© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

সাগরে প্রতিদিন সক্রিয় প্রায় ১০০টি চীনা যুদ্ধজাহাজ, উদ্বেগ বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের

শেয়ার করুন:
সাগরে প্রতিদিন সক্রিয় প্রায় ১০০টি চীনা যুদ্ধজাহাজ, উদ্বেগ বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের

ছবি: সংগৃহীত

মোজো ডেস্ক
০৪:০৫ পিএম | ০৭ নভেম্বর, ২০২৬
এশিয়ার অন্যতম ব্যস্ত বাণিজ্য ও নৌপরিবহন রুটগুলোতে প্রতিদিন প্রায় ১০০টি চীনা নৌবাহিনীর জাহাজ সক্রিয় রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিপুলসংখ্যক যুদ্ধজাহাজের এই নিয়মিত উপস্থিতি মার্কিন সামরিক পরিকল্পনাবিদদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে জাহাজের সংখ্যার হিসাবে চীনের নৌবহর এখন মার্কিন নৌবাহিনীর চেয়েও বড়। একসময় প্রধানত আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে পরিচিত চীনা নৌবাহিনী এখন আরও উচ্চাকাঙ্ক্ষী উপস্থিতি তৈরি করেছে, যা ওয়াশিংটনের পক্ষে আর উপেক্ষা করা সম্ভব নয়।

দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের যুদ্ধক্ষমতাসম্পন্ন নৌবহরে এখন ৪০০টিরও বেশি জাহাজ ও সাবমেরিন রয়েছে। জাহাজের সংখ্যা অনুযায়ী এটি মার্কিন নৌবহরের তুলনায় প্রায় ৩৫ শতাংশ বড়। আধুনিক সময়ে শান্তিকালীন বৃহত্তম নৌবাহিনী সম্প্রসারণগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। বিশ্বের শীর্ষ বাণিজ্যিক জাহাজ নির্মাতা দেশ হওয়ায় চীন দ্রুত যুদ্ধজাহাজ তৈরি করতে পারছে, যা এই সম্প্রসারণকে ত্বরান্বিত করছে।

চীনের নৌবাহিনীর কার্যক্রম এশিয়ার বিস্তৃত জলসীমাজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ব্যস্ত দক্ষিণ চীন সাগর, তাইওয়ানের আশপাশের জলসীমা, ফিলিপাইনের পূর্বাঞ্চল এবং জাপানের দক্ষিণ উপকূলসংলগ্ন এলাকা। দেশটির যুদ্ধজাহাজগুলো পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের আরও বিস্তৃত এলাকায়ও বিচরণ করছে। পাশাপাশি এডেন উপসাগর ও আশপাশের জলসীমায়ও দূরপাল্লার নৌ অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।

দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, সাংহাইয়ের কাছাকাছি দ্বীপগুলোতে অবস্থিত একই জাহাজ নির্মাণ কারখানায় বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ তৈরি হয়। একই সময়ে এসব কারখানায় বড় উভচর যুদ্ধজাহাজ, ডেস্ট্রয়ার ও ফ্রিগেটসহ আধুনিক যুদ্ধজাহাজও নির্মাণ করা হচ্ছে।

দীর্ঘ সময় ধরে সমুদ্রে যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন রাখার সক্ষমতা চীনের ক্রমবর্ধমান নৌ-প্রভাবকে আরও বিস্তৃত করেছে।

গ্লোবাল টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৩৭৮ দিন সমুদ্রে থাকার পর চীনের ৪৮তম এসকর্ট টাস্কফোর্স কিংদাও বন্দরে ফিরে এসেছে। এই অভিযানে তারা ১ লাখ ৫০ হাজারেরও বেশি নটিক্যাল মাইল অতিক্রম করেছে এবং এডেন উপসাগর ও আশপাশের জলসীমায় ৪২৩টি বাণিজ্যিক জাহাজকে নিরাপত্তা দিয়েছে। এই টাস্কফোর্সে একটি আধুনিক ডেস্ট্রয়ার, একটি ফ্রিগেট এবং একটি সরবরাহকারী জাহাজ ছিল।

চীনা সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ধারাবাহিকভাবে মোতায়েন করা টাস্কফোর্সগুলো এখন নিয়মিতভাবে ৩০০ দিনেরও বেশি সময় সমুদ্রে অবস্থান করছে। উন্নত সরঞ্জামের নির্ভরযোগ্যতা, অধিক প্রশিক্ষিত নাবিক এবং শক্তিশালী রসদ সরবরাহ ব্যবস্থাকে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন তাঁরা।

চীনের বন্দর থেকে অনেক দূরে অবস্থান করেও বিশ্রাম, মেরামত ও সরবরাহের সুবিধা দিতে জিবুতিতে থাকা সহায়তা ঘাঁটি এবং কম্বোডিয়ায় নতুন যৌথ স্থাপনাটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

দূরপাল্লার এসব অভিযান চীনের উপকূলের কাছাকাছি আরও ঘন নৌ তৎপরতার পাশাপাশি চলছে।

দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্রুজারের সমান আকারের বড় চীনা যুদ্ধজাহাজ এখন নিয়মিতভাবে চীন থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে অভিযান চালাচ্ছে। পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে বিমানবাহী রণতরিগুলো যৌথ মহড়া পরিচালনা করেছে এবং বিদেশি বিমানের খুব কাছাকাছি অবস্থান করে যুদ্ধবিমান উড্ডয়ন করেছে। একই সময়ে বেইজিংয়ের সাবমেরিন উৎপাদনও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা মার্কিন মূল্যায়ন অনুযায়ী, আগামী ১৫ বছরের মধ্যে চীনা সাবমেরিনগুলো নিয়মিতভাবে ভারত মহাসাগর এবং সম্ভবত আটলান্টিক মহাসাগরেও অভিযান চালাতে পারে।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং দেশটির নৌবাহিনীর সম্প্রসারণ ত্বরান্বিত করতে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি জাতীয় শক্তির জন্য সামুদ্রিক শক্তিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরেছেন। এক্ষেত্রে সমুদ্রের নিয়ন্ত্রণ কীভাবে অতীতে বিভিন্ন শক্তিধর দেশের উত্থানে সহায়তা করেছিল, সেই ঐতিহাসিক উদাহরণও তুলে ধরেছেন তিনি।

ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চীনের নৌবাহিনীর সম্প্রসারণ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে তাইওয়ান এবং দক্ষিণ চীন সাগরের বিরোধপূর্ণ জলসীমাকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে জাপান ও ফিলিপাইনের সঙ্গে চীনের সম্পর্কের অবনতি হয়েছে।

তাইওয়ানের প্রতি জাপানের সমর্থনে বেইজিং ক্ষুব্ধ। অন্যদিকে দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে ম্যানিলার সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে রয়েছে চীন। আবার তাইওয়ানকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে শক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনা কখনোই পুরোপুরি নাকচ করেনি চীন। যদিও বেইজিং বলছে, তারা শান্তিপূর্ণ পুনর্মিলনকেই অগ্রাধিকার দেয়।

রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সেনাবাহিনীর কমান্ডাররা এমন পরিস্থিতি ধরে নিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছেন যে চীন আগামী বছরের মধ্যেই তাইওয়ানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে জাহাজ নির্মাণ এবং দৈনন্দিন নৌ-তৎপরতার ব্যবধান স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২০ বছরে মার্কিন জাহাজ নির্মাণ বাজেট দ্বিগুণ হলেও ২০০৩ সালের তুলনায় দেশটির নৌবহরের আকার বাড়েনি।

বর্তমানে মার্কিন পতাকাবাহী জাহাজে খুব কম বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহন করা হয়। একই সঙ্গে বড় সমুদ্রগামী জাহাজ নির্মাণের শিল্পভিত্তিও সীমিত।

নতুন ফ্রিগেট নির্মাণ, পুরোনো ক্রুজারগুলোর কার্যক্ষমতার মেয়াদ বাড়ানো এবং বিপুলসংখ্যক লিটোরাল কমব্যাট শিপ পরিচালনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নেয়া কর্মসূচিগুলোও গুরুতর সমস্যার মুখে পড়েছে এবং মূল লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে বলে জানিয়েছে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল।

এমআর/ 

মন্তব্য করুন