চুয়েট ভিসিকে সুস্থ হয়ে দ্রুত ক্যাম্পাসে ফেরার পরামর্শ সরকারের
ছবি: সংগৃহীত
১২:০১ পিএম | ১৪ অক্টোবর, ২০২৬
টানা ৩০ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর উদ্ধার হওয়া চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম জানিয়েছেন, সরকারের পূর্ণ সহযোগিতা রয়েছে তার প্রতি। দ্রুত সুস্থ হয়ে ক্যাম্পাসে ফিরে যাওয়ার পরামর্শও দিয়েছে সরকার।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সন্ধ্যায় অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে উদ্ধার করে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখান থেকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মুঠোফোনে তিনি এসব কথা বলেন তিনি।
বর্তমানে চুয়েট উপাচার্যকে হাসপাতালে ২৪ ঘণ্টার নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। তার সুচিকিৎসায় একটি বিশেষজ্ঞ মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে আজ বুধবার বোর্ডের পক্ষ থেকে তার শারীরিক অবস্থার সর্বশেষ আপডেট জানানো হবে।
উপাচার্যের ভাষ্য অনুযায়ী, অবরুদ্ধ থাকায় তাদের ১১ জনের স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে। দুজন অ্যালামনাই সদস্য অসুস্থ হয়ে পড়লে তাদের একজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে সরকারি চিকিৎসক ও সিভিল সার্জনের পরামর্শে উপাচার্যকেও হাসপাতালে নেওয়া হয়।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় চুয়েট উপাচার্য বলেন, আপনারা ইতোমধ্যে অবগত হয়েছেন, আমরা অমানবিক একটা পরিবেশে ছিলাম। এর প্রেক্ষিতে আমাদের ১১ জনের স্বাস্থ্যের চরম অবনতি ঘটে। অনেকে অসুস্থ হয়ে যান। আমাদের দুজন অ্যালামনাই সদস্য গত রাতে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। তাদের একজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
তিনি বলেন, গত সোমবার দুপুর ১২টা থেকে বিদ্যুৎ বন্ধ থাকায় আমাদের অমানবিক কষ্টের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে। এর প্রেক্ষিতে একপর্যায়ে আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি। সরকারি চিকিৎসক ও সিভিল সার্জনের পরামর্শক্রমে আমাকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছে।
সরকারের সঙ্গে কথা হওয়ার বিষয়ে উপাচার্য জানান, সরকার তাকে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। দ্রুত সুস্থতা কামনা করে ক্যাম্পাসে ফিরে যাওয়ার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
এদিকে পদত্যাগ এবং ভবিষ্যতে চুয়েট ক্যাম্পাসে না ফেরার খবরকে মিথ্যা দাবি করেছেন উপাচার্য। তিনি বলেন, আমি পদত্যাগ করেছি এবং ভবিষ্যতে চুয়েট ক্যাম্পাসে পদার্পণ করব না, এ রকম কোনো বক্তব্য বা বিবৃতি আমি দিইনি। আপনারা দেখেছেন, যখন আমাকে নিয়ে আসা হচ্ছিল, তখন আমার কথা বলার মতো পরিস্থিতি ছিল না। যারা এ রকম সংবাদ প্রচার করছেন, তাদের প্রতি আমার আহ্বান থাকবে, আপনারা সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রচার করবেন।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, তোমরা তোমাদের অমূল্য শিক্ষাজীবন নষ্ট করো না। তোমরা হয়ত কোনো স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর পাল্লায় পড়ে ব্যবহৃত হচ্ছ। তোমরা যথেষ্ট বুদ্ধিমান। তোমরা কারও দ্বারা ব্যবহৃত হবে না, এটা আমার দৃঢ় বিশ্বাস।
অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম আরও বলেন, রাষ্ট্র আমাকে যে দায়িত্ব দিয়েছে, সেই অর্পিত রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করতেই চট্টগ্রামে এসেছি। কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থে বা কোনো দলীয় অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে আসিনি।
গত সোমবার সকাল পৌনে ৯টার দিকে বহিরাগতদের নিয়ে চুয়েটের প্রশাসনিক ভবনের মূল ফটকের তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম। এরপর শিক্ষার্থীরা উপাচার্যকে দুপুর ১২টার মধ্যে কার্যালয় ছাড়ার সময় বেঁধে দেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তিনি কার্যালয় না ছাড়ায় দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ভবনের ফটকে আবার তালা দেওয়া হয়। এরপর উপাচার্য নিজ কার্যালয়ে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। এরপর তাদের টানা ৩০ ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখে শিক্ষার্থীরা। পরদিন মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টায় চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার গিয়ে ভিসিকে উদ্ধার করে। পুলিশি পাহারায় অ্যাম্বুলেন্সে করে ক্যাম্পাস ছাড়েন ভিসি।
মঙ্গলবার বিকেল ৫টার দিকে চুয়েট ক্যাম্পাসে যান চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা ও জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলমসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তারা আন্দোলনরত শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা করেন। এ সময় শিক্ষার্থীরা বাসে হামলার ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দৃশ্যমান পদক্ষেপ না থাকায় ক্ষোভ জানান। পাশাপাশি উপাচার্যের পদত্যাগ এবং তার সঙ্গে থাকা এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের দাবিও তোলেন তারা।
পুলিশ সুপার জানান, অবরুদ্ধ ব্যক্তিদের মধ্যে কারও বিরুদ্ধে চলমান মামলা থাকলে তাকে আটক করা হবে।
পরে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের মধ্যস্থতায় উপাচার্য ও তার সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের বের করে আনা হয়। সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে প্রশাসনিক ভবনের উত্তর পাশের জরুরি প্রবেশপথ (পকেট দরজা) দিয়ে তাকে বের করা হয়। এ সময় শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন স্লোগান দেন। পরে পুলিশি পাহারায় অ্যাম্বুল্যান্সে করে উপাচার্যসহ অন্যদের চমেক হাসপাতালে নেওয়া হয়।
শিক্ষার্থীদের উপাচার্যকে ক্যাম্পাস ছাড়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে এই শর্তে যে তিনি আর চুয়েটে ফিরবেন না। তবে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দেওয়া বক্তব্যে অধ্যাপক শরীফুল আলম স্পষ্ট করেছেন, ক্যাম্পাসে না ফেরার বিষয়ে তিনি কোনো বক্তব্য বা বিবৃতি দেননি।
উপচার্যের ক্যাম্পাস ত্যাগের প্রতিক্রিয়ায় চুয়েট যন্ত্রকৌশল বিভাগের ২১ ব্যাচের শিক্ষার্থী আহনাফ শাহরিয়ার অর্ণব দৈনিক দেশের একটি গণমাধ্যমকে বলেন, জেলা প্রশাসক মহোদয় একটি শর্তে অবরুদ্ধ থাকা নবনিযুক্ত ভিসিকে বের করে নিয়ে গেছেন। শর্তটি ছিল তিনি ভিসি হিসেবে এই চুয়েট ক্যাম্পাসে আর কখনও ফিরে আসবে না।
তিনি আরও জানান, সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে ভিসি হিসেবে পুনর্বহাল না করা পর্যন্ত এই শাটডাউন অব্যাহত থাকবে। ভিসি কার্যালয়ে বিদ্যুৎ ও পানি সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকবে।
২২ ব্যাচের শিক্ষার্থী শাহারিয়ার হিসাম বলেন, তিনি চুয়েটের মাঠিতে ভিসি পদে আর কখনও পা রাখতে পারবে না। যদি তার অন্যথায় ঘটে আমরা কঠোর থেকে কঠোরতর আন্দোলনে যাব। আর শরিফুল চলে যাওয়া আমাদের চুড়ান্ত বিজয় নয়, সায়েম স্যার পুনর্বহাল না হওয়া পর্যন্ত আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাব।
চুয়েটের উপাচার্য আর ক্যাম্পাসে ফিরবেন না-এমন শর্তে ক্যাম্পাস ত্যাগ করেছেন বলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরকে অসত্য ও মনগড়া দাবি করেছেন উপচার্যের সাথে অবরুদ্ধ থেকে মুক্ত হওয়া বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি ওয়াসিফ রাশেদ।
ফেসবুক স্ট্যাটাসে তিনি বলেন, অসুস্থতার কারণে উপাচার্য কোনো বক্তব্য দেননি। তার পক্ষ থেকে কোনো লিখিত বক্তব্য বা মুচলেকাও দেওয়া হয়নি। তাই এ ধরনের সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে প্রকৃত তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপনের আহ্বান জানান তিনি। কোনো মুচলেকার কপি থাকলে তা প্রকাশেরও অনুরোধ করেন।
ওয়াসিফ রাশেদ আরও বলেন, প্রজ্ঞাপন পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত উপাচার্য দায়িত্বে রয়েছেন। তিনি বর্তমানে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এবং দ্রুত সুস্থ হয়ে দায়িত্বে ফিরবেন বলে তিনি জানতে পেরেছেন।
উপাচার্যের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাকে দুঃখজনক উল্লেখ করে তিনি বলেন, একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সঙ্গে যে মব করা হলো এবং রাষ্ট্রযন্ত্র চেয়ে চেয়ে দেখল, এর চেয়ে কষ্টকর কিছু হতে পারে না।
তিনি আরও বলেন, ‘অন্যায় আবদার কখনো অধিকার হতে পারে না, যৌক্তিকও হতে পারে না।’
উল্লেখ্য, অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে দায়িত্ব গ্রহণের ৫৬ দিনের মাথায় সরিয়ে দিয়ে অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে চুয়েটের উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়। এর প্রতিবাদে গত ২১ সেপ্টেম্বর শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেন।
পরদিন শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অংশগ্রহণে সর্বাত্মক শাটডাউন শুরু হয়। এরপর থেকে সাবেক উপাচার্যকে পুনর্বহালসহ বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে আসছেন তারা।
আরআই/টিএ