© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

মিডিয়া ট্রায়াল করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ব্যর্থতা আড়াল করছেন!

শেয়ার করুন:
মিডিয়া ট্রায়াল করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ব্যর্থতা আড়াল করছেন!

অধ্যাপক ডা. এ কে এম মহিউদ্দিন ভূঁইয়া মাসুম

অধ্যাপক ডা. এ কে এম মহিউদ্দিন ভূঁইয়া মাসুম
০৪:১৩ পিএম | ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
মিডিয়ার সামনে একজন চিকিৎসককে ডেকে বলা হলো—
“ডাক্তার কই? আসেন ডাক্তার সাহেব! আসেন! কথাগুলো শুনে লজ্জিত হন না?”

রোগীর কষ্ট দেখে ক্ষোভ হওয়া স্বাভাবিক। হাসপাতালের সেবা ব্যাহত হলে জনগণের প্রশ্ন করার অধিকার আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—একটি হাসপাতালের বহুস্তরীয় প্রশাসনিক ও সরবরাহব্যবস্থার ব্যর্থতার দায় কি একজন ওয়ার্ড চিকিৎসকের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া যায়?

ক্যামেরার সামনে চিকিৎসককে অপমান করা খুব সহজ। কিন্তু যে ভাঙা ব্যবস্থার মধ্যে দাঁড়িয়ে তিনি রোগীর জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করছেন, সেই ব্যবস্থার দায়ীদের শনাক্ত করা কঠিন। আর সেই কঠিন কাজটিই এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে।

হাসপাতালের প্যাথলজি ও বায়োকেমিস্ট্রি সেবা চালু রাখা কি রোগী দেখার দায়িত্বে থাকা চিকিৎসকের কাজ?

তাহলে প্যাথলজি বিভাগ, হাসপাতাল প্রশাসন, ক্রয় বিভাগ, স্টোর, সরবরাহব্যবস্থা, যন্ত্র রক্ষণাবেক্ষণ শাখা এবং তদারকির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা কেন আছেন?

একজন চিকিৎসকের কাজ রোগী পরীক্ষা করা, রোগ নির্ণয় করা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নির্ধারণ করা এবং জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা দেওয়া। তিনি কি রোগী দেখা বন্ধ করে বিকারক কেনার দরপত্র খুঁজবেন? পরীক্ষাগারের মেশিন মেরামত করবেন? জনবল নিয়োগ দেবেন? নাকি সরবরাহ বন্ধ রেখে লাভবান হওয়া চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান চালাবেন?

একজন সংকটাপন্ন রোগীর জরুরি রক্তের লবণ পরীক্ষা প্রয়োজন। রক্তে সোডিয়াম বা পটাশিয়ামের অস্বাভাবিকতা অনেক সময় খিঁচুনি, অজ্ঞানতা, প্রাণঘাতী হৃদ্‌স্পন্দনের অনিয়ম, এমনকি হঠাৎ মৃত্যু পর্যন্ত ঘটাতে পারে। কিডনি বিকলতা, হৃদ্‌যন্ত্রের দুর্বলতা, তীব্র ডায়রিয়া ও পানিশূন্যতা, ডায়াবেটিসের জটিলতা, গুরুতর সংক্রমণ কিংবা নিবিড় পরিচর্যার রোগীর ক্ষেত্রে এ পরীক্ষা অত্যন্ত জরুরি।

হাসপাতালে পরীক্ষা হচ্ছে না। চিকিৎসক কী করবেন?

তিনি কি বলবেন—“লজ্জা পেতে বলা হয়েছে, তাই সোডিয়াম-পটাশিয়াম না জেনেই চিকিৎসা শুরু করছি”?

না। একজন দায়িত্বশীল চিকিৎসক রোগীর প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করাবেন—হাসপাতালের বাইরে হলেও। কারণ তাঁর প্রথম দায়িত্ব রোগীর নিরাপত্তা। রোগীকে অন্ধকারে রেখে অনুমাননির্ভর চিকিৎসা করা কোনো দায়িত্বশীলতা নয়।

তাই প্রশ্ন হওয়া উচিত ছিল চিকিৎসককে কেন বাইরে পরীক্ষা লিখতে হলো—সেটি নয়। প্রশ্ন হওয়া উচিত ছিল—

* রক্তের লবণ পরীক্ষার মতো মৌলিক পরীক্ষা কেন বন্ধ?
* কত দিন ধরে বিকারক সরবরাহ নেই?
* চাহিদাপত্র কি সময়মতো পাঠানো হয়েছিল?
* বরাদ্দ ছিল কি না?
* ক্রয়প্রক্রিয়া কোথায় আটকে আছে?
* দায়িত্বপ্রাপ্ত সরবরাহকারী কেন বিকারক দেয়নি?
* মেশিন নষ্ট থাকলে তা মেরামত হলো না কেন?
* পর্যাপ্ত পরীক্ষাগার প্রযুক্তিবিদ ও সহকারী আছেন কি না?
* হাসপাতাল প্রশাসন এ বিষয়ে কী পদক্ষেপ নিয়েছে?
* এই অচলাবস্থার কারণে রোগীদের অতিরিক্ত খরচ, চিকিৎসা বিলম্ব ও স্বাস্থ্যঝুঁকির দায় কে নেবে?

এসব প্রশ্নের উত্তর না খুঁজে একজন চিকিৎসককে প্রকাশ্যে লজ্জা দেওয়া আসলে সমস্যার সমাধান নয়; এটি সমস্যাকে আড়াল করা।

হাসপাতালের প্যাথলজি সেবা কোনো বিলাসিতা নয়। এটি রোগ নির্ণয় ও নিরাপদ চিকিৎসার অপরিহার্য অংশ। পরীক্ষার ফল ছাড়া বহু জরুরি চিকিৎসা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায়। একটি সরকারি হাসপাতালের পরীক্ষাগার সচল রাখতে প্রয়োজন নিয়মিত বিকারক সরবরাহ, প্রশিক্ষিত জনবল, কার্যকর যন্ত্র, রক্ষণাবেক্ষণ, মাননিয়ন্ত্রণ, সঠিক স্টোর ব্যবস্থাপনা এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসন।

এসবের ব্যর্থতা চিকিৎসকের ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়। এটি প্রতিষ্ঠানগত ব্যর্থতা।

চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে জনরোষ তৈরি করা বন্ধ করতে হবে। চিকিৎসক কোনো জাদুকর নন যে, বিকারক নেই, যন্ত্র অচল, জনবল নেই, বেড নেই—তবু সব সমস্যার সমাধান করে দেবেন। তাঁরা সীমিত সামর্থ্য ও অসম্ভব চাপের মধ্যেও প্রতিদিন রোগীর পাশে থাকেন। অনেক সময় নিজেদের অপমান, ক্লান্তি ও নিরাপত্তাহীনতা উপেক্ষা করেই সেবা দিয়ে যান।

যাঁরা ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতায় রোগীকে বাইরে পরীক্ষা করাতে বাধ্য করেন, তাঁদের জবাবদিহি নিশ্চিত না করে চিকিৎসককে অপমান করা অন্যায়। এটি চিকিৎসকের মর্যাদার ওপর আঘাত, একই সঙ্গে রোগীর নিরাপদ চিকিৎসার অধিকারকেও দুর্বল করে।

লজ্জা যদি কারও পাওয়ার থাকে, তবে তা ভাগ করে নিতে হবে—ক্রয়ব্যবস্থার ব্যর্থতাকে, প্রশাসনিক উদাসীনতাকে, সরবরাহব্যবস্থার দুর্নীতিকে, যন্ত্র রক্ষণাবেক্ষণের অবহেলাকে এবং নীতিগত অদক্ষতাকে।

সব লজ্জা একজন চিকিৎসকের ঘাড়ে চাপিয়ে দিলে স্বাস্থ্যব্যবস্থার কোনো পরিবর্তন হবে না।

আমরা চিকিৎসককে অপমান নয়, স্বাস্থ্যব্যবস্থার নিরপেক্ষ তদন্ত চাই।
ক্যামেরার সামনে নাটক নয়, প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি চাই।
দোষারোপ নয়, রোগীর জন্য নিরবচ্ছিন্ন পরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা চাই।

নইলে হাসপাতালের সমস্যা একই থাকবে—শুধু ক্যামেরার সামনে প্রতিবার নতুন একজন চিকিৎসককে অপমান করা হবে।

লেখক :
অধ্যাপক ডা. এ কে এম মহিউদ্দিন ভূঁইয়া মাসুম
এমবিবিএস (ডিএমসি), এমডি (কার্ডিওলজি)
বিভাগীয় প্রধান, কার্ডিওলজি বিভাগ
পপুলার মেডিকেল কলেজ এন্ড হাসপাতাল

মন্তব্য করুন