© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

হুথিদের মোকাবিলায় সৌদিকে সামরিক সহায়তা দেবে না যুক্তরাষ্ট্র

শেয়ার করুন:
হুথিদের মোকাবিলায় সৌদিকে সামরিক সহায়তা দেবে না যুক্তরাষ্ট্র

ছবি: সংগৃহীত

মোজো ডেস্ক
০৮:১৪ পিএম | ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
ইয়েমেনে হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবকে সরাসরি সামরিক সহায়তা না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ওমানের মাসকাটে হুথি নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের পর এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। হুথিরা যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়েছে, ২০২৫ সালের যুদ্ধবিরতি এখনো কার্যকর এবং লোহিত সাগরে মার্কিন ও আন্তর্জাতিক জাহাজে হামলার পরিকল্পনা নেই; তবে সৌদি-সংশ্লিষ্ট জাহাজকে তারা লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করে। এর ফলে হুথিদের মোকাবিলায় সৌদি আরবের ওপর কূটনৈতিক সমাধান খোঁজা অথবা পাকিস্তান-তুরস্কসহ আঞ্চলিক জোট গঠনের চাপ বেড়েছে। এদিকে মক্কায় হুথিদের ড্রোন হামলার সৌদি দাবি হুথিরা প্রত্যাখ্যান করেছে। পাশাপাশি লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিয়ে আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়ছে এবং তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে রয়েছে। খবর দ্য গার্ডিয়ানের।

প্রতিবেদনে বলা হয়, নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, সপ্তাহান্তে ওমানের রাজধানী মাসকাটে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা হুথি নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এর পরই ইয়েমেনের ভেতরে হুথিদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে সৌদি আরবকে সহায়তায় হস্তক্ষেপ না করার সিদ্ধান্ত নেয় যুক্তরাষ্ট্র।

ইরান-সমর্থিত এই সশস্ত্র গোষ্ঠী যুক্তরাষ্ট্রকে আশ্বস্ত করেছে যে, ২০২৫ সালে দুই পক্ষের মধ্যে হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি এখনো কার্যকর রয়েছে এবং লোহিত সাগরে মার্কিন জাহাজে হামলার কোনো ইচ্ছা তাদের নেই। ইয়েমেনের ওপর সৌদি আরবের অবরোধের কারণে শুধু সৌদি-সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোকে লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে বলে হুথিরা নিশ্চিত করেছে।

এই বৈঠকটি ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করছে কেন ডোনাল্ড ট্রাম্প ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূল ধরে হুথিদের অগ্রযাত্রার নিন্দা করেছেন—কারণ এটি বাব আল-মান্দাব প্রণালীর মধ্য দিয়ে নৌ চলাচলের স্বাধীনতার জন্য হুমকি—কিন্তু এখন পর্যন্ত রিয়াদকে সামরিক সহায়তা দিতে কোনো পদক্ষেপ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। হুথিদের সমর্থনকারী ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে ব্যয়বহুল ও সম্পদ ক্ষয়কারী একটি সংঘাতে জড়িয়ে আছে।

যুক্তরাষ্ট্র ২০২৫ সালের মার্চে হুথিদের একটি বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন কর্মকর্তারা হামাস, হিজবুল্লাহ ও ইরানের নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সোমবার নিশ্চিত করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র হুথিদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করছে।

যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি জড়াতে অস্বীকৃতি জানানোয় সৌদি আরবের ওপর চাপ বেড়েছে। এখন তাদের হয় ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা নিয়ে হুথিদের সঙ্গে কূটনৈতিক সমাধানে পৌঁছাতে হবে, অথবা হুথিদের পিছু হটতে বাধ্য করতে পাকিস্তান ও তুরস্ককে নিয়ে একটি আঞ্চলিক জোট গড়ার চেষ্টা করতে হবে। গত সপ্তাহে দ্রুতগতির এক অভিযানে হুথিরা লোহিত সাগর উপকূলবর্তী পশ্চিম ইয়েমেনের বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে নেয়।

ইয়েমেনে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক উপ-রাষ্ট্রদূত নাবিল খৌরি বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন ও হুথিদের মধ্যে ‘এক ধরনের নীরব সমঝোতা’ হয়েছে। খৌরি বলেন, “হুথিরা মার্কিন প্রশাসনকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে যে লোহিত সাগরে মার্কিন ও আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। তবে একমাত্র ঝুঁকি সৌদি জাহাজ বা সৌদি তেল বহনকারী জাহাজের জন্য।”

অঞ্চলে হুথিদের বিরুদ্ধে জনসমর্থন গড়ে তোলার চেষ্টা হিসেবে রিয়াদ মঙ্গলবার দাবি করেছে, হুথিরা পবিত্র নগরী মক্কার দিকে একটি ড্রোন ছুড়েছিল। তবে সৌদি প্রতিরক্ষা বাহিনী সেটি ধ্বংস করেছে। সৌদি আরবের দাবি, ড্রোনটি মক্কার সবচেয়ে পবিত্র ধর্মীয় স্থাপনাগুলোর কাছের নিষিদ্ধ আকাশসীমায় প্রবেশ করছিল। জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি জানান, মঙ্গলবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ৫০ মিনিটের দিকে ড্রোনটি প্রতিহত করা হয়।

সৌদি আরব বলেছে, মক্কায় যেকোনো হামলা তাদের জন্য ‘রেড লাইন’। এ ঘটনায় জাতিসংঘ-স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার, যার সদর দপ্তর এডেনে, এবং ৫৭ দেশের সংগঠন অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশন (ওআইসি) দীর্ঘ বিবৃতিতে নিন্দা জানিয়েছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফও মক্কায় কথিত হামলার নিন্দা করেছেন। তিনি এক বিবৃতিতে এটিকে “জঘন্য ও ভয়ংকর” হামলার চেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেন। এক্সে দেওয়া বিবৃতিতে তিনি বলেন, “এই ভয়াবহ ঘটনায় পাকিস্তানের জনগণ দুঃখিত ও উদ্বিগ্ন।”

মক্কায় তীর্থযাত্রাকে সম্মান করা শিয়া জায়দিবাদ অনুসরণকারী হুথি নেতৃত্ব সৌদি আরবের এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে এটিকে ‘শতাব্দীর সবচেয়ে বড় মিথ্যা’ বলে অভিহিত করেছে। তারা বলেছে, এ ধরনের পুরোনো মিথ্যা আগেও বলা হয়েছে এবং এতে কেউ বিভ্রান্ত হয়নি।

হুথিদের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল ওয়াহিদ আবু রাস বলেন, “যে ব্যক্তি দুই পবিত্র মসজিদের ভূমিকে অশ্লীলতা ও বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানের জন্য উন্মুক্ত করেছে এবং যে ব্যক্তি ওই ভূমিতে জায়নবাদী ইহুদিদের উপস্থিতির মাধ্যমে দুই পবিত্র মসজিদের ভূমিকে অপবিত্র করেছে, সেই ব্যক্তিই মক্কা, মদিনা ও ইসলামের পবিত্র স্থানগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে।”

হুথিরা পাল্টা দাবি করেছে, তারা মারিবের কাছে একটি সৌদি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে এবং লোহিত সাগরের বন্দরনগরী ইয়ানবুতে আরামকোর একটি স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। তবে হুথিদের সামরিক মুখপাত্র এ দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ দেননি। হুথিদের আলোচক দলের প্রধান মোহাম্মদ আবদুল সালাম বলেছেন, যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার ঘটনা পশ্চিমাদের জন্য সতর্কবার্তা, যাতে তারা সৌদি প্রচারের শিকার না হয়।

হুথিদের রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য মোহাম্মদ আল-ফারাহ বলেন, “সত্য হলো, সৌদি আরব ইয়েমেনে প্রকৃত সংকটের মধ্যে রয়েছে। তারা একটি যুদ্ধ, অবরোধ ও দখলদারিত্বের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিল এবং এরপর তাদের লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে।

“এখন তারা বাইরের সমাধান খুঁজছে। তাই তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে সাহায্য চাইছে, বাব আল-মান্দাব নিয়ে বিশ্বকে সতর্ক করছে এবং পাকিস্তান, তুরস্ক, আমেরিকা, ইসরায়েল ও মিসরের কাছে সহায়তা চাচ্ছে। এরপর তারা ‘মক্কায় হামলা’র মিথ্যা অজুহাত দেখিয়ে মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করছে।”

এদিকে, ইসরায়েলি কর্মকর্তারা গত সপ্তাহে জার্মানিতে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও কয়েকটি আরব দেশের সামরিক কমান্ডারদের মধ্যে অনুষ্ঠিত একটি গোপন বৈঠকের তথ্য ফাঁস করেছেন। বৈঠকে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ইরানের বিরুদ্ধে শুরু করা যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা হয়। অ্যাক্সিওসের সাংবাদিক বারাক রাভিদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার এই ‘ব্যক্তিগত বৈঠক’ আয়োজন করেছিলেন।

দুই ইসরায়েলি কর্মকর্তার বরাত দিয়ে রাভিদ জানান, বৈঠকে ইসরায়েল, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, জর্ডান ও মিসরের সামরিক বাহিনীর প্রধানরা অংশ নেন। ছয় মাসেরও বেশি সময় আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাওয়ার পর এটিই ছিল এ ধরনের প্রথম বৈঠক। একসময় হুথিদের লক্ষ্যবস্তু হওয়া ইসরায়েল এখন সৌদি আরবের পক্ষে ইয়েমেনে হস্তক্ষেপের প্রস্তাব দিচ্ছে।

মঙ্গলবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের এক বৈঠকে লোহিত সাগর বন্ধ করে দেওয়ার যেকোনো প্রচেষ্টার নিন্দা জানানো হয়। তবে বৈঠকটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, কারণ রাশিয়ার প্রতিনিধি আগের অবস্থান থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দেন। এর আগে রাশিয়া বলেছিল, এডেনে অবস্থানরত জাতিসংঘ-স্বীকৃত সরকারই ইয়েমেনের একমাত্র বৈধ সরকার।

বেইজিংয়ে বুধবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি তাঁর চীনা সমকক্ষ ওয়াং ই-এর সঙ্গে বৈঠক করেন। হরমুজ প্রণালীর ভবিষ্যৎ পরিচালনা নিয়ে নিজেদের পরিকল্পনার জন্য সমর্থন আদায়ের চেষ্টা হিসেবে এই বৈঠক হয়। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পৃথক অবরোধের কারণে প্রণালিটি এখনো বন্ধ রয়েছে।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেছেন, ইয়েমেন ও লোহিত সাগরে আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও ছড়িয়ে পড়ুক, চীন তা চায় না। চীন যুক্তরাষ্ট্রকে জুনে দুই পক্ষের মধ্যে হওয়া সমঝোতা স্মারকের ভিত্তিতে আলোচনায় ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। ইরানের তেলের প্রধান আমদানিকারক চীন দ্রুত একটি সমাধান চায়। একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করা দেশগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা হতে পারে এমন গৌণ নিষেধাজ্ঞা যেন চীনের ওপরও কার্যকর হয়—এমন যেকোনো প্রস্তাবের বিরোধিতা করছে বেইজিং।

তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের অনেক ওপরে রয়েছে। একই সময়ে সৌদি আরবের একটি গুরুত্বপূর্ণ পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন বোমা হামলার ঘটনার কারণে এখনো বন্ধ রয়েছে।

এমআই/এসএন

মন্তব্য করুন