ভাষা আন্দোলনের নেপথ্যে তমদ্দুন মজলিস!
ছবি:সংগৃহীত
০৯:৫৫ পিএম | ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫
'উর্দুই কি হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা, নাকি বাংলাও পাবে তার প্রাপ্য স্বীকৃতি?' - ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগে থেকেই এই প্রশ্নকে ঘিরে শুরু হয় বিতর্ক। জানা যায়, কলকাতাকেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে কেউ কেউ শুধুমাত্র উর্দুকেই রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে ছিলেন, আবার কেউ সেটির বিরোধিতাও করেছেন।
পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের অধিকাংশই চেয়েছিল যেন বাংলাকে দেয়া হয় রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা। কিন্তু তখনো এই দাবিটি সুসংগঠিতভাবে সামনে আসেনি। ঠিক এই সময়েই তমদ্দুন মজলিস নামে একটি সংগঠন প্রথমবারের মতো বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানায় এবং গড়ে তুলে ভাষা আন্দোলনের ভিত্তি!
১৯৪৭ সালের পহেলা সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল কাশেম এর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় তমদ্দুন মজলিস। যা ছিল একটি ইসলামী আদর্শে বিশ্বাসী সাংস্কৃতিক সংগঠন। অধ্যাপক আবুল কাশেম ও তার সহকর্মীরা খুব দ্রুত বুঝতে পারেন, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি না দিলে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের ভাষা ও সংস্কৃতি পড়বে হুমকির মুখে। তাই ১৯৪৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর তারা প্রকাশ করেন "পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা: বাংলা না উর্দু" নামক বইটি। এই বইয়ে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার বিপক্ষে যুক্তি তুলে ধরা হয় এবং ব্যাখ্যা করা হয় বাংলার গুরুত্ব।
তমদ্দুন মজলিসের নেতৃত্বেই ১৯৪৭ সালের ১ অক্টোবর রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়, যা ভাষা আন্দোলনকে করে তোলে আরও বেগবান। সংগঠনটি বাংলার স্বীকৃতির পক্ষে জনমত গঠনের কাজ শুরু করে এবং দ্রুতই ব্যাপক সাড়া ফেলে।
১৯৪৮ সালে পাকিস্তান সরকার যখন উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করে, তখন শুরু হয় তীব্র প্রতিবাদ! এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ১৯৪৮ সালের মার্চে গঠিত হয় "সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা কর্ম পরিষদ", যেখানে তমদ্দুন মজলিসও সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়। সংগঠনের সদস্যরা ছাত্র ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে মিলে আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করে। তবে, রাজনৈতিক দলগুলো যখন আন্দোলনে নেতৃত্ব নিতে শুরু করে, তখন তমদ্দুন মজলিস রাজপথের চেয়ে সাংস্কৃতিকভাবে আন্দোলনকে এগিয়ে নিতেই বেশি গুরুত্ব দেয়।
১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন যখন তুঙ্গে পৌঁছায়, তমদ্দুন মজলিসের অনেক সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তাদের কার্যালয়ে হামলা হয়। বহু আত্মত্যাগের ফলাফলস্বরূপ অবশেষে ১৯৫৬ সালে বাংলা পাকিস্তানের 'অন্যতম রাষ্ট্রভাষার' স্বীকৃতি পায়। তবে পরবর্তীতে রাজনৈতিক উত্থান-পতনে তমদ্দুন মজলিস আর সেভাবে টিকে থাকতে পারেনি। সংগঠনটির সদস্যরা বিভিন্ন মতাদর্শে আলাদা হয়ে যান। এদের মধ্যে কেউ কেউ স্বাধীন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাও করেছেন বলে জানা যায়।