসপাতালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং অ্যাসোসিয়েশন অব হসপিটালস অব ইস্টার্ন ইন্ডিয়ার সভাপতি রূপক বড়ুয়া জানান, নিরাপদ আবাসনের বিষয়ে রোগীদের সচেতন করা হচ্ছে এবং তাদের অনুমোদিত হোটেলের তালিকাও দেওয়া হবে।

এদিকে কসবার রুবি জেনারেল হাসপাতাল বাংলাদেশি রোগীদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য বিশেষ ডেস্ক চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। প্রয়োজন হলে রোগীদের জন্য নিরাপদ আবাসনের তথ্য দেওয়া এবং আগাম কক্ষ বুকিংয়েও সহায়তা করা হবে বলে জানিয়েছে হাসপাতালটি।

কলকাতার হাসপাতালগুলোর এই উদ্যোগ থেকেই বোঝা যায়, হোটেল বন্ধের প্রভাব শুধু রোগী ও স্বজনদের ভোগান্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর প্রভাব পড়ছে শহরের চিকিৎসা পর্যটনেও।

বাংলাদেশি রোগীদের একটি বড় অংশ সড়কপথে কলকাতায় যান এবং চিকিৎসার পাশাপাশি কম খরচে থাকার ব্যবস্থা খোঁজেন। সাশ্রয়ী হোটেল-গেস্টহাউস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাদের ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। নিরাপত্তা ও আবাসন নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে অনেকে চিকিৎসার জন্য কলকাতায় যাওয়ার সিদ্ধান্তও পিছিয়ে দিতে পারেন।

ফলে এখন কলকাতার হাসপাতালগুলোর সামনে শুধু ভালো চিকিৎসাসেবা দেওয়ার চ্যালেঞ্জ নয়; রোগী ও স্বজনদের জন্য নিরাপদ, সাশ্রয়ী এবং হাসপাতালের কাছাকাছি আবাসনের ব্যবস্থা করাও জরুরি হয়ে উঠেছে।

কারণ চিকিৎসার জন্য একজন রোগী কলকাতায় গেলেও তার সঙ্গে থাকেন পরিবারের সদস্যরা। হাসপাতালের বিছানায় রোগীর চিকিৎসা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, হাসপাতালের বাইরে স্বজনদের মাথা গোঁজার নিরাপদ জায়গাটিও ততটাই জরুরি।

হোটেলের দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার সেই সংকটই এখন বাংলাদেশি রোগীদের চিকিৎসাযাত্রাকে আরও কঠিন করে তুলছে।

এসএন 

মন্তব্য করুন