প্রবাসী আয়ে বেড়েছে রিজার্ভ

প্রতিবছরই ঈদের আগে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় বেড়ে যায়। এবারও ব্যতিক্রম হয়নি। ঈদের সময় ১৪ দিনে ১৯ হাজার ৪৩২ কোটি টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা পাঠিয়েছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। এছাড়া রপ্তানি আয়ও এসেছে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয় বা রিজার্ভও বেড়েছে। তবে গ্রস রিজার্ভ এখনো ২৫ বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করতে পারেনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ ২০২১ সালের আগস্টে সর্বোচ্চ উঠেছিল ৪ হাজার ৮০০ কোটি ডলার (৪৮ বিলিয়ন)। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১৯ জুন পর্যন্ত গ্রস রিজার্ভ ২ হাজার ৪৭৮ কোটি বা ২৪ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এর শর্ত অনুযায়ী বিপিএম-৬ ম্যানুয়াল অনুযায়ী গ্রস রিজার্ভ ১ হাজার ৯৫২ কোটি বা ১৯ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার। ১২ জুন পর্যন্ত গ্রস রিজার্ভ ছিল ২৪ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার, বিপিএম-৬ ম্যানুয়াল অনুযায়ী ছিল ১৯ দশমিক ২১ বিলিয়ন। এক সপ্তাহে গ্রস রিজার্ভ বেড়েছে ২৬ কোটি ডলার এবং বিপিএম-৬ অনুযায়ী বেড়েছে ৩১ কোটি ৮২ লাখ ডলার।

চলতি মাসের শুরুতে ৫ জুন গ্রস রিজার্ভ ছিল ২৪ দশমিক ২৩ বিলিয়ন এবং বিপিএম-৬ অনুযায়ী ছিল ১৮ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলার।

তবে এর বাইরে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিট বা প্রকৃত রিজার্ভের আরেকটি হিসাব রয়েছে, যা শুধু আইএমএফকে দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অন্য কোথাও প্রকাশ করে না। সেখানে আইএমএফের এসডিআর খাতে থাকা ডলার, ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার ক্লিয়ারিং হিসাবে থাকা অর্থ এবং আকুর বিল বাদ দিয়ে ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ-এর হিসাব করা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সেই হিসাবে দেশের ব্যয়যোগ্য প্রকৃত রিজার্ভ এখন ১৪ বিলিয়ন ডলার। প্রতি মাসে ৫ বিলিয়ন ডলার করে এ রিজার্ভ দিয়ে তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর সক্ষমতা নেই। সাধারণত একটি দেশের ন্যূনতম ৩ মাসের আমদানি খরচের সমান রিজার্ভ থাকতে হয়। সেই মানদণ্ডে বাংলাদেশ এখন মন্দ সূচকে রয়েছে। একটি দেশের অর্থনীতির অন্যতম সূচক হল বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বা রিজার্ভ।

কীভাবে তৈরি হয় রিজার্ভ

রেমিট্যান্স, রপ্তানি আয়, বিদেশি বিনিয়োগ, বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার ঋণ থেকে যে ডলার পাওয়া যায় তা দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তৈরি হয়। আবার আমদানি ব্যয়, ঋণের সুদ বা কিস্তি পরিশোধ, বিদেশি কর্মীদের বেতন-ভাতা, পর্যটক বা শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাসহ বিভিন্ন খাতে যে ব্যয় হয়, তার মাধ্যমে বিদেশি মুদ্রা চলে যায়। এভাবে আয় ও ব্যয়ের পর যে ডলার থেকে যায় সেটাই রিজার্ভে যোগ হয়। আর বেশি খরচ হলে রিজার্ভ কমে যায়।

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও বিভিন্ন পণ্যের দাম বেশি থাকায় আমদানি ব্যয় কমেনি বরং বেড়েছে। এছাড়া করোনার পর বৈশ্বিক বাণিজ্য আগের অবস্থায় ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। তারপর শুরু হলো রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। এর প্রভাবে দেশে ডলার-সংকট প্রকট আকার ধারণ করে; যা এখনো অব্যাহত আছে। এ সংকট দিন দিন বাড়ছে। বাজারে ‘স্থিতিশীলতা’ আনতে রিজার্ভ থেকে নিয়মিত ডলার বিক্রি করে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ফলে ধারাবাহিকভাবে নিম্নমুখী হয় অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর এ সূচকটি।

২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি আইএমএফ বাংলাদেশের জন্য ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ কর্মসূচি অনুমোদন করে। এ সময় কিছু নীতি সংস্কারসহ বেশ কিছু শর্ত দেওয়া হয়। ঋণ কর্মসূচি শুরুর পর দুই কিস্তিতে ১০০ কোটি ডলারের বেশি পেয়েছে বাংলাদেশ। তৃতীয় কিস্তি ৭০ কোটি ডলার পাওয়ার কথা জুনের শেষের দিকে।

আইএমএফ বাংলাদেশকে যে ঋণ দিয়েছে, তার অন্যতম শর্ত তাদের লক্ষ্য অনুযায়ী প্রকৃত রিজার্ভ সংরক্ষণ করা। সেই অনুযায়ী, গত মার্চ মাস শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রকৃত রিজার্ভ থাকার কথা ১ হাজার ৯২৬ কোটি মার্কিন ডলার। কিন্তু ওই সময় প্রকৃত রিজার্ভ ছিল ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের কম। এছাড়া জুন নাগাদ লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া ছিল ২ হাজার ১০ কোটি ডলার। তবে লক্ষ্য পূরণে বার বার ব্যর্থ হওয়ায় বাংলাদেশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে রিজার্ভ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে শর্ত কিছুটা শিথিল করেছে আইএমএফ।

সবশেষ সংস্থাটি জানায়, জুনভিত্তিক রিজার্ভের লক্ষ্যমাত্রা ২০ দশমিক ১০ বিলিয়ন ডলার থেকে কমিয়ে ১৪.৭৬ বিলিয়ন ডলারে নামিয়ে আনা হয়েছে। অর্থাৎ জুনের মধ্যে প্রকৃত রিজার্ভ ১৪ দশমকি ৭৬ বিলিয়ন রাখতে হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে রিজার্ভ ছিল ২১ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলার। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ছিল ২৫ দশমিক ০২ বিলিয়ন ডলার। ২০১৫-১৬ তে ৩০ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৩৩ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলার। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে রিজার্ভ ছিল ৩২ দশমিক ৯৪ বিলিয়ন ডলার। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ছিল ৩২ দশমিক ৭১ বিলিয়ন ডলার। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ছিল ৩৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন। ২০২০-২১ অর্থবছরে রিজার্ভ ছিল ৪৬ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার। ২০২১-২২ অর্থবছরে ৪১ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলার এবং সবশেষ ২০২২-২৩ অর্থবছরে রিজার্ভ কমে দাঁড়ায় ৩১ বিলিয়ন ডলার।

রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি

বাজারে ডলার সংকট কাটাতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয় বা রিজার্ভ থেকে ধারাবাহিকভাবে ডলার বিক্রি করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। চলতি অর্থবছরে ১১ মাসে (জুলাই-মে) আমদানি দায় মেটাতে বিভিন্ন ব্যাংকের কাছে ১৪ দশমকি ৯৩ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এসময় কারেন্সি সোয়াপ পদ্ধতিতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে ৪ দশমিক ৯৩ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করেছে। ক্রয়কৃত ডলার বাদ দিয়ে রিজার্ভ থেকে নিট বিক্রির হিসাব করা হয়েছে। ফলে ১১ মাসে রিজার্ভ থেকে নিট বিক্রির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৮০ কোটি বা ৯ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলার।

এর আগে গত ২০২২-২৩ অর্থবছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন ব্যাংকের কাছে ১৩ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করেছিল। আর আগের অর্থবছরে ( ২০২১-২২) ডলার বিক্রি করেছিল ৭ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলার।

Share this news on:

সর্বশেষ

img
বিসিবি নির্বাচনে অংশ নেবেন তামিম ইকবাল Aug 31, 2025
img
চীনে অনুষ্ঠিত হলো ‘রিমেম্বারিং আওয়ার জুলাই হিরোস’ স্মরণ অনুষ্ঠান Aug 31, 2025
img
দীর্ঘ তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে খুলছে সুন্দরবন Aug 31, 2025
img
রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে বিএনপি প্রতিটি অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করবে : তারেক রহমান Aug 31, 2025
img
‘ভয়, আওয়ামী লীগের ভোট যদি জাতীয় পার্টিতে যায়!’ Aug 31, 2025
img
ঢাকায় আজ থেকে চালু হচ্ছে দেশীয় প্রযুক্তির ট্রাফিক ব্যবস্থা Aug 31, 2025
img
বিমানের ফ্রি টিকিটের জন্য শাওনকে বিয়ে করিনি : টয়া Aug 31, 2025
img
চিরঞ্জীবীর দেখা পেতে ৩০০ কিমি সাইকেলে পাড়ি, মহানুভবতা অভিনেতার Aug 31, 2025
img
ওসমান শরীফ হাদীকে দেখতে শহীদ নূর হোসেনের পুনর্জন্মের মতো লাগে: শফিকুল আলম Aug 31, 2025
img
দুই মেয়েকে নিয়ে একা এষা, প্রাক্তন ভরতের জীবনে নতুন প্রেম Aug 31, 2025
img
নূরের ওপর হামলা দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অংশ: ডা. জাহিদ Aug 31, 2025
কঠিন আর্থিক সময়, গহনা বিক্রি করলেন অপু! Aug 31, 2025
img
শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের সংঘর্ষে উত্তপ্ত চবি এলাকা, আহত অনেকে Aug 31, 2025
পরিবার নিয়ে এল কেএফসি, খতে পারলেন না আফ্রিদি Aug 31, 2025
এক এগারো নিয়ে যে হুশিয়ারি রাশেদের Aug 31, 2025
জাহ্নবীর জীবনে নতুন অধ্যায়, সামনে এলো তাঁর স্বামীর নাম! Aug 31, 2025
‘নির্বাচিত সরকার বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করবে কিনা ভাবতে হচ্ছে’ Aug 31, 2025
গুমের শিকার পরিবারগুলোর জন্য যে উদ্যোগ নেয়ার কথা বললেন নাবিলা Aug 31, 2025
ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে নির্বাচন প্রতিহত করার কোনো শক্তি নেই: প্রেস সচিব Aug 31, 2025
১০ মিনিটে গোটা বিশ্বের সারাদিনের সর্বশেষ আলোচিত সব খবর Aug 31, 2025