© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

নৌবাহিনীর শিপইয়ার্ডের ৩২০ কোটি টাকার চুক্তিস্বাস্থ্যমন্ত্রীর পরিবারের পকেটে সরকারি অর্থ, অনুসন্ধানে চাঞ্চল্যকর তথ্য

শেয়ার করুন:
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পরিবারের পকেটে সরকারি অর্থ, অনুসন্ধানে চাঞ্চল্যকর তথ্য

ছবি: সংগৃহীত

মোজো ডেস্ক
০৩:৪২ পিএম | ১৬ অক্টোবর, ২০২৬
(‘ডেইলি ওয়াদা’ [Daily Waadaa]-র বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অবলম্বনে)

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুলের পরিবারের সদস্যদের মালিকানাধীন একটি কাগুজে প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টে গেছে সরকারি ক্রয় প্রকল্পের বিপুল পরিমাণ অর্থ। বাংলাদেশ নৌবাহিনী পরিচালিত একটি শিপইয়ার্ডের মাধ্যমে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ৩২০ কোটি টাকার বেশি মূল্যের একটি কেনাকাটা চুক্তিতে এই অনিয়ম ঘটেছে।  

সংবাদমাধ্যম ডেইলি ওয়াদা-র এক অনুসন্ধানে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, কোনো ধরনের উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়াই সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে চুক্তিটি পায় নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠান ‘ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লিমিটেড’ (DEW)। কিন্তু কাজ পাওয়ার মাত্র এক দিন পরই একটি গোপন ত্রিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে প্রকল্পটির সিংহভাগ আর্থিক সুবিধা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ভাইপো ও ভাইঝির প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়া হয়।



যেভাবে ভাগ হয় ৩২০ কোটি টাকা

গত ২৩ আগস্ট সমাজসেবা অধিদপ্তর নৌবাহিনীর শিপইয়ার্ড DEW-এর সঙ্গে একটি চুক্তি সই করে। এতে প্রতিটি ৪৮ হাজার টাকা দরে মোট ৬৬ হাজার ৮১৫টি অ্যান্ড্রয়েড ট্যাবলেট সরবরাহের জন্য ৩২০ কোটি ৭১ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।

পরদিনই (২৪ আগস্ট) DEW দুটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পৃথক একটি অভ্যন্তরীণ চুক্তি করে।

শিপইয়ার্ডের কমিশন: নৌবাহিনীর ডকইয়ার্ড কোনো ধরনের আর্থিক ঝুঁকি বা লাভ-লোকসান ছাড়াই মোট চুক্তিমূল্যের ৪ শতাংশ (প্রায় ১২ কোটি ৮৩ লাখ টাকা) নিশ্চিত কমিশন হিসেবে কেটে রাখবে।

আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান: ট্যাবলেট তৈরির যন্ত্রাংশ আমদানির জন্য ‘স্যালেক্সট্রা লিমিটেড’ পাবে ১৭৯ কোটি ২৫ লাখ টাকা।

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পরিবারের প্রতিষ্ঠান
সরকারি কর ও আনুষঙ্গিক খরচ বাদ দিয়ে অবশিষ্ট সব টাকা চলে যাবে ‘বুরাক ব্রেক লিমিটেড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে। মন্ত্রীর ভাইপোর প্রতিষ্ঠানের কোনো অতীত অভিজ্ঞতা নেই। ‘বুরাক ব্রেক লিমিটেড’ প্রতিষ্ঠানটি মূলত স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাখাওয়াত হোসেন বকুলের ভাইপো সরদার রাফিন এস এ হোসেন ও ভাইঝি অনিকা রাইদা লিয়ার মালিকানাধীন।

ডেইলি ওয়াদা-র অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০২১ সালের নভেম্বরে যখন কোম্পানিটি নিবন্ধিত হয়, তখন রাফিনের বয়স ছিল মাত্র ১৯ বছর।তাদের নিবন্ধিত ঠিকানা ঢাকার গুলশান-২ এলাকার একটি আবাসিক ফ্ল্যাট। প্রতিষ্ঠানটির কোনো ওয়েবসাইট, পণ্যের তালিকা কিংবা প্রযুক্তিপণ্য সরবরাহের কোনো অতীত অভিজ্ঞতা নেই।

এমনকি নামের দিক থেকেও এটি কোনো অটোমোবাইল ব্রেক পার্টস তৈরির ব্যবসা ইঙ্গিত করলেও বাস্তবে কোনো ধরনের উৎপাদনের তথ্য মেলেনি।



মন্ত্রণালয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ভাইয়ের উপস্থিতি
রাফিন ও অনিকার বাবা হলেন সরদার তোফাজ্জল হোসেন লিয়াকত। তিনি স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাখাওয়াত হোসেন বকুলের ছোট ভাই এবং নরসিংদী জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি। ডেইলি ওয়াদা-র সংগ্রহ করা ছবিতে দেখা যায়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে কেনাকাটার প্রক্রিয়া চলাকালীন নৌবাহিনীর এক কর্মকর্তার সঙ্গে লিয়াকত উপস্থিত ছিলেন। এমনকি সমাজকল্যাণ মন্ত্রী ও সচিবের দপ্তরেও তাকে দেখা গেছে।

তবে লিয়াকত কেনাকাটার তদবির বা আলোচনার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, প্রতিবন্ধীদের কর্মসংস্থান ও ‘মুক্তি’ খাবার পানি সংক্রান্ত একটি বৈঠকে তিনি উপস্থিত ছিলেন।

কোনো উন্মুক্ত দরপত্র ছিল না
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, চলতি বছর সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে কোনো উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়াই DEW-কে মোট দুটি চুক্তি দেওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে ২১.৯৯ কোটি টাকার হুইলচেয়ার-সেলাই মেশিন এবং ৩২০.৭১ কোটি টাকার ট্যাবলেট—যার মোট মূল্য প্রায় ৩৪২ কোটি ৭০ লাখ টাকা।

নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিরক্ষা বা সামরিক প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি কাজ দেওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পূর্বানুমোদন বাধ্যতামূলক ছিল। কিন্তু এই চুক্তির সরকারি নথিতে সেই অনুমোদনের কোনো প্রমাণ মেলেনি। এছাড়া সরবরাহকৃত নমুনা হুইলচেয়ারে গুরুতর ত্রুটি এবং বাজারে প্রচলিত দামের চেয়ে ট্যাবলেটের দাম অনেক বেশি ধরা হয়েছে বলে অনুসন্ধানে উঠে আসে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য
এই বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেন, “বুরাক ব্রেক লিমিটেড নামে কোনো কোম্পানি আমার জানা নেই। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কোনো চুক্তির ব্যাপারেও আমি কিছু জানি না। আমার পরিবারের কেউ ব্যবসার সাথে যুক্ত নয়।”

রাফিন তার ভাইপো স্বীকার করে মন্ত্রী আরও বলেন, “সে আমার ভাইপো ঠিকই, তবে তার সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। একজন নাগরিক হিসেবে তার ব্যবসা করার অধিকার আছে। আইন মেনে ব্যবসা করলে তাতে অন্যায়ের কিছু নেই।”

অন্যদিকে সমাজকল্যাণ মন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন জানিয়েছেন, মন্ত্রণালয় নৌবাহিনীর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তি করেছে, কোনো ব্যক্তির সাথে নয়। শিপইয়ার্ড অভ্যন্তরীণভাবে কাকে দিয়ে কাজ করাবে, সেটি তাদের এখতিয়ার।

এমআর/টিএ  

মন্তব্য করুন