চৌধুরী নাফিজ সরাফাত হাসিনাকে ডাকতেন ‘ফুফু’ আইজিপি বেনজীর ‘কাজিন’ অর্থমন্ত্রী তার কাছে ‘চাচা’
ছবি : সংগৃহীত
০২:৩৯ পিএম | ০৪ মার্চ, ২০২৫
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ডাকতেন ‘ফুফু’ বলে; আইজিপি বেনজীর আহমেদ ‘কাজিন’ আর অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ছিলেন তার কাছে ‘চাচা’। আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসনামলে তিনি গড়েছেন বিপুল সম্পদ।
কিছুদিন আগেও চৌধুরী নাফিজ সরাফাত ছিলেন বাংলাদেশের আর্থিক খাতের প্রভাবশালী এক ব্যক্তি, আর সেই প্রভাব তিনি খাটিয়েছেন নানা ক্ষেত্রে; এমনকি গোয়েন্দা সংস্থার লোকজনও বিস্ময়করভাবে তার স্বার্থ রক্ষা করে গেছে।
অথচ ১৯৯৯ সালে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে চৌধুরী নাফিজ সরাফাতের কর্মজীবন শুরু হয়েছিল সাধারণ একজন ব্যাংকার হিসেবে। সেখানে চাকরিরত অবস্থায় আইএফআইসি ব্যাংকের পরিচালক হলে বিতর্কের মুখে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের চাকরি ছাড়েন তিনি।
২০০৮ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ কমিশন থেকে রেইস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট নামে একটি সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানির লাইসেন্স নেন। সেখান থেকে শুরু হয় তার উত্থান।ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের গত তিন মেয়াদে আর্থিক খাতের অনিয়মে বারবার নাফিজ সরাফাতের নাম এলেও তিনি ছিলেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।
ছাত্রজনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দুর্নীতি দমন কমিশন আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী অনেক ব্যবসায়ীর মত নাফিজ সরাফাতের বিষয়েও অনুসন্ধান শুরু করে। তার বিরুদ্ধে তদন্তে নামে অর্থপাচার প্রতিরোধের দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় সংস্থা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট , পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন
গত অগাস্টেই নাফিজ ও তার স্ত্রীর ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করা হয়।
এক সময় যাকে স্পর্শ করা যেত না এবং অনিয়মের সংবাদ প্রকাশিত হলে গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে সাংবাদিকদের ভয়ভীতি দেখানো হত, সেই নাফিজ সরাফাত গা বাঁচাতে পাড়ি জমান বিদেশে। প্রাথমিকভাবে তার বিরুদ্ধে ব্যাংক দখল ও শেয়ারবাজার থেকে অর্থ লোপাটের মাধ্যমে ৮৮৭ কোটি টাকা আত্মসাৎসহ বিভিন্ন অভিযোগের অনুসন্ধানে নামে দুদক। অনুসন্ধানে ৫২টি কোম্পানিতে তার ও তার পরিবারের বিনিয়োগের তথ্য খুঁজে পেয়েছেন তদন্তকারীরা।
উত্থানের শুরুটা শেয়ারবাজারে ফান্ড ম্যানেজমেন্ট দিয়ে হলেও গত দেড় দশকে নাফিজ হোটেল, বিদ্যুৎ, মোবাইল টাওয়ার, আবাসন, মিডিয়া, অ্যাগ্রো, প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন খাতে ব্যবসার বিস্তার ঘটিয়েছেন। কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের ট্রাস্টি বোর্ডেরও চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি।
কানাডা বাংলাদেশ চেম্বার হাউসের সভাপতি নাফিজ সরাফাত কুর্মিটোলা গলফ ক্লাব ও আর্মি গলফ ক্লাবের সদস্য, ওয়ার্ল্ড চেজ ফেডারেশনের সহসভাপতি, এমনকি বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতিরও সদস্য পদে আসীন হয়েছিলেন তিনি।
বলা হয়, মাত্র দেড় দশকে নাফিজের এই বিপুল সাফল্যের পেছনে রয়েছে ক্ষমতাসীনদের আনুকূল্য, যার মাধ্যমে তিনি অনিয়ম করেও পার পেয়ে গেছেন। শেখ হাসিনার উপদেষ্টা ও বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান, ব্যাংক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিএবি ও এক্সিম ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার এবং বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামের সঙ্গে নাফিজ সরাফাতের সম্পর্কের কথা ব্যাংক ও পুঁজিবাজার খাতের সবারই জানা।
তার বিষয়ে অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত দুদকের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, “নামে বেনামে যেখানেই সুযোগ পেয়েছেন, সেখানেই নাফিজ সরাফাত কোম্পানির অংশীদারত্ব নিয়েছেন। কখনো অর্থের বিনিময়ে, কখনো ভয়ভীতি প্রদর্শন করে।
“এখন পর্যন্ত ৫২টি কোম্পানিতে তার বিনিয়োগের তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া দেশে-বিদেশে তার স্থাবর সম্পত্তির খোঁজ মিলেছে। আরও যাচাই-বাছাই চলছে। এই তালিকায় তার সম্পদের পরিমাণ আরো বাড়বে। তার বা তার পরিবারের মালিকানায় সম্পত্তির খোঁজ পাওয়া মাত্র সেগুলো আদালতে জব্দের আবেদন করা হবে, যাতে তিনি সেগুলোর মালিকানা হাতবদল করতে না পারেন।”