আওয়ামী লীগ ও বিএনপি'র মধ্যে নামের পার্থক্য, চরিত্র সব এক: গোলাম পরওয়ার
ছবি: সংগৃহীত
১১:৩২ পিএম | ২৬ অক্টোবর, ২০২৬
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামের সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে দলের নামের পার্থক্য, চরিত্র সব এক। শুধু দলটার নাম পরিবর্তন হয়েছে, বাকি সব চরিত্র এক। চাঁদাবাজি, খুন, দখলদারি, হাট কমিটি, বাজার কমিটি, স্কুল কমিটি, বালুঘাট, টেম্পু স্ট্যান্ড, বাস স্ট্যান্ড যা আগে চলতো, এখনো ঠিকই চলছে, তবে নামটা শুধু উল্টে গেছে।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের উদ্যোগে আয়োজিত জাতীয় প্রেসক্লাবের আব্দুস সালাম হলে "রক্তে ভেজা ২৮ অক্টোবর, ফ্যাসিবাদের উত্থান : কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ বিনির্মাণের চ্যালেঞ্জ করণীয়" শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
তিনি বলেন, ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের হত্যাকাণ্ডের জন্য মামলা করা হলো। কিন্তু ২০০৯ সালের হাসিনা সরকার সেই মামলা এমনভাবে প্রত্যাহার করে নিল সেই সঙ্গে মামলার নথিপত্র নিখোঁজ করে দিল। আজকে সেই শহীদের মায়েরা বিচারের জন্য কাঁদে।
সরকারকে উদ্দেশ্য করে জামায়াত সেক্রেটারি বলেন, যদি আপনারা আওয়ামীলীগকে সত্যিই খুনি ফ্যাসিবাদী চরিত্র বলে মনে করে থাকেন, তাহলে ২৮ অক্টোবরের মামলা পুনরুজ্জীবিত করে অপরাধীদের গ্রেপ্তার করুন।
তিনি বলেন, বিএনপি ও আওয়ামী লীগের কাছে শিখেছে ক্ষমতায় না থাকলে গণতন্ত্র, ক্ষমতায় গেলে কীভাবে ফ্যাসিবাদের পথ ধরতে হয়। বিএনপি এখন সে পথেই হাঁটছে। তারেক রহমান নিজে নির্বাচনের আগে গণভোটের পক্ষে হাঁ ভোট চেয়েছেন। কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে নিজের দেওয়া হ্যাঁ ভোটের সঙ্গে গাদ্দারী করার এমন নজির পৃথিবীর কোথাও নেই। এর মধ্য দিয়ে তিনি সেই ফ্যাসিবাদের পথই ধরলেন। সহস্রাধিক মানুষের জীবন গেলো। তাদের রক্তের সঙ্গে বেইমানি করে নতুন রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন এভাবে ভেঙে দেবেন? একই দিনে দুটি ভোট হলো, একটি মানলেন আরেকটি মানলেন না। কারণ একটা মানলে প্রধানমন্ত্রী হওয়া যায়, রাষ্ট্রপতি হওয়া যায়। এত বড় বিরোধী দলকে বাদ দিয়ে, তাদের মত না নিয়ে, সংস্কারের বাদ দিয়ে সংবিধান সংশোধনের পথে গিয়েছেন। এটাই হচ্ছে ফ্যাসিবাদের পথ। গণতন্ত্রের ধ্বজাধারীরা ক্ষমতায় আসার পর সেই গণতন্ত্রের কথা আবার ভুলে যায়।
বিএনপিকে উদ্দেশ্য করে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ২০০৬ সালের ২৮শে অক্টোবর জোট সরকারের ক্ষমতা হস্তান্তরের দিন বিএনপির কাছে জোটের একসঙ্গে সমাবেশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা সে প্রস্তাব না মেনে আলাদা আলাদা সমাবেশ করার পক্ষে সিদ্ধান্ত নেয়।
তিনি বলেন, সেদিন গণতন্ত্র হত্যাকারী ফ্যাসিস্টদের সঙ্গে আঁতাত করে ইসলামী আন্দোলনকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্রে তারা জড়িত ছিল কিনা? তা না হলে উত্তর গেটে হামলা হলো আর নয়া পল্টনে নির্বিঘ্নে সমাবেশ হলো কীভাবে?
তিনি আরও বলেন, একটা সমাবেশে সাপের মতো মানুষকে পিটিয়ে পিটিয়ে লাশের উপর নৃত্য করা হলো আর আরেকটি সমাবেশ শান্তিপূর্ণভাবে হয়ে গেলো। সেদিনও কোনো নতুন সরকার গঠিত হয়নি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পুলিশ, র্যাব, বিডিআর সেনাবাহিনী সবকিছু ছিল। সকাল থেকে লড়াই চলল, যুদ্ধ চললো সরকারের একজন মন্ত্রীর কর্মসূচিতে এমন নির্মম ঘটনা ঘটলো অথচ তাদের কোনো ভূমিকা ছিল না।
তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, কেন সেদিন যাদের হাতে ক্ষমতা ছিল নিষ্ঠুর বর্বরতা রুখে দেওয়ার জন্য তারা ভূমিকা রাখেনি?
‘আওয়ামী লীগের ইতিহাস হচ্ছে ফ্যাসিবাদের ইতিহাস। তারা ক্ষমতার বাইরে থাকলে গণতন্ত্রের কথা বলে আর যখন ক্ষমতার যায় তখনই গণতন্ত্র হত্যা করে। শেখ মুজিব তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছেন, জেল খেটেছেন। পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ নির্যাতনের বিরুদ্ধে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের সাড়ে সাত কোটি বাঙালি তার ডাকে সাড়া দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল। কিন্তু তিনি ক্ষমতায় এসে গণতন্ত্রের টুটি চেপে ধরে হত্যা করলেন। সমস্ত রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করে বাকশাল কায়েম করলেন। সব দল নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি তিনি তার নিজের দলকেও নিঃশেষ করলে সরকারের পছন্দের চারটি পত্রিকা চালু রেখে সকল সংবাদপত্র বন্ধ করে দেওয়া হয়। ট্রেড ইউনিয়নগুলো বন্ধ করা হয়। এর মধ্য দিয়েই ফ্যাসিবাদের সূচনা করে শেখ মুজিব। তার কন্যা শেখ হাসিনাও ক্ষমতার আগে গণতন্ত্র, গণতন্ত্র বলে চিৎকার করেছেন। আর ক্ষমতায় গিয়ে গণতন্ত্রকে হত্যা করেছে।’
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, রাজনীতিতে যে অগণতান্ত্রিক ফ্যাসিবাদী আগমন এটা শুধু ২৮ শে অক্টোবরই আগমন করেনি। পরবর্তীকালে দুই বছরের অবৈধ তত্ত্বাবধায়ক সরকার, সেই পথ ধরেই ২০১৮ সালের কারচুপির নির্বাচন এবং ১৭ বছর ফ্যাসিবাদের ধারাবাহিকতার রূপ জাতি প্রত্যক্ষ করে। নির্বাচিত সংসদ ও সংসদীয় গণতন্ত্রের আড়ালে পৃথিবীর একটি জঘন্যতম ফ্যাসিবাদী সরকার ছিল আওয়ামী লীগ সরকার। জামায়াতের নেতৃবৃন্দের ফাঁসি দেওয়া থেকে শুরু করে অফিসে তালা এবং এবং বিরোধীদল দমনের জন্য গুম, খুন অত্যাচার সহ সব ধরনের চেষ্টা পরিলক্ষিত হয়েছে। কিন্তু সে ক্ষমতায় থাকতে পারেনি। আমাদের তরুণরা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বৈষম্যের বিরুদ্ধে জনগণকে ডাক দিয়েছিল। ছাত্র জনতা রাজপথে নেমে এসেছে। সর্বশ্রেণির মানুষের ত্যাগের মধ্য দিয়ে ৫ই আগস্ট গণ-অভ্যুত্থান ঘটেছে। ২৮ অক্টোবর ২০০৬ থেকে ৫ই আগস্ট ২০২৪ একটি সঙ্গে আরেকটি একই সুতোয় গাঁথা।
তিনি বলেন, বিএনপি ও আওয়ামীলীগের আচরণে কোনো পার্থক্য নেই। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যতটুকু সংস্কার করেছে বিএনপি এসে ততটুকু মুছে দিয়েছে। তারা ক্ষমতায় এসে স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার পথ রুদ্ধ করেছে। বিচারের মুখোমুখি হলে বিচারকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্যই একাজ করেছে। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান সবগুলোকে ধ্বংস করেছে। আওয়ামী লীগ নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস করেছিল, দুর্নীতি দমন কমিশন ধ্বংস করেছিল, মানবাধিকার কমিশন সহ সবকিছুকে আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছিল। আজকের বিএনপি এই সংক্রান্ত সকল অধ্যাদেশ সংসদে এসে সংখ্যাগরিষ্ঠতার গায়ের জোরে বাতিল করে দিয়েছে। এজন্যই পুরোনো ফ্যাসিবাদ আর নব্য ফ্যাসিবাদের কারেক্টারের কোনো পরিবর্তন নেই।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী কেন্দ্রীয় মজলিশে শূরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি ড. আব্দুল মান্নান প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
আরআই/টিএ