সরকারের অনুমতি নিয়ে ডিসেম্বরের প্রথম দিন থেকে দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিন নৌ রুটে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছে। এতে প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার পর্যটক কক্সবাজার শহর থেকে সেন্টমার্টিন ভ্রমণে গেলেও এই যাত্রা চরম ঝুঁকিপূর্ণ। কেননা, কক্সবাজার-সেন্টমার্টিন নৌরুটে চলাচলকারী পর্যটকবাহী ৫ টি জাহাজে ভয়াবহ ৮টি ত্রুটি পেয়েছে জাহাজের নিরাপত্তা যাচাইকারী যৌথ দল।
যৌথ দল বলছে, জাহাজগুলোর কোনোটির নেই শতভাগ নিরাপত্তা; এতে চলতি পর্যটন মৌসুমে অগ্নিকাণ্ডসহ নানা ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করছে এসব জাহাজ। চলাচলের অনুমতি পাওয়া প্রতিটি জাহাজেরই রয়েছে কোনো না কোনো ত্রুটি বা শর্তের লঙ্ঘন। আবার কোনো কোনোটির রয়েছে একাধিক নিরাপত্তা ত্রুটিও।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে, গত ২৭ ডিসেম্বর সকালে সেন্টমার্টিনগামী এমভি দি আটলান্টিক ক্রুজ জাহাজে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় একজনের মৃত্যু হয়। এ ঘটনার পরই টনক নড়ে প্রশাসনের। এরমধ্যে চলতি মৌসুমে চলাচলের অনুমতি পাওয়া পর্যটকবাহী ৭ টি জাহাজের মধ্যে এমভি এলসিটি কাজল ও এমভি দি আটলান্টিক ক্রুজের অনুমোদন বাতিল করা হয়েছে।
এর প্রেক্ষিতেই গত ৩০ ডিসেম্বর ভোররাতে কক্সবাজার শহরের বাঁকখালী নদীর নুনিয়ারছড়াস্থ বিআইডব্লিউটিএ জেটি ঘাটে পর্যটক যাত্রীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে কোস্টগার্ডের নেতৃত্বে জাহাজগুলোতে যৌথ অভিযান চালানো হয়। এতে জাহাজগুলোতে নানা ত্রুটি ও শর্তের লঙ্ঘন শনাক্ত হয়েছে। এ বিষয়ে কোস্টগার্ড নৌপরিবহন অধিদফতরসহ সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোতে লিখিতভাবে প্রতিবেদন প্রদান করে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলো হলো- এমভি বার আউলিয়া, এমভি কর্ণফুলি, এমভি কেয়ারি সিন্দাবাদ, এমভি বে-ক্রুজার, এমভি কেয়ারি ক্রুজ অ্যান্ড ডাইন ও এমভি দি আটলান্টিক ক্রুজ। এসব জাহাজের উল্লেখ করা নিরাপত্তা ঝুঁকিগুলো হলো-
১) জাহাজগুলোরও মিনিমাম সেইফ ম্যানিং ডকুমেন্ট নেই এবং দুইজন মাস্টার ও দুইজন ড্রাইভার দ্বারা নৌযান পরিচালনার বিধান থাকলেও রয়েছে একজন করে।
২) ফায়ার ও সেইফটি প্ল্যান অনুযায়ী এলএসএ ও এফএফএ নেই এবং বেশিরভাগ জাহাজে পর্যাপ্তসংখ্যক কার্যকরী লাইফ জ্যাকেট নাই।
৩) সার্ভে সার্টিফিকেটে প্রদত্ত মাস্টারের নামের সাথে জাহাজে কর্মরত মাস্টারের নামে মিল নেই।
৪) মেইন ইঞ্জিনের ওভার হলিং ডকুমেন্ট নাই।
৫) বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ফায়ার পাম্প কার্যকরী অবস্থায় এবং পর্যাপ্ত পরিমাণ হোজ পাইপ পাওয়া যায়নি।
৬) ইঞ্জিনরুমে ফিক্সড কার্বন ডাই-অক্সাইড সিস্টেম নেই।
৭) ফায়ার কন্ট্রোল প্যানেল, ফায়ার অ্যালার্ম ও ফায়ার ডিটেকশন সিস্টেম কার্যকরী অবস্থায় পাওয়া যায়নি।
৮) জাহাজ পরিচালনাকারী মাস্টার ও ড্রাইভারগণের বেসিক ফায়ার ফাইটিং ট্রেনিং সার্টিফিকেট নেই।
এদিকে, কোস্টগার্ডের প্রতিবেদনের আলোকেই সেন্টমার্টিন রুটে চলাচলকারী পর্যটকবাহী জাহাজগুলোর নিরাপত্তার ঝুঁকিগুলো উল্লেখ করে নিরাপদ ব্যবস্থা নিতে গত রোববার (৪ জানুয়ারি) নৌপরিবহন অধিদফতরের চিফ ইঞ্জিনিয়ার অ্যান্ড শিপ সার্ভেয়ারের অধিশাখার মহাপরিচালক কমোডর মো. শফিউল বারী স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপন জারি করে। এতে আগামী ১৫ জানুয়ারির মধ্যে জাহাজগুলোর ত্রুটি ও বিচ্যুতিগুলো সংশোধনের সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয়।
আর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ত্রুটি ও বিচ্যুতিগুলো সংশোধন করা না হলে পর্যটকবাহী জাহাজগুলোর চলাচলের অনুমতি বাতিল করা হবে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ নিয়ে প্রস্তাবিত কক্সবাজার নদী বন্দর কর্মকর্তা মো. আব্দুল ওয়াকিল জানান, কোস্টগার্ডের প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে নৌপরিবহন অধিদফতরের জারি করা প্রজ্ঞাপন দাফতরিকভাবে পাননি। তবে বিষয়টি অনানুষ্ঠানিকভাবে অবহিত হয়েছেন। যৌথ অভিযানে বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষও জাহাজগুলোতে নিরাপত্তার ঝুঁকিগুলো পর্যবেক্ষণে পেয়েছে।
ইউটি/টিএ