এবার ১০ দফা দাবি পেশ করলেন রাহুল গান্ধী
ছবি: সংগৃহীত
০৯:২৩ পিএম | ১২ অক্টোবর, ২০২৬
ভারতে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়া স্থগিত রাখার দাবিতে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেছেন কংগ্রেস নেতা ও লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী। আবেদনে নির্বাচন কমিশনের নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে ১০ দফা প্রতিকার চাওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে এসআইআর-সংক্রান্ত নথিপত্র আদালতে জমা দেওয়া, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার ঘটনা তদন্ত এবং পুরো প্রক্রিয়া সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা।
সোমবার (১২ অক্টোবর) বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র নেতারা বিপুলসংখ্যক সমর্থককে সঙ্গে নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের দিকে মিছিল করেন। রাহুল গান্ধীসহ বিরোধী নেতারা ভোটার তালিকা সংশোধন ও নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে আদালতের হস্তক্ষেপ চান। তবে বিকাল সাড়ে ৪টার মধ্যে রাহুল গান্ধী সুপ্রিম কোর্টে পৌঁছাতে না পারায় কংগ্রেসের আইনজীবী এস প্রসন্ন তার পক্ষে আবেদনটি জমা দেন।
রাহুল গান্ধী ছাড়াও কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী, সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব, তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং রাষ্ট্রীয় জনতা দলের নেতা তেজস্বী যাদবসহ বিরোধী জোটের একাধিক নেতা মিছিলে অংশ নেন।
এর আগের দিন ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বিষয়টি বিচারাধীন থাকায় রাহুল গান্ধীর সঙ্গে দেখা করতে অস্বীকৃতি জানান। এরপর বিরোধী নেতারা যৌথভাবে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেন। বিরোধীদের অন্যতম প্রধান দাবি, প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ।
সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে ‘রাহুল গান্ধী বনাম ভারতের নির্বাচন কমিশন’ শিরোনামে আবেদনটি তালিকাভুক্ত হয়েছে। এনডিটিভি আবেদনটির বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেছে।
আবেদনে যে ১০ দফা দাবি জানানো হয়েছে
১. এসআইআর-সংক্রান্ত সব নথি জমা দেওয়ার নির্দেশ
বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়া শুরুর সিদ্ধান্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব নথি, চুক্তি, সভার কার্যবিবরণী, বৈঠকের রেকর্ড এবং আপত্তিসংক্রান্ত তথ্য আদালতে জমা দিতে নির্বাচন কমিশনকে নির্দেশ দেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে। এর মধ্যে ইসিনেট ও ইআরওনেট ব্যবস্থার প্রবেশসংক্রান্ত লগ এবং ২০২৫ সালের ২৪ জুন এসআইআর শুরুর সিদ্ধান্তের সঙ্গে সম্পর্কিত সব নথির অভ্যন্তরীণ মন্তব্যও অন্তর্ভুক্ত করার দাবি রয়েছে। সংবিধানের ১৪, ১৯ ও ২১ অনুচ্ছেদে প্রদত্ত অধিকার সুরক্ষা এবং ৩২৪ অনুচ্ছেদের কার্যকারিতা নিশ্চিত করার কথা আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
২. এসআইআর-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের সাংবিধানিক বৈধতা যাচাই
এসআইআর-সংক্রান্ত বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলো সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদ, ২০২৩ সালের প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ, চাকরির শর্ত ও মেয়াদবিষয়ক আইনের ১৮ ধারা এবং সুপ্রিম কোর্টের পূর্ববর্তী রায়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা যাচাইয়ের আবেদন করা হয়েছে। বিশেষ করে ১৯৯৫ সালের ‘শেষন বনাম ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া’ মামলায় নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করার দাবি জানানো হয়েছে। যথাযথ আইনি কর্তৃত্ব ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে থাকলে তা বাতিলের আবেদনও রয়েছে।
৩. দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
ভোটার তালিকা প্রস্তুত ও সংশোধনের ক্ষেত্রে সাংবিধানিক বা আইনগত বিধান লঙ্ঘনের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ চাওয়া হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী জনপ্রতিনিধিত্ব আইন, ১৯৫০-এর ৩২ ধারায় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টিও আবেদনে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
৪. আবেদনকারীর অভিযোগের নিষ্পত্তি
রাহুল গান্ধীর বর্তমান আবেদন ও সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে যথাযথ সিদ্ধান্ত নিতে নির্বাচন কমিশনকে নির্দেশ দেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে এসআইআর-সংক্রান্ত প্রতিটি সিদ্ধান্ত ২০২৩ সালের আইনের ১৮ ধারা অনুসারে নেওয়া এবং যথাযথভাবে নথিভুক্ত করার দাবি রয়েছে।
৫. অনলাইন ফর্ম-৬ নির্ধারিত বিধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা
ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য ব্যবহৃত অনলাইন ফর্ম-৬ যেন ১৯৬০ সালের ভোটার নিবন্ধন বিধিমালায় নির্ধারিত ফর্মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, সে বিষয়ে নির্বাচন কমিশনকে নির্দেশ দেওয়ার আবেদন করা হয়েছে। নির্ধারিত ফর্ম থেকে বিচ্যুত কোনো পরিবর্তন না করার দাবিও জানানো হয়েছে।
৬. স্বাধীন কমিটি দিয়ে নিরীক্ষা ও তদন্ত
সুপ্রিম কোর্টের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে প্রযুক্তিবিশেষজ্ঞ ও বিশিষ্ট নাগরিকদের নিয়ে স্বাধীন কমিটি গঠনের আবেদন করা হয়েছে। নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে কমিটিকে কয়েকটি দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। সেগুলো হলো—
এসআইআর চলাকালে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া ও সংশোধনের ঘটনা নিয়ে স্বাধীন তদন্ত ও নিরীক্ষা করা।
ভোটার তালিকার তথ্যভান্ডারে প্রবেশাধিকার এবং সেখানে করা পরিবর্তন পর্যালোচনা করা। এ ক্ষেত্রে ইসিনেট ও ইআরওনেট ব্যবস্থাও পরীক্ষা করা।
ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম) প্রযুক্তিগত নকশা ও কাঠামো, সিদ্ধান্ত, নীতিমালা, পদ্ধতি, প্রটোকল এবং ব্যবহার ও প্রয়োগের বিষয়গুলো সামগ্রিকভাবে পর্যালোচনা করা।
অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের উত্তম চর্চাগুলো বিবেচনায় নেওয়া।
৭. বাদ পড়া ভোটারদের নাম ও কারণ প্রকাশ
এসআইআরের মাধ্যমে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া সব ব্যক্তির নাম বুথভিত্তিক প্রকাশের জন্য নির্বাচন কমিশনকে নির্দেশ দেওয়ার আবেদন করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিটি নাম বাদ দেওয়ার কারণ এবং বাদ পড়া ভোটারদের বয়স ও লিঙ্গভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস প্রকাশের দাবি রয়েছে। যেসব ব্যক্তি ভোটার তালিকায় থাকার যোগ্য, তাদের নাম পুনরায় অন্তর্ভুক্তির জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথাও বলা হয়েছে।
৮. নোটিশ ও শুনানি ছাড়া নাম বাদ না দেওয়া
আইন অনুযায়ী নোটিশ দেওয়া এবং শুনানির যুক্তিসংগত সুযোগ নিশ্চিত না করে কোনো ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ না দেওয়ার নির্দেশ চাওয়া হয়েছে। এ ছাড়া পাঞ্জাবসহ যেসব রাজ্যে নির্বাচন সামনে রয়েছে, সেখানে যোগ্য ব্যক্তিদের আইন নির্ধারিত শেষ সময় পর্যন্ত ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির আবেদন করার সুযোগ দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
৯. চলমান এসআইআর প্রক্রিয়ায় অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ
আবেদনে উত্থাপিত বিষয়গুলো বিবেচনা ও নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সব রাজ্যে চলমান বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া স্থগিত রাখার জন্য অন্তর্বর্তী নির্দেশ চাওয়া হয়েছে। যোগ্য ভোটারদের অধিকার সুরক্ষা এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ন্যায্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখার যুক্তিতে এ দাবি জানানো হয়েছে।
১০. প্রয়োজনীয় অন্যান্য নির্দেশ দেওয়ার আবেদন
মামলার পরিস্থিতি ও প্রাসঙ্গিক বিষয় বিবেচনা করে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং প্রত্যেক যোগ্য নাগরিকের ভোটাধিকার সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় অন্য যেকোনো নির্দেশ বা অতিরিক্ত আদেশ দেওয়ার জন্যও সুপ্রিম কোর্টের কাছে আবেদন জানানো হয়েছে।
আবেদনটির মাধ্যমে মূলত এসআইআর প্রক্রিয়ার আইনগত বৈধতা, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার স্বচ্ছতা এবং যোগ্য নাগরিকদের ভোটাধিকার সুরক্ষায় আদালতের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন রাহুল গান্ধী। তবে আবেদনে উত্থাপিত দাবিগুলোর বিষয়ে আদালতের সিদ্ধান্তের তথ্য এই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
সূত্র: এনডিটিভি
আরআই/টিএ