ছাত্রদল নেতা জোবায়েদ হত্যা মামলায় বিচার শুরু
ছবি: সংগৃহীত
১২:৫৭ পিএম | ০৮ নভেম্বর, ২০২৬
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষার্থী ও শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য জোবায়েদ হোসেন হত্যা মামলায় তিন আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ (চার্জ) গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছেন আদালত।
রোববার (৮ নভেম্বর) দুপুরে ঢাকার ১৫তম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক মুহাম্মদ মাজহারুল ইসলাম আসামিদের অব্যাহতির আবেদন নাকচ করে অভিযোগ গঠনের এই আদেশ দেন। একই সঙ্গে আগামী ৯ ডিসেম্বর মামলার সাক্ষ্য গ্রহণের তারিখ নির্ধারণ করেছেন আদালত।
মামলার আসামিরা হলেন— জোবায়েদের ছাত্রী বার্জিস শাবনাম বর্ষা, বর্ষার প্রেমিক মো. মাহির রহমান এবং মাহিরের বন্ধু ফারদীন আহম্মেদ আয়লান। মামলায় গ্রেপ্তার এই তিন আসামিই বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। শুনানিকালে তাদের কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়। বাদীপক্ষের আইনজীবী ইশতিয়াক হোসেন জিপু বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এর আগে গত ৩০ জুন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বংশাল থানার উপ-পরিদর্শক আশরাফ হোসেন বর্ষাসহ এই ৩ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করেন। আসামিরা সবাই আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন।
চার্জশিটে বলা হয়, নিহত মো. জোবায়েদ হোসেন (২৫) জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের (২০১৯-২০২০ শিক্ষাবর্ষ, ১৫তম ব্যাচ) ছাত্র ছিলেন এবং জীবিকা নির্বাহের জন্য টিউশনি করতেন। তিনি দীর্ঘদিন আসামি বর্ষার বাসায় গৃহশিক্ষক হিসেবে পড়াতেন। সেই সূত্রে জোবায়েদ ও বর্ষার মধ্যে ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে।
তদন্তে প্রকাশ পায়, বর্ষার সঙ্গে আসামি মাহিরের দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। পরবর্তীতে গৃহশিক্ষক জোবায়েদের সঙ্গেও বর্ষার সম্পর্ক তৈরি হয়। দুজনের শারীরিক সম্পর্কের বিষয়ে জানতে পেরে মাহির চরম ক্ষুব্ধ ও প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে ওঠে।
স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি অনুযায়ী, জোবায়েদের কাছে নিজের আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও থাকার অভিযোগ তুলে তাকে হত্যা করতে মাহিরকে প্ররোচিত করে বর্ষা। মাহির তার বন্ধু আয়লানকে নিয়ে জোবায়েদকে হত্যার পরিকল্পনা করে। তারা একটি সুইচগিয়ার চাকু সংগ্রহ করে এবং ঘটনাস্থল ঘুরে রেকি করে।
উদ্ধারকৃত ডিজিটাল আলামত ও ফোন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঘটনার দিন এবং তার আগেও বর্ষা ও জোবায়েদের মধ্যে হোয়াটসঅ্যাপে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। ঘটনার দিন বিকেল ৪টা ২৭ মিনিটে তাদের মধ্যে লাইভ লোকেশন শেয়ার হয়। একই সময়ে বর্ষা ও মাহিরের মধ্যেও একাধিকবার যোগাযোগ হয়। এতে স্পষ্ট হয়, বর্ষা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে জোবায়েদের অবস্থান মাহিরকে সরবরাহ করছিলেন।
পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী জোবায়েদ বর্ষার বাসায় পড়াতে গেলে মাহির ও আয়লান ওত পেতে থাকে। নিচতলায় জোবায়েদ প্রবেশ করলে মাহির কথা বলার বাহানায় তাকে থামায় এবং বাকবিতণ্ডায় জড়ায়। একপর্যায়ে মাহির সুইচগিয়ার চাকু দিয়ে জোবায়েদের গলায় সজোরে আঘাত করে। গুরুতর আহত জোবায়েদ আত্মরক্ষার্থে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে দৌড়ে ওঠার চেষ্টা করলে তিন তলার সিঁড়িতে লুটিয়ে পড়েন এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে সেখানেই মারা যান।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, ২০২৫ সালের ১৯ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে জোবায়েদ বংশাল থানার ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের নূর বক্স লেনের ১৫ নম্বর হোল্ডিং ‘রৌশান ভিলা’য় পড়াতে যান। ওই দিনই সন্ধ্যা আনুমানিক ৫টা ৪৮ মিনিটে বর্ষা মেসেঞ্জারে জোবায়েদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছোট ভাই সৈকতকে জানান যে, ‘কে বা কারা জোবায়েদ স্যারকে খুন করে ফেলেছে।’ রাত আনুমানিক ৭টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মো. কামরুল হাসান ফোন করে বিষয়টি জোবায়েদের ভাই এনায়েত হোসেনকে জানান।
এনায়েত তার শ্যালক শরীফ মোহাম্মদকে সঙ্গে নিয়ে রাত সাড়ে আটটার দিকে ঘটনাস্থলে পৌঁছান। ভবনটির সিঁড়ি ও দেয়ালে রক্তের দাগ দেখতে পেয়ে ওপরে উঠে তাঁরা ৩য় তলার সিঁড়িতে জোবায়েদের রক্তাক্ত মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন।
ময়নাতদন্ত শেষে ২০ অক্টোবর জোবায়েদকে কুমিল্লার কৃষ্ণপুর গ্রামে দাফন করা হয়। এ ঘটনায় ২১ অক্টোবর সকালে জোবায়েদের ভাই এনায়েত হোসেন বাদী হয়ে বংশাল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। ওই দিনই বর্ষাসহ তিন আসামি নিজেদের দোষ স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেন এবং আদালত তাদের কারাগারে পাঠান। এছাড়া প্রীতম নামের এক ব্যক্তি এই মামলায় সাক্ষী হিসেবে আদালতে জবানবন্দি দেন।
এমআর/