বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, দেশের ব্যবসায়ীরা বর্তমানে বড় ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন, যার কারণে দেশে বিনিয়োগ হচ্ছে না, কর্মসংস্থান কমে যাচ্ছে এবং সামগ্রিকভাবে অর্থনীতি এগিয়ে নেওয়ার গতি ব্যাহত হচ্ছে। ব্যাংকিং খাত, স্টক এক্সচেঞ্জ ও ক্যাপিটাল মার্কেট সবখানেই গুরুতর সংকট রয়েছে। এসব সমস্যা নিয়েই শীর্ষ ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান তাদের কথা মনোযোগ সহকারে শুনেছেন।
বিএনপি ক্ষমতায় আসলে ব্যবসায়ীদের সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।
রবিবার (৪ জানুয়ারি) রাতে বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে সামনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন আমীর খসরু।
এর আগে, দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী ও শিল্প–উদ্যোক্তাদের সঙ্গে প্রায় আড়াই ঘণ্টার বৈঠক করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
আমীর খসরু সাংবাদিকদের বলেন, বৈঠকে ব্যবসায়ীরা তাঁদের সমস্যাগুলো বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সামনে তুলে ধরেন।
তাঁরা আশা প্রকাশ করেন, জনগণের ভোটে যদি বাংলাদেশ বিএনপি সরকার গঠন করতে পারে এবং তারেক রহমান দায়িত্বে আসেন, তাহলে এসব সমস্যার সমাধান হবে। ব্যবসায়ীরা বিশেষভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যয় কমানোর ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁদের মতে, ব্যাংকের উচ্চ সুদের হার এবং বিভিন্ন নীতিগত সমস্যার কারণে ব্যবসার খরচ বেড়ে যাচ্ছে। এর ফলে বাড়তি মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে, যা শেষ পর্যন্ত দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলছে।
এসব প্রতিকূল অবস্থার কারণে ব্যবসায়ীরা তাঁদের ব্যবসা ঠিকভাবে চালাতে পারছেন না, অন্যদিকে বিনিয়োগও বাড়াতে পারছেন না। দেশীয় ব্যবসায়ীরা যদি বিনিয়োগ করতে না পারেন, তাহলে বিদেশিরা কীভাবে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করবে—সে প্রশ্নও বৈঠকে উঠে এসেছে। এসব বিষয় বিস্তারিতভাবে আলোচনা হয়েছে।
তিনি বলেন, তারেক রহমান শুধু সমস্যাগুলোর সমাধানের প্রতিশ্রুতি দেননি, বরং প্রতিটি সমস্যার কী ধরনের সমাধান হতে পারে, সে বিষয়ে ব্যবসায়ীদের মতামত জানতে চেয়েছেন।
পাশাপাশি তিনি নিজেও যেগুলোকে বাস্তবসম্মত ও প্রয়োজনীয় মনে করেছেন, সেগুলো তুলে ধরেছেন।
ব্যবসায়ীরা প্রত্যাশা করছেন, জনগণের ভোটে বিএনপি ক্ষমতায় এলে এসব সমস্যার সমাধান হবে। এ বিষয়ে তারেক রহমান তাঁদের আশ্বস্ত করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, সমস্যার সমাধানের পথ নিয়ে বিএনপির ভেতরে ইতোমধ্যে আলোচনা হয়েছে এবং সে অনুযায়ী নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। এসব নীতিমালা কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, সে বিষয়েও তিনি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। শুধু নীতিমালা প্রণয়ন করাই নয়, এসব সমস্যা সমাধানে বাস্তবায়নের কৌশল ও অর্থায়ন কীভাবে হবে, সেটিও ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
আমীর খসরু বলেন, বিএনপি একটি ব্যবসাবান্ধব দল। বিএনপির সময় সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ হয়েছে, সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে, অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ও রপ্তানি বেড়েছে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের বিস্তার ঘটেছে। এ কারণেই ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা অনেক বেশি। বৈঠক শেষে মনে হয়েছে, ব্যবসায়ীরা সন্তুষ্ট। কারণ, তাঁদের অভিজ্ঞতায় বিএনপির সময় শেয়ারবাজারে বড় ধরনের পতন হয়নি, ব্যাংক লুটপাট হয়নি, টাকা পাচার হয়নি। বরং বিএনপির শাসনামলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ও কর্মসংস্থান সবচেয়ে বেশি হয়েছে। এ কারণেই ব্যবসায়ীরা বিএনপির ওপর আস্থা রাখছেন।
তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক শেষে এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন বলেন, আমরা আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনা করতে আসিনি। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক জানাতে এসেছিলাম। আমরা ব্যবসায়ী মহল মনে করি খালেদা জিয়া ও প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নীতি ছিল বেসরকারি খাতকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য। দেশে ব্যক্তিখাতের যে উন্মেষ হয়েছে এটার পথিকৃৎ তারা ছিলেন। আমরা সেই জায়গা থেকে কৃতজ্ঞতা জানাতে এসেছিলাম। কিন্তু তারেক রহমান আমাদের কাছ থেকে শুনতে চেয়েছেন যে আমাদের সমস্যা কী।
তিনি ক্ষমতায় আসলে কী করতে পারেন তার একটা আউটলাইন আমাদের কাছে চেয়েছেন। আমরা আমাদের বিরাজমান সমস্যা যেগুলো জানিয়েছি। আমাদের জ্বালানির সমস্যা, আইনশৃঙ্খলা সমস্যা, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার অসুবিধার কথা বলেছি। গণমাধ্যমের ঝুঁকির কথাও বলেছি। ব্যবসার খরচ যাতে কমানো যায়, শেয়ার বাজার যাতে শক্তিশালী করা যায়। ব্যাংকের উপর যাতে নির্ভরশীলতা কমে আসে, এসব বলেছি। আমরা গত এক বছর দেখলাম দেশে অনেক বেশি নিরাপত্তা সংকট। আমরা বলেছি যে সামগ্রিকভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন করতে হবে। শিল্প বাণিজ্য এবং সাধারণ মানুষের জন্যও নিরাপত্তা দিতে হবে। দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য এগিয়ে নেওয়ার জন্য যেসব অবকাঠামো প্রয়োজন, সেগুলি করতে হবে। অবকাঠামো ছাড়া কোনো শিল্প গড়ে উঠতে পারে না না, কর্মসংস্থানও হবে না। দীর্ঘদিন বেসরকারি খাদ্যের বিনিয়োগে যে স্থবির অবস্থা তৈরি হয়েছে, সেটা আমরা বলেছি। আমরা চেয়েছি যে আমলাতান্ত্রিক যে হয়রানি বা বিভিন্ন পলিসিগতভাবে আমরা বাধাগ্রস্ত হচ্ছি সেটা যাতে না হয়। ডিরেগুলেট করার কথা বলেছি। তারেক রহমান ভালোভাবে নোট করেছেন এবং বলেছেন, উনি যদি ক্ষমতায় আসেন তাহলে উনি চেষ্টা করবেন এগুলো সমাধান করার।
বিসিআই সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী বলেন, ব্যবসায়ীদের সম্মানটা অত্যন্ত জরুরি। সব সময় ঢালাওভাবে বলা হয় যে ব্যবসায়ীরা সব চোর-বাটপার। কিন্তু ইকোনমি যদি বড় করতে হয় ব্যবসায়ীদেরকে সাথে নিয়ে কাজ করা উচিত। সেটাই আমরা ওনাকে বলেছি।
আমরা চাই, যে সরকারই আসুক না কেন তারা যাতে দায়িত্ববোধ নিয়ে আসে। অর্থনীতি হলো দেশের উন্নয়নের মূল ভিত্তি। ফলে অর্থনীতিকে দাঁড় করাতে হলে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নিয়েই সরকারকে একসাথে কাজ করা উচিত। তারেক রহমানও বলেছেন, উনিও মনে করেন, যদি উনারা ক্ষমতায় আসতে পারেন তাহলে ব্যবসায়ীদেরকে সঙ্গে নিয়ে পলিসিগুলো যেখানে যেখানে দেওয়া দরকার তা করবেন। কিছু কিছু জায়গায় হয়ত পারা যাবে, কিছু কিছু জায়গায় হয়ত পারা যাবে না। কিন্তু একটা স্বচ্ছতা আনার চেষ্টা করবেন এবং ব্যবসায় সহায়ক একটা পরিবেশ সৃষ্টি করা হবে বলে তিনি আশ্বাস দিয়েছেন।
বৈঠকের শুরুতে এফবিসিসিআই সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন উপস্থিত ব্যবসায়ীদের পরিচয় তুলে ধরেন।
এসময় উপস্থিত ছিলেন ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান, বিএসআরএমের চেয়ারম্যান আলী হোসেন আকবর আলী, ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন ও এ. কে. আজাদ, স্কয়ার গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন চৌধুরী, বিটিএমএর সাবেক সভাপতি মতিন চৌধুরী, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ, মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তাফা কামাল, উত্তরা মোটর করপোরেশন লিমিটেডের চেয়ারম্যান মতিউর রহমান, এমসিসিআইয়ের সভাপতি কামরান টি. রহমান, বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি কুতুবউদ্দিন আহমেদ, বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক, এমসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি নিহাদ কবির, বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান, বিটিএমএর সভাপতি শওকত আজিজ, বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, স্টিল মিল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম, আইসিসি বাংলাদেশের নির্বাহী সদস্য ও ট্রান্সকম গ্রুপের সিইও সিমিন রহমান, প্রাণ গ্রুপের চেয়ারম্যান ও সিইও আহসান খান চৌধুরী।
এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন পারটেক্স গ্রুপের আজিজুল কায়সার, ডিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি হোসেন খালেদ, ডিসিসিআইয়ের সভাপতি তাসকিন আহমেদ, বিজিএপিএমইএর সভাপতি মো. শাহরিয়ার, বিসিএমইএর সভাপতি ময়নুল ইসলাম, বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির (বিএপিআই) সভাপতি আব্দুল মোকতাদির, বিএবির সভাপতি আব্দুল হাই সরকার, সিকম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুল হক, বিসিআইয়ের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রীতি চক্রবর্তী, বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি ফজলে শামিম এহসান, ইউসিবিএলের চেয়ারম্যান শরীফ জহির প্রমুখ।
টিজে/টিএ