যুক্তরাষ্ট্রে ছিলেন, কিন্তু জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দেননি শি জিনপিং– নেপথ্যে কী?
ছবি: সংগৃহীত
১২:৫০ পিএম | ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন চলছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা শুধু সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে গিয়েছেন। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র সফর করেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। তবে তিনি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দেননি। তার পরিবর্তে, ২৪ থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর চীনের হয়ে সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রতিনিধিত্ব করেছেন দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট হান ঝেং।
দ্য ডিপ্লোম্যাটের এক নিবন্ধে বলা হয়, শি প্রশান্ত মহাসাগর পেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পুরো মূল ভূখণ্ড সফর করছেন, কিন্তু জাতিসংঘের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্ষিক আয়োজনে যোগ দিতে উপকূল ধরে নিউইয়র্কে যাওয়ার জন্য ‘বাড়তি সময় ব্যয়’ করছেন না। যদিও নিউইয়র্কে যেতে তার বিমানে মাত্র এক ঘণ্টার মতো সময় লাগত।
তিন দিনের এই সফরে শি জিনপিং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করেন।
২০১২ সালের শেষ দিকে চীনের শীর্ষ নেতা হওয়ার পর শি মাত্র একবার সরাসরি সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে গিয়েছেন। ২০১৫ সালে জাতিসংঘের ৭০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে তিনি নিউইয়র্কে যান এবং সশরীরে সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেন। সেটিই ছিল সাধারণ পরিষদে তার প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র সরাসরি ভাষণ।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ওই সফরটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রে শির সর্বশেষ রাষ্ট্রীয় সফরও। তখন তার সফরসূচির অংশ হিসেবে সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দেয়ার পাশাপাশি তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গে শীর্ষ বৈঠকও করেছিলেন তিনি। ফলে ২০২৬ সালে একই ধরনের সফর না করার সিদ্ধান্তটি আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
২০২১ সালে শি সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভিডিও বার্তা দিয়েছিলেন। ওই ভাষণে তিনি চীনের গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভের ঘোষণা দেন। এরপর থেকে তিনি সাধারণ পরিষদের সামনে আর কোনো ভাষণ দেননি।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলোর একটি হলো, গত বছরের সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশনেও শি যোগ দেননি। চীন গোলসংখ্যার বার্ষিকীকে বিশেষ গুরুত্ব দেয় এবং বিশেষ তারিখের সঙ্গে বিদেশ সফর ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বড় ধরনের উন্নয়নকে যুক্ত করে। মনে রাখা দরকার, জাতিসংঘের ৭০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে শি নিজে উপস্থিত হওয়ার সময় বের করেছিলেন। সেটি কোনো ব্যতিক্রমও ছিল না—১৯৯৫ সালে চীনের নেতা হিসেবে জিয়াং জেমিনের পর থেকে জাতিসংঘের প্রতি দশ বছর পরপর অনুষ্ঠিত প্রতিটি প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে চীনের শীর্ষ নেতা উপস্থিত ছিলেন। ফলে ২০২৫ সালে জাতিসংঘের ৮০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে শির অনুপস্থিতি আরও বেশি চোখে পড়ার মতো হয়ে ওঠে।
দ্য ডিপ্লোম্যাটের নিবন্ধে আরও উল্লেখ করা হয়, চীন এখন জাতিসংঘেও বড় বৈশ্বিক উদ্যোগ ঘোষণা করা বন্ধ করে দিয়েছে। ২০২১ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে (ইউএনজিএ) ভার্চুয়াল ভাষণের মাধ্যমে গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ ঘোষণা করেছিলেন শি। কিন্তু ২০২৫ সালে শি নতুন গ্লোবাল গভর্ন্যান্স ইনিশিয়েটিভ ঘোষণা করেন চীনে অনুষ্ঠিত সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের (এসসিও) সম্মেলনে, যা ইউএনজিএর এক মাস আগে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। জাতিসংঘের লক্ষ্য ও কর্মকাণ্ডের সঙ্গে এই উদ্যোগটির সম্পর্ক আরও সরাসরি।
চীন একইভাবে নিজস্ব ওয়ার্ল্ড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (ডব্লিউএআইসিও) প্রতিষ্ঠা করেছে। সংস্থাটি ‘একটি স্বাধীন আন্তঃসরকারি আন্তর্জাতিক সংস্থা, যার লক্ষ্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা এগিয়ে নেয়া’। একই লক্ষ্য অর্জনে জাতিসংঘের কাঠামোর মধ্যে কাজ করে নিজেদের উদ্যোগকে বৈধতা দেয়ার পরিবর্তে চীন এই সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেছে। এক মাস আগে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের গ্লোবাল ডায়ালগ অন এআই গভর্ন্যান্সে ঘোষণা না করে চীন নিজস্ব এআই সম্মেলনেই ডব্লিউএআইসিওর ঘোষণা দেয়।
এদিকে, ট্রাম্প যখন জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়ন কমিয়ে দিচ্ছেন, তখন ঘাটতি পূরণে চীন এগিয়ে আসেনি। জাতিসংঘের নির্ধারিত চাঁদার অর্থ পরিশোধে চীন নিজেও দীর্ঘদিন ধরে দেরি করে আসছে। ট্রাম্প দায়িত্ব নেয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্র যে পরিমাণ অর্থ দিত, তার তুলনায় চীনের অবদান এখনো সামান্য অংশ।
বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থায় জাতিসংঘের ‘মূল ভূমিকা’ নিয়ে চীন যতই কথা বলুক না কেন, বেইজিং স্পষ্টতই এমন জায়গাগুলোতেই বেশি মনোযোগ, অর্থ ও মর্যাদা দিতে পছন্দ করে, যেখানে তার নিয়ন্ত্রণ বেশি। এর মধ্যে চীন-নেতৃত্বাধীন এসসিওর মতো গোষ্ঠী যেমন রয়েছে, তেমনি ট্রাম্পের সঙ্গে শীর্ষ বৈঠকের মতো পুরোপুরি দ্বিপক্ষীয় বৈঠকও রয়েছে।
নিক্কেই এশিয়া ধারণা করেছে, ইউএনজিএ এড়িয়ে যাওয়ার শির সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য ছিল চীনকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত সমকক্ষ হিসেবে তুলে ধরা। নিউইয়র্কে ছোট দেশগুলোর নেতাদের সঙ্গে শির মেলামেশা করলে সেই বার্তার প্রভাব নষ্ট হয়ে যেতে পারত বলে ধারণা করা হয়। বিষয়টি নিজেই তাৎপর্যপূর্ণ। সব দেশের সমান প্রতিনিধিত্ব এবং বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থায় সমান মতামতের অধিকার থাকা উচিত—বহুমেরু বিশ্বের বিষয়ে চীন যতই বক্তব্য দিক না কেন, বাস্তব পরিস্থিতিতে বেইজিং ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিই অনুসরণ করে।
২০১০ সালে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর এক উত্তপ্ত বৈঠকে চীনের শীর্ষ কূটনীতিক বেশ খোলাখুলিভাবেই বলেছিলেন, ‘চীন একটি বড় দেশ এবং অন্য দেশগুলো ছোট দেশ—এটাই বাস্তবতা।’ ট্রাম্পও বারবার যা দেখিয়েছেন, ‘বড় দেশ’ হওয়ার অন্যতম সুবিধা হলো জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট অন্য জায়গায় অগ্রাধিকার দিতে জাতিসংঘকে উপেক্ষা করার সুযোগ থাকা।
এসএন