বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহি হামিদুর রহমানের ৫৫তম শাহাদতবার্ষিকী আজ
ছবি: সংগৃহীত
১১:২৩ এএম | ২৮ অক্টোবর, ২০২৬
আজ বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহি হামিদুর রহমানের ৫৫তম শাহাদতবার্ষিকী। ধলইয়ের রণাঙ্গনে জীবন উৎসর্গ করা এই তরুণের সাহস ও আত্মত্যাগ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়।
বয়স তখন মাত্র ১৮ বছর। সামনে ছিল জীবনের দীর্ঘ পথ। কিন্তু সেই তরুণের জীবন থেমে যায় স্বাধীনতার জন্য লড়াই করতে গিয়ে। তিনি সিপাহি হামিদুর রহমান বাংলাদেশের সাত বীরশ্রেষ্ঠের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ। স্বাধীন দেশের বিজয়োল্লাস দেখে যেতে পারেননি তিনি; সেই বিজয়ের ইতিহাসে নিজের নাম লিখে গেছেন আত্মত্যাগের অক্ষরে।
আজ বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহি হামিদুর রহমানের ৫৫তম শাহাদতবার্ষিকী। ১৯৭১ সালের এই দিনে মৌলভীবাজারের ধলই রণাঙ্গনে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে শহীদ হন তিনি। পাঁচ দশকের বেশি সময় পেরিয়েও তাঁর বীরত্ব স্বাধীনতার ইতিহাসের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
১৯৫৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি জন্ম হামিদুর রহমানের। অভাবের সংসারে বেড়ে ওঠা এই তরুণের শৈশব সহজ ছিল না। পড়াশোনা শুরু করলেও আর্থিক সংকটে তা চালিয়ে যেতে পারেননি। পরিবারের কাজে হাত লাগাতে হয় তাঁকে।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জীবনী অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের ২ ফেব্রুয়ারি সেনাবাহিনীতে যোগ দেন হামিদুর রহমান। প্রশিক্ষণের জন্য যান চট্টগ্রামের ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারে। মার্চে পাকিস্তানি বাহিনীর দমন-পীড়ন ও হত্যাযজ্ঞের মধ্যে তাঁর জীবনের পথ বদলে যায়। পরে তিনি প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন।
অক্টোবরের শেষ দিকে ধলইয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর অবস্থানের বিরুদ্ধে অভিযানে অংশ নেন হামিদুর রহমান। শত্রুপক্ষের শক্ত প্রতিরক্ষা ও মেশিনগানের গুলিবর্ষণে মুক্তিযোদ্ধাদের অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল। সেই প্রতিরোধ ভাঙার লড়াইয়ে সামনে এগিয়ে যান তিনি।
একাত্তরের বীরযোদ্ধা গ্রন্থ অবলম্বনে প্রকাশিত দেশের একটি গণমাধ্যমর বিবরণ অনুযায়ী, সহযোদ্ধাদের গুলির আড়ালে পাকিস্তানি বাহিনীর মেশিনগান পোস্টের কাছে পৌঁছে গ্রেনেড নিক্ষেপ করেন হামিদুর রহমান। তাঁর আক্রমণে ওই পোস্টের গুলি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর বাংকারে চড়াও হলে পাশের আরেকটি বাংকার থেকে ছোড়া গুলিতে তিনি শহীদ হন।
সহযোদ্ধাদের অগ্রযাত্রার বাধা সরাতে নিজের জীবন বিপন্ন করেছিলেন এই তরুণ সৈনিক। যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁর সেই সাহসিকতা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে স্থায়ী জায়গা করে নেয়।
মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য বীরত্ব ও আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ হামিদুর রহমানকে মরণোত্তর বীরশ্রেষ্ঠ খেতাবে ভূষিত করা হয়। এটিই বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বীরত্বসূচক সামরিক খেতাব।
শাহাদতের পর তাঁর মরদেহ ভারতের ত্রিপুরায় সমাহিত করা হয়েছিল। দীর্ঘ ৩৬ বছর পর তাঁর দেহাবশেষ দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। ২০০৭ সালের ১১ ডিসেম্বর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ঢাকার মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাঁকে পুনঃসমাহিত করা হয়। যে দেশের স্বাধীনতার জন্য তিনি প্রাণ দিয়েছিলেন, সেই দেশের মাটিতেই হয় তাঁর শেষ আশ্রয়।
হামিদুর রহমানের শাহাদতবার্ষিকী একটি তরুণ জীবনের আত্মত্যাগকে ফিরে দেখার দিন। তাঁর জীবন মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতার ইতিহাসের প্রতিটি বীরত্বগাথার পেছনে রয়েছে একজন মানুষ, তাঁর পরিবার এবং অপূর্ণ থেকে যাওয়া ভবিষ্যৎ।
তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর একটি অর্থবহ উপায় হলো নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের নির্ভুল ইতিহাস তুলে ধরা। আঠারো বছরের এক সৈনিক কীভাবে দেশের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, সেই সত্য জানার মধ্য দিয়েই তাঁর স্মৃতি আরও গভীরভাবে বেঁচে থাকবে।
৫৫ বছর পরও তাই হামিদুর রহমানের নাম উচ্চারিত হয় সাহস, কর্তব্যবোধ ও আত্মত্যাগের প্রতীক হয়ে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে তিনি চিরস্মরণীয়।
আরআই/টিএ