নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেটকে মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি এনসিপির
ছবি: সংগৃহীত
০৯:০২ পিএম | ১৯ এপ্রিল, ২০২৫
এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সংবিধানে নিরবচ্ছিন্নভাবে ইন্টারনেট পাওয়ার অধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার দাবি জানিয়েছেন।
শনিবার (১৯ এপ্রিল) জাতীয় সংসদের এলডি হলে জাতীয় ঐক্যমত কমিশনের সঙ্গে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) বৈঠক শেষে কমিশনের সামনে এমন প্রস্তাব উত্থাপন করার কথা জানান তিনি।
সংবিধানের মূলনীতি নিয়ে আলোচনা করেছেন জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা দেখেছি বিভিন্ন সময় সংবিধানে দলীয় মূলনীতির মাধ্যমে নিজেদের দলীয় রাজনৈতিক অবস্থানকে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। ফলে আমরা সংবিধানের মূলনীতির প্রয়োজনীয়তা আছে কি না সে প্রশ্ন রেখেছি। আমরা মূলনীতির কাঠামোর বাইরে অন্য কোনো কাঠামো ভাবতে পারি কি না। আমাদের সংবিধানে যে গণপ্রজাতন্ত্রী এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কথা বলা থাকে সেখানে আলাদা করে মূলনীতির প্রয়োজন আছে কি না। তবে আমরা বলেছি, আমাদের ৭২ এর মূলনীতি এছাড়া পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সংশোধনীর মাধ্যমে যে দলীয় মূলনীতিগুলা প্রবেশ করানো হয়েছে সে মূলনীতিগুলা বাতিল করতে হবে। সে মূলনীতিগুলো আসতে পারবে না।
নাহিদ ইসলাম বলেন, আমরা আজকের আলোচনায় কথা বলেছি ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে। আমাদের সংবিধানে যে এক ব্যক্তি কেন্দ্রিক একটি কাঠামো, প্রধানমন্ত্রীর কাছেই সব ক্ষমতা কুক্ষিত সেটা কীভাবে গণতান্ত্রিক করা যায়। রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে, প্রধান নির্বাহীর বাইরে গিয়ে সাংবিধানিক নিয়োগগুলো বাস্তবায়ন কীভাবে করতে পারি এবং শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া হিসেবে আমরা কোন ধরণের প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম তৈরি করতে পারি। এছাড়া নারীর ক্ষমতায়ন এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এই বিষয়ে আমাদের মৌলিক আলোচনা ছিল।
এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, আমরা প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ক্ষেত্রে বলেছি, দুইবারের বেশি কেউ প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না, রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রী উভয়ের ক্ষেত্রেই। যিনি একবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন তিনি রাষ্ট্রপতি হতে পারবেন না। আমরা প্রধানমন্ত্রী শাসিত সরকার নয় বরং মন্ত্রীপরিষদ শাসিত সরকারের প্রস্তাবনা দিয়েছি।
ঐকমত্য কমিশনের দেয়া প্রস্তাবনায় জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল (এনসিসি) বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, সাংবিধানিক কাউন্সিল সাংবিধানিক গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে নিয়োগ দিবেন। আইনসভার ক্ষেত্রে দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা সমর্থন করেছি। উচ্চকক্ষ হতে হবে ভোটের আনুপাতিক, আসনের আনুপাতিক নয়। নির্বাচনের আগেই উচ্চকক্ষের প্রার্থীর ঘোষণা দিতে হবে রাজনৈতিক দলগুলোকে।
১০০ আসনে নারী প্রার্থী প্রত্যক্ষ ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সংসদে যাবে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের এমন প্রস্তাবকে নীতিগত ভাবে সমর্থন করেছেন জানিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, কিন্তু এটার পদ্ধতি কি হবে সেটার কয়েকটা প্রস্তাবনা এসেছে, সেটা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। আলোচনা চলমান আছে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে ইলেক্টোরাল কলেজের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের একটি ধারণা দেয়া হয়েছে জানিয়ে এনসিপি আহ্বায়ক বলেন, সেখানে নিম্ন কক্ষ, উচ্চকক্ষ, জেলা কাউন্সিল, স্থানীয় জনপ্রতিনিধির মাধ্যমে ইলেক্টোরাল কলেজ করে সেখান থেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হবে।
সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে গণভোট করতে হবে জানিয়ে তিনি বলেন, উচ্চকক্ষ, নিম্নকক্ষের মাধ্যমে দুই-তৃতীয়াংশ হওয়ার পরেও আমাদের গণভোটে যেতে হবে সংবিধান সংশোধনের জন্য। আমরা বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে কয়েকটি প্রস্তাবনা দিয়েছি। সেজন্য আলাদা সচিবালয় করা, আর্থিক স্বাধীনতা দেয়া, বিভাগীয় ব্যাঞ্চ তৈরি করা, জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে সুপ্রিয়াম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করা, সেক্ষেত্রে উচ্চকক্ষের মতামত নেয়া যায় কি না সে বিষয়েও আমরা আলোচনা করেছি।
সংবিধান প্রত্যেক জাতিসত্তার স্বীকৃতি থাকতে হবে জানিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, প্রত্যেক ধর্মীয় জনগোষ্ঠী, নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর যে স্বীকৃতি এবং অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে হবে সংবিধানে। সংবিধানে নিরবিচ্ছিন্নভাবে ইন্টারনেট পাওয়ার অধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। মৌলিক অধিকার আদালত দ্বারা বলবৎ যোগ্য করতে হবে। এক্ষেত্রে অর্থনৈতিক অধিকারগুলো ধারাবাহিকভাবে নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, এছাড়াও আমরা নির্বাচনে প্রার্থিতার ন্যূনতম বয়সের ক্ষেত্রে ২৩ বছর বলেছি, ভোটারের বয়স ১৬ বছর। ডেপুটি স্পিকার আমরা একজন প্রস্তাব করেছি এবং সেটা বিরোধী দল থেকে হবে। সংবিধানের বিতর্কিত ৭০ অনুচ্ছেদ, সংসদ সদস্যের স্বাধীনতা এবং সরকারের স্থিতিশীলতা সাপেক্ষে ৭০ অনুচ্ছেদেরর সংস্কারের কথা বলেছি। সেক্ষেত্রে অর্থবিল ও আস্থাভোটের কথা বলা হয়েছে। স্বাধীন কমিশনের মাধ্যমে সংসদীয় সীমানা পুনঃনির্ধারণের কথা বলেছি। আগের কোন সীমানায় যেতে চাই না, নতুন করে নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে সীমানা নির্ধারণ করতে হবে।
এর আগে সকাল সাড়ে ১০টায় এলডি হলে সংস্কার কমিশনগুলোর প্রস্তাব নিয়ে এই বৈঠক শুরু হয়। তারপর থেকে প্রায় ৭ ঘণ্টাব্যাপী চলা এই বৈঠক শেষ হয় বিকাল ৫টায়। প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দারের সঞ্চালনায় বৈঠকে জাতীয় ঐক্যমত কমিশনের পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন কমিশনের সহ-সভাপতি আলী রীয়াজ, সদস্য ড. বদিউল আলম মজুমদার, সফররাজ হোসেন ও ড. ইফতেখারুজ্জামান।
এনসিপির পক্ষে উপস্থিত ছিলেন দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, সদস্য সচিব আখতার হোসেন, যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার, মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ, মুখ্য সমন্বয়ক নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারী, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন, সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব নাহিদা সারোয়ার নিভা, যুগ্ম আহ্বায়ক জাভেদ রাসেল।
এসএম/এসএন